আইনি জটিলতার মুখে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ, বিচারকদের বদলি, পদায়ন-পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিলেও দেখা দিয়েছে আইনি জটিলতা। ফলে বিলম্ব হচ্ছে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা।
এই সচিবালয় করার জন্য 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫' নামে অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এই খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই অধ্যাদেশ আকারে জারি করবেন রাষ্ট্রপতি।
আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদায়ন-পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব ন্যস্ত রয়েছে রাষ্ট্রপতির ওপর।
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকা অবস্থায় নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে; অধ্যাদেশটির আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে এটি পরিবর্তন বা সংশোধন করার কথা বলেছেন আইনজ্ঞরা।
কর্মকর্তারা বলেছেন, এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করার পর বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে। কারণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের ওপর একক এখতিয়ার পাবে সুপ্রিম কোর্ট।
এদিকে ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে গত নভেম্বরে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। দুই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে রুল জারি করেছেন আদালত। সেটি এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে জানান রিটকারীরা।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃংখলাবিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।'
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের ফলে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলা ইত্যাদি নির্বাহী বিভাগের আওতায় থেকে গেছে। এসব কাজ রাষ্ট্রপতির পক্ষে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ করে থাকে।
একইভাবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ওপর সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় এই দুটি কর্তৃপক্ষের যুগপৎ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে দ্বৈত শাসনের অংশ হিসেবে বিচার কর্ম বিভাগ সব বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেন তারা।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সংবিধান হলো মাদর ল'। কোনো আইন বা অধ্যাদেশ করতে হলে সংবিধান অনুসরণ করেই করতে হবে। সংবিধানের ভায়োলশেন করে কোনো আইন বা অধ্যাদেশ করা হলে সেটি "ভয়েড অব ইনিশিয়ো", অর্থাৎ বাতিল বলে গণ্য হবে।
'রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগকে রক্ষা করতে হলে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক সচিবালয় জরুরি। কিন্তু সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে এই এখতিয়ার দেয়া হয়েছে, আর সুপ্রিম কোর্টকে সুপারভাইজরি এখতিয়ার দেয়া আছে।'
শাহদীন মালিক বলেন, 'প্রস্তাবিত আইনে যদি পুরো এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্ট, অর্থাৎ প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই এই অনুচ্ছেদ দ্রুত পরিবর্তন বা বাতিল করতে হবে।'
বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বিচারক-আইনজীবীসহ অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের কাজ সঠিকভাবে করতে এই সচিবালয় জরুরি। এটি প্রতিষ্ঠায় রয়েছে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও। ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়েও পৃথক সচিবালয় স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সেটি হয়নি।
৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সৈয়দ রেফাত আহমেদ প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিয়েই পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় জোর দেন। সে অনুযায়ী প্রায় পাঁচ মাস আগে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এরপর বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় স্থাপনের জন্য কাজ শুরু হয়।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একটি অধ্যাদেশের খসড়াও তৈরি করেছেন। প্রথমদিকে সচিবালয় স্থাপনের কার্যক্রম জোরেশোরে চললেও আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে সেই গতিতে ভাটা পড়েছে।
বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই শেষ করা উচিত বলে অভিমত দিয়েছেন আইনজীবী ও সাবেক বিচারকরা। এর জন্য যা যা করা জরুরি, তা করতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনায় আসার পর এটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক সরকারগুলো বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করতে চায়নি। সে কারণে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দীর্ঘদিন পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে পৃথক ঘোষণা করা হয়েছিল।
এরপর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসে বিচার বিভাগ পৃথককরণের বাকি কাজ আর এগিয়ে নেয়নি। ফলে এখনও বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের কবজায় রয়ে গেছে।
জানতে চাইলে ১১৬ অনুচ্ছদের বৈধতা প্রশ্নে করা রিট পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, 'রিট আবেদনটির চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে। মামলাটি আংশিক শ্রুত হিসেবে রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য রাখার কথা ছিল। এ অবস্থায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ শুনানির জন্য চার সপ্তাহ সময় নিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ চাইলেই এই রিটের দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।'
অপর রিট আবেদনের আইনজীবী ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির বলেন, অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা সত্ত্বেও বর্তমান সাংবিধানিক বিধানের কারণে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলায় হস্তক্ষেপ করে নির্বাহী বিভাগ।
'ফলে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণ অর্জন সম্ভব নয়' উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অবশ্য এই ধরনের বিধান ছিল না।
১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হয়েছিল।
১১৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে, সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশে রাষ্ট্রপতি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়োগ দেবেন। প্রকৃত পৃথকীকরণ নিশ্চিত করার জন্য মূল ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার কবির আরও বলেন, সংবিধান সংশোধন না করে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো অধ্যাদেশ পাশ করা করা হলে সেটি স্রেফ রসিকতা হবে।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার বাদী সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, 'গত ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করা হচ্ছে না। কেউ কেউ চায় না পৃথক সচিবালয় হোক। মাসদার হোনেন মামলায় আপিল বিভাগের ১২টি নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম ছিল পৃথক সচিবালয় করা। এটি করতে কোনো আইনগত অন্তরায় নেই।'
এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে টেলিফেনে যোগযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ফেব্রুয়ারিতে এই খসড়া প্রণয়ন করেছে মন্ত্রণালয়। 'খসড়া প্রণয়নের পর ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। অনুচ্ছেদ ১১৬ নিয়ে হাইকোর্টে পেন্ডিং দুটি রিট নিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে, তার ওপর নির্ভর করছে অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ,' বলেন তিনি।
অধ্যাদেশের খসড়ায় যা আছে
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫-এর খসড়ার ৪ ধারায় বলা হয়েছে, 'সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে একটি সচিবালয় থাকবে এবং এটা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে অভিহিত হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তরের আওতাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে না। বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে একজন সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমন্বয়ে এই সচিবালয় গঠিত হবে।'
অধ্যাদেশের ৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, 'অন্য কোনো আইন, বিধি বা কার্যবণ্টনে যা কিছুই থাকুক না কেন, দেশের বিচার প্রশাসন পরিচালনায় সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা প্রদান করার জন্য অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব সাচিবিক দায়িত্ব পালন; সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন সাপেক্ষে রাজস্ব আদালতগুলো ব্যতীত হাইকোর্ট বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন দেশের সব অধস্তন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, এখতিয়ার, ক্ষমতা ও গঠন নির্ধারণ; হাইকোর্ট বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সব আদালত বা ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলি নির্ধারণ; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়; অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় ন্যস্ত থাকবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ওপর।'
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যপদ্ধতির ব্যাপারে ৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে, 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিব সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হবেন। (২) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সচিব সরকারের সিনিয়র সচিবের সমমর্যাদা ও সুবিধাদি ভোগ করবেন।'