খুচরা ব্যবসায় ভ্যাট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা বাতিল হতে পারে
২০২৬-২৭ অর্থবছরে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর প্যাকেজ ভ্যাট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করাসহ বেশ কয়েকটি বাজেট প্রস্তাব থেকে সরে আসতে পারে সরকার। পাশাপাশি ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে।
খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর 'স্পেসিফিক ভ্যাট' নামে প্যাকেজ আকারে যে নতুন ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে সরে আসতে পারে সরকার। মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে প্রস্তুতির ঘাটতি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও আগামী করবর্ষে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩.৭৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা হতে পারে এবং তা ২০২৭-২৮ অর্থবছরেও বহাল থাকতে পারে। পরে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষের জন্য এই সীমা বাড়িয়ে ৪.৫ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ টাকা করা হতে পারে।
এছাড়া জমি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পগুলোতে জমির মালিকদের ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স কমে ৫ শতাংশ হতে পারে।
নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য বাধ্যতামূলক টিআইএনের প্রস্তাব বাতিল হতে পারে
ব্যাংক একাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার যে প্রস্তাব অর্থবিলে এসেছিলো, তা-ও বাতিল হতে পারে। ব্যক্তি করদাতাদের কর প্রদানের ধাপে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাজেট-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
খুচরা ব্যবসায় ভ্যাট আরোপের সম্ভাবনা কম
নাম না প্রকাশের শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, 'মাঠ পর্যায়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় রিটেইল পর্যায়ে নতুন করে যে স্পেসিফিক ভ্যাট আরোপের কথা ছিলো, তা এ বছর বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।'
তিনি বলেন, ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, তা এখনো সম্পন্ন হয়নি।
'ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা, হয়রানি ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা আপাতত বাস্তবায়ন না-ও হতে পারে,' বলেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে আরো স্টাডি করে তারপর বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।'
৫০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক বিক্রি বা টার্নওভার রয়েছে, এমন ব্যবসায়ীদের এলাকাভেদে বিভিন্ন ভাগে এই স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপের পরিকল্পনা ছিলো এনবিআরের। তাদের খুব সহজে ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কর্তন করার পরিকল্পনা করেছিল এনবিআর। এ লক্ষ্যে একটি নতুন বিধিমালা জারি করারও কথা ছিল।
এই ভ্যাট হওয়ার কথা ছিলো প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনা চলাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মুদি দোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে 'স্পেসিফিক ট্যাক্স'-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
এই স্পেসিফিক ট্যাক্স এক ধরনের প্যাকেজ ভ্যাট, যা আগে চালু থাকলেও পরে বাতিল করা হয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের এই পরিকল্পনাগুলোকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'খুচরা খাতকে ভ্যাটের আওতায় এনে ভ্যাটের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এটি বাস্তবায়নের ফলে যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে আগে আরও সমীক্ষা চালানো উচিত।'
সরকার করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়াতে পারে—এমন খবরের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, 'প্রস্তাবটি যৌক্তিক। আমরা (সিপিডি) মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিলাম।'
তিনি আরও বলেন, 'নিম্ন-আয়ের করদাতাদের ওপরও ৫ শতাংশ কর বহাল রাখা উচিত। নইলে মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর করের বোঝা বাড়বে।'
অনেকেরই করযোগ্য আয় নেই উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি বাতিল করা উচিত বলেও। 'ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে সেটি তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা চাপিয়ে দেবে।'
এদিকে সরকারের এই পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।
সংগঠনের নেতারা বলেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভ্যাট কর্মকর্তাদের দ্বারা ব্যাপক হয়রানির শিকার হবেন। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) ব্যবসা খাতে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেবে।
রাজধানীর মগবাজারে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনসহ সিনিয়র নেতারা নতুন এ পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
