১৩৫ কোটি টাকার সংস্কারেও চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথে বাড়েনি ট্রেনের গতি, উন্নয়নে ২৩,৬১১ কোটি টাকার আরও দুই প্রকল্প
কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার আগে ষোলশহর-দোহাজারী ৪০ কিলোমিটার রেলপথ দুই দফায় ১৩৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে। এরপরও এ রেলপথে ট্রেনের গতি ৪০ কিলোমিটারে আটকে রয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সংস্কারের পর ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে প্রকৌশল বিভাগের নির্দেশনায় বর্তমানে ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে চালানো হচ্ছে।
এর আগে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক পরিদর্শনে ব্যালাস্টের (পাথর) তীব্র ঘাটতি, লাইন আঁকাবাঁকা থাকা ও স্লিপারে ফাটলসহ সংস্কার কাজে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। ।
এই গতি কমে যাওয়া ও পরিচালনায় অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেনের ভ্রমণ সময় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
দুই ধাপে ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকার বেশি
রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১১ সালে শুরু হওয়া 'বাংলাদেশ রেলওয়ের ষোলশহর-দোহাজারী ও ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট সেকশন পুনর্বাসন' প্রকল্পে ব্যয় হয় ১৯৭.৪৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালে।
মোট খরচের মধ্যে শুধু ষোলশহর-দোহাজারী অংশেই ব্যয় হয় প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
কক্সবাজারে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হওয়ার আগে ২০২৩ সালে ২৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে আবারও সংস্কারকাজ করা হয়। এতে দুই ধাপে এই অংশে মোট ব্যয় ১৩৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
অপরদিকে কর্ণফুলী নদীতে নতুন সেতু নির্মাণ বিলম্ব হওয়ায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কালুরঘাট সেতুটি মেরামত করা হয়।
সংস্কার কাজে বড় ত্রুটি পেয়েছিল আইএমইডি
২০১৯ সালের জুনে সংস্কার প্রকল্পটির কাজ পরিদর্শন করে আইএমইডি। পরিদর্শনে তারা রেললাইনকে সমর্থন দিতে ও স্থিতিশীল রাখতে ব্যবহৃত ভাঙা পাথর বা ব্যালাস্টের মারাত্মক ঘাটতি দেখতে পায়।
ষোলশহর-দোহাজারী অংশে ৫৫ হাজার ঘনমিটার ব্যালাস্ট দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ঘনমিটার। অন্যদিকে ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট সেকশনে ২৭ হাজার ঘনমিটারের জায়গায় দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ঘনমিটার।
রেললাইন অনেক স্থানে আঁকাবাঁকা ও স্লিপার ফেটে যেতে দেখে আইএমইডির পরিদর্শন দল। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অধীনে মোট ৯ জন পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, কাজের এই ত্রুটির কারণে ঠিকাদারের সিকিউরিটি গ্যারান্টি আটকে দেওয়া হয়েছিল এবং জরিমানা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানও আগের সংস্কার কাজের এই সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করেছেন।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'প্রথমবার সংস্কারকাজের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করেনি। একপ্রকার কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প শেষ করা হয়।'
গতির সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে ভ্রমণের সময়
এই রুটে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত দুজন স্টেশন মাস্টার ও একজন লোকোমোটিভ মাস্টার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেলওয়ের সময়সূচিতে নির্ধারিত গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার উল্লেখ থাকলেও লোকোমোটিভ মাস্টারদের ট্রেন ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাসউদুর রহমান বলেন, রেলের রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক সময় পুনর্বাসন হলেও গতি বাড়ানো যায় না।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতির সীমাবদ্ধতা, পুরনো কালুরঘাট সেতুতে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার গতির বাধ্যবাধকতা, সিঙ্গেল লাইন পরিচালনা, ট্রেনের ক্রসিং ও মাঝেমধ্যে লোকোমোটিভ বিকল হয়ে যাওয়ার কারণেই ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হয়।
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের চলাচলের সর্বোচ্চ রানিং সময় নির্ধারণ করা রয়েছে ৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট ও ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। কিন্তু উভয় ট্রেনই নিয়মিত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা বিলম্বে গন্তেব্য পৌঁছায়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি একটি মাত্র রেক দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় চার ট্রিপ পরিচালনা করে। ফলে কোনো একটি ট্রিপে বিলম্ব হলে তা পরবর্তী পরিষেবাগুলোও বিলম্বিত হয়।
দুই মেগা প্রকল্পে ২৩,৬১১ কোটি টাকা
চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার করিডোরে দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে প্রায় ২৩,৬১১ কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রায় ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ২০২৩ সালে চালু হলেও পুরনো চট্টগ্রাম-দোহাজারী সেকশন এবং জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতুর কারণে ট্রেনগুলো বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না।
এই দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের বড় ধরনের উন্নয়ন, অন্যটি কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী লাইনের বড় ধরনের উন্নয়ন
সর্বশেষ প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলওয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯১.৪৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের অক্টোবরের প্রকল্প নথিতে ব্যবহৃত বিনিময় হার অনুযায়ী এটি প্রায় ১২ হাজার ৫০ কোটি টাকার সমান।
এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) নিয়মিত ও রেয়াতি ঋণের মাধ্যমে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা দেবে। আর বাকি ৩০৩.৪৬ মিলিয়ন ডলারের দেবে সরকার।
এ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান প্রায় ৩৫ কিলোমিটার রেলপথের উন্নয়ন করা হবে এবং পাহাড়তলী ও ঝাউতলার মধ্যে ২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাইপাস নির্মাণ করা হবে। এর ফলে ঢাকা-কক্সবাজারগামী ট্রেনগুলোকে চট্টগ্রাম স্টেশনে থেমে আবার উল্টো দিকে ঘুরতে হবে না। এতে ট্রেনের যাত্রায় ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় বাঁচবে।
এছাড়াও এই প্রকল্পে ডুয়েল-গেজ রূপান্তর, রেলওয়ের বাঁধ উঁচু করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন ও ৩০টি লোকোমোটিভ ক্রয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রেলওয়ের প্রকল্প তথ্যে পাহাড়তলী-দোহাজারী পর্যন্ত ৪৪ কিলোমিটারের একটি প্রশস্ত করিডোরের কথা বলা হয়েছে। যেখানে পরিকল্পিত ডাবল ও সিঙ্গেল ট্র্যাক অংশগুলো হিসাব করলে মোট ট্র্যাকের দৈর্ঘ্য হবে ৬২.৮৮ কিলোমিটার।
প্রতিবন্ধকতা দূর করবে নতুন কালুরঘাট সেতু
দ্বিতীয় প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোনো কালুরঘাট সেতুর বদলে নতুন একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। এ সেতুতে বর্তমানে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ।
১১ হাজার ৫৬০.৭৭ কোটি টাকার এই রেল-কাম-সড়ক সেতু প্রকল্প ২০২৪ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পায়।
কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতুসহ প্রায় ১১ কিলোমিটার নতুন অ্যালাইনমেন্ট নির্মাণের জন্য এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অভ কোরিয়া ৮১০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে।
এ প্রকল্পের আওতায় ৭০০ মিটার দীর্ঘ ও সাত স্প্যানের একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। এতে দুটি ডুয়েলগেজ রেললাইনের পাশাপাশি দুই লেনের একটি সড়ক থাকবে। সেইসাথে আনুষঙ্গিক রেল ও রোড ভায়াডাক্ট এবং নতুন রেলপথও যুক্ত থাকবে।
