বছরের শেষ দিকে বড় উল্লম্ফনেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি ৮৮,০০০ কোটি টাকা
শেষ দুই মাস মে ও জুনে রাজস্ব আদায়ে বড় উল্লম্ফন সত্ত্বেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি।
যদিও এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত হিসাবে আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে এবং ঘাটতির ব্যবধান কমে আসবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে রাজস্ব আদায়ের এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
সভায় এনবিআরের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আবদুর রহমান খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চূড়ান্ত হিসাব করা হলে আদায়ের পরিমাণ আরও বেশি হবে।"
তিনি বলেন, "শেষ মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে বড় প্রবৃদ্ধি এবং বকেয়া আদায়ের কারণে রাজস্বে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায়ে আরও বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তা হয়নি।"
উন্নয়ন ব্যয় কম হওয়ায় রাজস্ব আদায়ে প্রভাব
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "রাজস্বের একটি বড় অংশ আসে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অনেক কম হওয়ায় এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায়ও স্বাভাবিকভাবেই কম হয়েছে।"
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিভিন্ন কারণে মাঠ পর্যায়ে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল। এ কারণে রুটিন কাজের বাইরে তারা বড় কোনো অভিযান বা বিশেষ উদ্যোগ নিতে তেমন সাহস পাননি।
এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হলে রাজস্ব আদায় আরও কিছুটা বাড়তে পারত বলে মনে করেন তিনি।
দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির পরও চট্টগ্রাম কাস্টমসে ঘাটতি ২০,৮২৪ কোটি টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের রাজস্ব আদায়ে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৩৭ শতাংশ। তবে এরপরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি হয়েছে ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার বেশি। মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বকেয়া শুল্কের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় কাস্টমস স্টেশনটি ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আদায় করেছে। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে লাগবে নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধি
তবে বুধবার থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যে বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা অর্জন করতে হলে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি হারে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছে, তার বিবেচনায় আগামী বছরে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা অতীতে কখনোই হয়নি। বাস্তবে এত বেশি হারে রাজস্ব আদায় হবে না।"
"ফলে নতুন অর্থবছরেও বড় ঘাটতি থাকবে," বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, "সে ক্ষেত্রে হয় অতীতের বছরগুলোর মতো লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমাতে হবে, অথবা ব্যয় বাড়লে ঘাটতি অর্থায়নের উপায় বের করতে হবে, যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে।"
তার মতে, সরকার যদি ব্যয় সামাল দিতে স্থানীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য 'ক্রাউডিং আউট' প্রভাব তৈরি হতে পারে।
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নতুন অর্থবছরের জন্য করের নতুন খাত তেমন সৃষ্টি করা হয়নি। তাই রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে লিকেজ বন্ধ করা এবং ডিজিটাইজেশনে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তা করা হলেও বড় ঘাটতি থেকে যাবে।
