জুলাই সনদ ও গণভোট: ৭ দিনের সময়সীমা শেষ, এরপর কী?
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট আয়োজনের সময়সূচি নিয়ে নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে সরকারের একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আগামী বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য উপদেষ্টা পরিষদের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী সপ্তাহে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি বলেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই সরকার নাগরিকদের গণভোটের সময় জানাবে। এ নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে বা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।"
অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের উদ্যোগ
এদিকে সোমবার (১০ নভেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে দ্রুতই সরকারের সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
উপদেষ্টা বলেন, "সরকারের অবস্থান সরকার স্পষ্ট করেছে। অনেকগুলো ক্ষেত্রেই তো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। কথা ছিল, যে বিষয়গুলোতে ঐকমত্য হয়নি সেগুলোর বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা একসঙ্গে বসে একটা ঐকমত্যে পৌঁছে সরকারকে জানাবে। আমরা জেনেছি, রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সেই প্রক্রিয়ায় যায়নি।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা বলেছিলাম রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরা সমাধান করতে না পারে তবে সরকার তার অবস্থান নেবে। যেহেতু সাত দিন পার হয়ে গেছে, এখন সরকার বসবে। অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করে যেটা ভালো মনে হয় সরকার সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।"
সরকার সিদ্ধান্ত আরোপ করছে কি–না, এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, "কেউ তো বলেনি যে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। যদি শুনতাম সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, তারপরও যদি সরকার সিদ্ধান্ত নিত তাহলে কথাটা বলতে পারতেন যে আমরা আরোপ করছি। তা তো নয়। সরকারের তো একটা দায়িত্ব আছে, তাকে তো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে অচলাবস্থাকে কাটিয়ে আনতে হবে।"
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম টিবিএসকে বলেন, "আমরা এখনো আশা করছি রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাবে। যদি না পারে, তাহলে উপদেষ্টা পরিষদ সভায় বিষয়টি সিদ্ধান্ত হবে। যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা দেশের স্বার্থেই হবে।"
কী নিয়ে আপত্তি
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাবিত 'জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' বাস্তবায়নে অবিলম্বে সরকারি আদেশ জারি করে একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে, যার মাধ্যমে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি বিষয়ে নাগরিকদের মতামত নেওয়া হবে।
কমিশনের প্রস্তাবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অথবা নির্বাচনের আগে এই গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে।
তবে গণভোটের সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন। বিএনপি চায় নির্বাচনের দিনই গণভোট হোক, তবে তারা সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের আগে গণভোট চায় এবং এ দাবিতে ইতোমধ্যে তিনটি সমাবেশ করেছে। আজ (১২ নভেম্বর) রাজধানীতে একই দাবিতে জামায়াত ও সমমনোভাবাপন্ন ৮টি দল সমাবেশ চলছে।
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন—যেকোনো সময় গণভোট আয়োজন হলে তাদের আপত্তি নেই, যদিও তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
এই মতপার্থক্যের মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন, তবে সমঝোতা হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে গত ৩ নভেম্বর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও গণভোটের সময় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সাত দিনের সময়সীমা দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো দলই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
একই দিনে গণভোট আয়োজনে মতামত
সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন চাইছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হোক। কারণ নির্বাচনের আগে আলাদাভাবে গণভোট আয়োজন করলে প্রশাসনিক জটিলতা ও নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'হ্যাঁ' ও 'না' ভোট প্রচারণা শুরু হয়েছে, যেখানে বেশিরভাগের মতামত নেতিবাচক। সরকার মনে করছে, আলাদাভাবে গণভোট আয়োজন করে ব্যর্থ হলে সেটি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে প্রতিফলিত হবে। তাই তারা আলাদাভাবে গণভোট আয়োজনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এই কারণে সরকার বিএনপিকে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি মেনে নেওয়ার জন্য এবং জামায়াত ও তাদের মিত্র দলগুলোকে নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করছে।
এর আগে ৩১ অক্টোবর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "গণভোট কবে হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাই এখন সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
ঐকমত্য কমিশনের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ফরহাদ মজহারের
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এই কমিশনের কোনো এখতিয়ার নেই জাতীয় সনদের মতো কোনো নথি প্রস্তাব বা বাস্তবায়নের।
গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় ফরহাদ মজহার বলেন, "এ ধরনের সনদকে সাংবিধানিক বৈধতা দিতে পারে শুধু গণপরিষদ বা গণভোট।"
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার কোনো 'অন্তর্বর্তী নয়, বরং উপদেষ্টা সরকার' হিসেবে কাজ করছে।
