যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ রিফান্ডের ১০০ বিলিয়ন ডলার থেকে নিজ হিস্যা চান বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা
২০২৫ সালে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাড়ানোর চরম মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পোশাক ক্রেতাই রপ্তানি আদেশ বজায় রাখার শর্তে মূল্যছাড় বা দাম কমানোর জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বায়ারদের ধরে রাখতে, তখন বাধ্য হয়ে অনেক বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সেই শুল্কের বাড়তি খরচের একটি অংশ নিজেরা বহন করতে রাজিও হয়েছিলেন।
তবে এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের ওই শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করার পর, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলো সরকারের কাছ থেকে তাদের প্রদত্ত শুল্কের অর্থ ফেরত পেতে শুরু করেছে। রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থার অধীনে আদায় করা মোট ১৬৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে, ট্রাম্প প্রশাসন এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার রিফান্ড বা ফেরত দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে: মার্কিন ক্রেতারা যদি তাদের সরকারের কাছ থেকে শুল্কের টাকা ফেরত পেয়ে যান, তবে যে সরবরাহকারীরা (সাপ্লায়ার) সেই খরচের বোঝা বহনে সহায়তা করেছিলেন, তাদের পাওনা বা ক্ষতিপূরণের কী হবে?
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, তারা এখন রিফান্ডের টাকার একটি অংশ, অথবা মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে অন্তত কোনো না কোনো উপায়ে এই রিফান্ডের হিস্যা চাইছেন।
এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, "ওই সময়ে আমরা বায়ারদের সঙ্গে এক তৃতীয়াংশ বা কোন কোন ক্ষেত্রে অর্ধেক পর্যন্ত বর্ধিত প্রাইস (মূল্য) শেয়ার করেছি। এখন ওই টাকা রিফান্ড হওয়ার পর বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি।"
"বায়াররা বলছেন, তারা ফেরত দেবেন" – টিবিএস'কে বলেন তিনি।
মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হচ্ছে চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক প্রস্তুতকারক এইচকেসি অ্যাপারেলস। প্রতিষ্ঠানটির মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।
মার্কিন বায়ারদের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহকারীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত।
তবে তারা জানান, সরাসরি অর্থ ফেরত দেওয়া জটিল হতে পারে। এর পরিবর্তে পরবর্তী অর্ডারগুলোতে পণ্যের দাম কিছুটা বাড়িয়ে, বা অর্ডারের পরিমাণ বাড়িয়ে, কিংবা এয়ার শিপমেন্টের খরচ ও পেনাল্টির মতো ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে এই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে যেকোনো ধরনের সমঝোতার হতে হবে ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে।
যদিও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ দুই সংগঠন– বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ-এর কারও কাছেই সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই যে শুল্কজনিত খরচের ঠিক কতটা অংশ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা বহন করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের ১০০ বিলিয়ন ডলার রিফান্ড
গত ৬ আগস্ট প্রকাশিত আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডজন খানেক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের বিরুদ্ধে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরত দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ বাতিল করার আগে মার্কিন আমদানিকারকদের কাছ থেকে দেশটির সরকার প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার শুল্ক বাবদ আদায় করেছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কর নীতিসংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান- ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের হিসাবে, এই শুল্কের কারণে ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে অতিরিক্ত ১,০০০ ডলার গুনতে হয়েছে।
কোনো না কোনো উপায়ে ক্ষতিপূরণ চান উদ্যোক্তারা
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের চাপ সামলাতে দাম কমানোর কারণে রপ্তানিকারকদের যে ক্ষতি হয়েছে, ক্রেতাদের উচিত এখন সরবরাহকারীদের সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
টিবিএস'কে তিনি বলেন, "সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছিল, তা ফেরত পাওয়া অর্থের একটি অংশ থেকে যেকোনোভাবেই হোক তাদের ফেরত দেওয়া উচিত।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাভিত্তিক একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, "আমাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ার ৫ শতাংশ মূল্য কমানোর অনুরোধ করেছিল, আমরা ১ শতাংশ কমিয়েছিলাম। এতে আমাদের প্রায় ২৫ হাজার ডলারের মত ছাড় দিতে হয়েছে।"
