সংকটের মধ্যে কারখানা চালাতে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস চাইলো বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ
দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক শিল্প সংগঠন সরকারকে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিসংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হোক, যাতে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা যায়। এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাত বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
২৮ জুলাই পৃথক দুটি চিঠিতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কারখানাগুলোকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হোক।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোকে অনুমোদিত যানবাহনে সংযুক্ত নয় এমন খোলা সিলিন্ডার বা গ্যাস ক্যাসকেড সিলিন্ডারে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর এই অনুরোধ জানানো হলো। তিতাস জানিয়েছে, এ ধরনের গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি ২০১০ সালের গ্যাস আইন ও ২০২৬ সালের গ্যাস বিতরণ বিধিমালার লঙ্ঘন।
সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর পরিচালকদের উদ্দেশে ২৭ জুলাই দেওয়া এক চিঠিতে তিতাস জানায়, অনুমোদিত যানবাহনের বাইরে থাকা অননুমোদিত খোলা সিলিন্ডার বা গ্যাস ক্যাসকেড সিলিন্ডারে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা অবৈধ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চিঠিতে ফিলিং স্টেশন মালিকদের অবিলম্বে এ ধরনের গ্যাস বিক্রি বন্ধ করতে বলা হয় এবং গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে বিজিএমইএ
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই খাত সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় করে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে—বিশেষ করে নারীদের জন্য—এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি বলেন, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়, অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআইয়ে নেমে গেছে। ফলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ অনুরোধ জানিয়েছে, যেসব কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহ করতে চায়, তাদের এই সুযোগ দেওয়া হোক, যাতে উৎপাদন চালু রাখা এবং রপ্তানি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হয়।
তবে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, তিতাসের নির্দেশনার পর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
বিজিএমইএ দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোকে সাময়িকভাবে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সম্মতির কথা জানিয়েছে বিকেএমইএ
অন্য এক বিজ্ঞপ্তিতে বিকেএমইএ তাদের সদস্য কারখানাগুলোকে জানিয়েছে, তিতাসের নির্দেশনার বিষয়ে জানার পর সংগঠনের সভাপতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনের সভাপতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা শিল্প উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, জ্বালানি বিভাগের সচিব তাৎক্ষণিকভাবে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে আগের মতো গ্যাস সংগ্রহ করতে পারে।
বিকেএমইএ তাদের সদস্য কারখানাগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে, সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহের সময় সব ধরনের নিরাপত্তা নির্দেশনা ও সরকারি নিয়ম মেনে চলতে হবে।
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে কারখানাগুলো তাদের এলএমজি (তরলীকৃত/স্থানীয় মোবাইল গ্যাস) ব্যবস্থা পুরো সক্ষমতায় চালাতে পারে।
বিকেএমইএ আরও জানিয়েছে, বর্তমান গ্যাস সংকট ২০২৬ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলতে পারে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং পরবর্তী যেকোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে সদস্যদের অবহিত করবে।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের অন্যতম বড় গ্যাস সংকটের সময় এই আবেদন জানানো হলো। ওই অগ্নিকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
এই সংকটের কারণে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার টার্মিনালটি পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় বিকল্প যন্ত্রাংশ আমদানি দ্রুত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
@সাময়িক স্বস্তির দাবি পোশাক রপ্তানিকারকদের
এদিকে সংকট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে দেশের পোশাক শিল্পের শীর্ষ দুই সংগঠন রপ্তানির জন্য উৎপাদন চালু রাখতে সরকারের কাছে সাময়িক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার পাঠানো পৃথক দুটি চিঠিতে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) পাইপলাইনে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ না ফেরা পর্যন্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে করে সিএনজি সংগ্রহের অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোকে অনুমোদিত যানবাহনে সংযুক্ত নয় এমন খোলা সিলিন্ডার বা ক্যাসকেড সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর রপ্তানিকারকরা এই অনুরোধ জানান।
