ধানের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে ঢাকার বাজারে চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে; স্বস্তি নেই সবজি-ডিমেও
ঢাকার খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে মাঝারি মানের চালের দামও কেজিতে ১-৩ টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। এছাড়া সবজির দামও চড়া রয়েছে।
শুক্রবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও লালবাগে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে চালের দামের এ চিত্র পাওয়া গেছে।
বাজারে বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬৫ থেকে ৭৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেটের দাম কেজিতে ৭৪-৭৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে এসব চালের দাম ছিল প্রায় ৭২ টাকা। অন্যদিকে রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে, যা এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগের তুলনায় ২ টাকা বেশি।
মিনিকেটের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দামের মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের চালের কেজি এখন ৭৬ টাকা। গত সপ্তাহের তুলনায় এর দাম বেড়েছে ১ টাকা।
সরু চালের আরেকটি ধরন নাজিরশাইলের দামও বেড়েছে। মানভেদে প্রতি কেজি নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলেন, গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে এ চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে।
সরু চালের পাশাপাশি মাঝারি মানের চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাজারে পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দাম কেজিতে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব চালের দাম কেজিতে প্রায় ৩ টাকা বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের একটি পাইকারি দোকানের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম গতকাল টিবিএসকে বলেন, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মিলপর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়েছে। কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এরপর ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। এসবের প্রভাবই ঢাকার বাজারে পড়েছে।
আরো কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মাসে ডিজেলের দাম বাড়ার পর দিনাজপুর থেকে চাল আনতে প্রতি ট্রাকে প্রায় তিন হাজার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনতে ২ হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচও বেড়েছে। সেজন্য কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দাম বাড়াতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজার এলাকায় বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী হাসিবুল হাসান টিবিএসকে বলেন, 'আটাশ চাল সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ টাকায় কিনেছি। মাসের শেষের দিকে কিনেছি ৬২ টাকায়। আজ (গতকাল) কিনলাম ৬৪ টাকায়। দোকানিরা বলছেন, ট্রাকভাড়া বেড়েছে, ধানের দাম ও মোকামে চালের দাম বেড়েছে; তাই এখন খুচরায় বেড়েছে।'
তবে মোটা চালের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। বর্তমানে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারও চড়া
রাজধানীর বাজারে অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১২০ টাকায়। আগাম শীতকালীন সবজি শিমের দাম কেজিতে ১৫০ টাকা। ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা এবং মূলা বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭০ টাকায়। তবে তুলনামূলক কম দামে পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে, যার কেজি ৩০ টাকা।
বাজারে লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা ও টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি, ঝিঙা ও করলার কেজি ৮০ টাকা। লাউ প্রতি পিস ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শসার দাম তুলনামূলক কম, সাধারণ শসা ৫০-৬০ টাকা কেজি। তবে দেশি শসা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
সবজির উচ্চমূল্যের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কাঁচা মরিচের বাজারে। কয়েক সপ্তাহ আগে কেজিপ্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কাঁচা মরিচ এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে।
কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা আবু দাউদ বলেন, '১৪০ টাকা দিয়ে ফুলকপি দুই পিস কিনেছি। নতুন সবজি, তাই দাম বেশি হলেও কিনলাম। একটা লাউ ৫০ টাকা আর এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনেছি ৪০ টাকায়। কয়েকটা সবজি কিনতেই অনেক টাকা চলে যাচ্ছে। বাজারে এসে কোনটা কিনব, আর কোনটা বাদ দেব, সেই হিসাব করতে হয়।'
মুরগির দাম স্থিতিশীল, বাড়তি ডিমের দাম
মুরগির বাজারে দামের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। রাজধানীর খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে ফার্মের মুরগির ডিমের দামেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। সে হিসাবে ডজনের দাম দাঁড়াচ্ছে ১৬৫ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির বিক্রেতা তারেক হোসেন বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহে ১০ টাকা কমলে পরের সপ্তাহে আবার ১০ টাকা বেড়ে যায়। অন্যদিকে সোনালি মুরগির দাম সাধারণত ৩১০-৩২০ টাকার মধ্যে থাকে। শুক্রবার তিনি ৩১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
এদিকে গরুর মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা ও রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।
কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন বলেন, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবার মাছের চাহিদা বেশি থাকে। ফলে কিছু মাছের দামও বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, ২০০ টাকার নিচে এখন খুব কম মাছ পাওয়া যায়। আগে পাঙাশের দাম কম থাকলেও এখন সেটিও কেজিতে ২০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহের ওপর নির্ভর করে মাছের দাম একই দিনেও পরিবর্তিত হতে পারে।