"তবে আমরা তাদের কাছে এই অর্থ ফেরত চাইব না। চাইব, তারা যেন আমাদের সাথে ব্যবসায়ের ভলিউম (পরিমাণ) বাড়ায়। ব্যবসা বাড়লে এই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব" –বলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিএমইএর এক নেতা বলেন, "বর্ধিত শুল্কের কারণে সব বায়ার এখানকার রপ্তানিকারকদের ওপর সমান চাপ দেননি। কেউ কেউ কোনো চাপই দেননি। ফলে সার্বিক বিবেচনায়, রপ্তানিকারকরা যে খরচ বহন করেছেন তার পরিমাণ গড়ে হয়তো ১০ শতাংশ হতে পারে।"
তিনি জানান, 'ফ্রি অন বোর্ড' (এফওবি)-এর পরিবর্তে যেসব রপ্তানিকারক 'ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড' (এলডিপি) পদ্ধতিতে রপ্তানি করেছেন, তাদেরকে এই বাড়তি শুল্কের চাপ নিতে হয়েছিল। কারণ এলডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানি করা হলেও– আমদানিকারক দেশের কাস্টমস শুল্ক সরবরাহকারীকে বহন করতে হয়।
তবে সব রপ্তানিকারকই যে ক্রেতাদের দেওয়া ছাড়ের টাকা ফেরত পাওয়ার আশা রাখেন, এমনটাও নয়।
চট্টগ্রামভিত্তিক তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মিডো অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আনাম চৌধুরী বলেন, "ওই সময়ে আমাদের মূল্যছাড় দিতে হয়েছে। কিন্তু এটি কোনভাবে ফেরত পাব, তা মনে করি না।"
আইনি সহায়তা নিয়ে এলডিপি পদ্ধতির রপ্তানিকারকদের রিফান্ড দাবির সুযোগ
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, শুল্কের কারণে দেওয়া ছাড়ের অর্থ উদ্ধারে রপ্তানিকারকেরা বায়ারদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দরকষাকষি করছেন কি না, তা তাঁর জানা নেই।
তিনি বলেন, "কেউ আলোচনা করলে, তা নিজেদের মত করে আলোচনা করছেন। যাদের বড় অংকের কস্ট শেয়ার করতে হয়েছে, তারা তাদের বায়ারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে আমরা মনে করি, সরাসরি অর্থ ফেরত না পেলেও বাড়তি ব্যবসার মাধ্যমে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।"
মাহমুদ হাসান খান বাবু আরও উল্লেখ করেন, এলডিপি পদ্ধতিতে যারা পণ্য পাঠাতেন, তারা আইনি সহায়তার মাধ্যমে শুল্কের টাকা দাবি করতে পারেন। "যারা এলডিপিতে রপ্তানি করেছেন, তারা আইনজীবী নিয়োগ করে টাকা দাবি করার সুযোগ পাবেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবীরা এসে আমাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করে গেছেন," তিনি যোগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কত শতাংশ পণ্য এলডিপি পদ্ধতিতে গেছে, সে বিষয়ে বিজিএমইএর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে বাবু জানান, এর পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম হতে পারে; কারণ ৯০ শতাংশেরও বেশি পণ্য এফওবি পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়ে থাকে।
ক্ষতিপূরণের পক্ষে বায়ারদের প্রতিনিধিরাও
বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয়কারী কয়েকটি মার্কিন ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, শুল্কের বাড়তি খরচের অংশ যদি স্থানীয় সরবরাহকারীরা বহন করে থাকেন এবং যদি ক্রেতারা সরকারের কাছ থেকে রিফান্ড পান, তবে সরবরাহকারীদের কোনো না কোনো উপায়ে তা ফেরতের ব্যবস্থা থাকা উচিৎ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন একটি ব্র্যান্ডের, ঢাকা অফিকের কান্ট্রি ম্যানেজার টিবিএসকে বলেন, "যদি কোন সাপ্লায়ার ট্যারিফের কারণে বর্ধিত খরচের একটি অংশ বহন করেন, বর্তমানে রিফান্ডের অংশও তার পাওয়া উচিত।"
তবে তিনি মনে করেন, কোনো ব্র্যান্ড যদি অর্থ ফেরত দিতেও চায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতির কারণে ওই অর্থ সরাসরি আনার সুযোগ কম। তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী ক্রয়াদেশে প্রাইস এডজাস্টমেন্ট (মূল্য সমন্বয় করে বাড়ানো) ভালো বিকল্প হতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "এ ছাড়া বাংলাদেশি সরবরাহকারীর কোনো চালান জরুরি প্রয়োজনে বিমানে (এয়ার শিপমেন্ট) পাঠাতে হলে বা কোনো কারণে জরিমানা হলে, সেখানে ছাড় দিয়েও ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যেতে পারে।"
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বাণিজ্য ঘাটতির কথা বলে উচ্চমাত্রায় রেসিপ্রোকাল শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশের বেশি বাড়তি শুল্কের প্রস্তাব করা হয়। এরপর ১০ এপ্রিল থেকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হয়, যা আগস্টের শুরু পর্যন্ত বহাল ছিল। পরবর্তীতে এ হার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয় এবং পুনর্নির্ধারণ করে ২০ শতাংশ ও সর্বশেষ বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
এমনিতেই মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যকে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ সাধারণ শুল্ক দিতে হয়, তার ওপর এই রেসিপ্রোকাল শুল্ক অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে আসে।
নিয়ম অনুযায়ী মার্কিন আমদানিকারকেরাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই শুল্ক পরিশোধ করলেও বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দাবি, কিছু মার্কিন ক্রেতা এই খরচের অংশ ভাগ করে নেওয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ দিয়েছিলেন। অর্ডার ধরে রাখা এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখতে, তখন বাধ্য হয়েই অনেক রপ্তানিকারক সেই শর্ত মেনে নিয়ে পণ্যের দাম কমাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
