চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ে যানজট নিরসনে ২,২০০ কোটি টাকার নতুন ফ্লাইওভার প্রকল্প
চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম যানজটপ্রবণ এলাকা অক্সিজেন মোড়ের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে সাত লেনবিশিষ্ট একটি নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বায়েজিদ থেকে কুয়াইশ পর্যন্ত সড়ক চার লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রকল্পটির নকশা এবং ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলছে। ফ্লাইওভার এবং সড়ক সম্প্রসারণ মিলিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২,২০০ কোটি টাকা।
রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী উপজেলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নগরের উত্তরাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হচ্ছে অক্সিজেন মোড়। প্রতিদিন এই মোড়ে যানবাহনের তীব্র চাপের কারণে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।
সিডিএ বলছে, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও সড়ক প্রশস্তকরণের মাধ্যমে শুধু অক্সিজেন মোড় নয়, পুরো অঞ্চলের যানজট কমানো এবং পার্বত্য এলাকা ও তিন উপজেলার সঙ্গে নগরের যোগাযোগ সহজ করাই তাদের লক্ষ্য। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও সড়ক ও জনপদ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সাত লেনবিশিষ্ট এই ফ্লাইওভারের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। বায়েজিদ মোড় থেকে একটি র্যাম্প যাবে হাটহাজারী সড়কে, আরেকটি যাবে কুয়াইশ সড়কে। হাটহাজারী সড়ক থেকে দুটি র্যাম্প সংযুক্ত হবে যথাক্রমে বায়েজিদ ও মুরাদপুরের দিকে।
কুয়াইশ রোড থেকেও একটি র্যাম্প যুক্ত হবে বায়েজিদের সঙ্গে। অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। ফ্লাইওভারসহ প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭.৫ কিলোমিটার।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "অক্সিজেন মোড়ের যানজট দীর্ঘদিনের সমস্যা। জনগণের কষ্ট লাঘবে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা ডিপিপি চূড়ান্ত করার কাজ করছি।"
যানজট নিরসনে নগরে একাধিক ফ্লাইওভার
গত এক দশকে নগরীর যানজট নিরসন ও জনসাধারণের চলাচল সহজ করতে একাধিক ফ্লাইওভার এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে সিডিএ।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে নগরীর শোলকবহর থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত ফ্লাইওভারটি ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়। এর ফলে বহদ্দারহাট এলাকায় যানজট অনেকাংশে কমে আসে।
সিডিএ'র আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার, যা নগরীর দীর্ঘতম ফ্লাইওভার হিসেবে বিবেচিত। ৬৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ৫.২ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট এই ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের মার্চে এবং যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর। এতে মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড় ও ওয়াসা মোড়ের চাপ অনেকটাই কমে যায়।
এছাড়া বটতলী স্টেশন থেকে ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১২ সালের জুলাইয়ে এবং উদ্বোধন করা হয় ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। অন্যদিকে, দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার নির্মিত হয় ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এবং চালু হয় ২০১৩ সালে।
চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত প্রকল্প হলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, যার লক্ষ্য শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে নগরের নির্বিঘ্ন সংযোগ এবং যানজট নিরসন। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৩,২৫০ কোটি টাকা। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। প্রথমে ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ব্যয়ও বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৩৬৯ কোটি টাকায়।
এদিকে, এক্সপ্রেসওয়ের মূল কাঠামোর কাজ শেষ হলেও এর সঙ্গে সংযুক্ত ১৫টি র্যাম্পের মধ্যে ৬টি বাদ দেওয়া হয়। বাকি ৯টির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলোর নির্মাণকাজ চলমান।
প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকেই এর কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বর্তমানে নগরবাসীরা বলছেন—এক সময়ের দেড় ঘণ্টার এই পথ এখন এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ১৫-২০ মিনিটেই পাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
