আরো কর ছাড়ের পরিকল্পনা: ৩ মাস পরপর ভ্যাট পরিশোধ; সোনা বিক্রির ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স কমে ৫% হতে পারে
ব্যবসায়ী ও করদাতাদের জন্য বেশ কিছু কর ছাড় দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। সোনা বিক্রির আয়ের ওপর ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। কর কমতে পারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ে। এছাড়া প্লাস্টিকের কাঁচামাল—পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের ওপর বর্ধিত আমদানি বাতিল এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসের স্থলে তিন মাস পরপর ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের বিধানও আসতে পারে। বিশেষ ছাড় আসতে পারে তামাক কোম্পানির সম্পূরক শুল্কেও। এছাড়া আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল হতে পারে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাশ করার সময় এসব পরিবর্তনের ঘোষণা আসতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর বাইরে ব্যক্তি খাতের করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আগামী দুই করবর্ষের জন্য ৪ লাখ টাকা, পরবর্তী দুই বছরের জন্য ৪.৫ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষের জন্য ৫ লাখ টাকা হতে পারে।
এর বাইরেও কিছু ক্ষেত্রে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের ছাড় দিয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত অর্থবিল জাতীয় সংসদে পাশ হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকের বলেন, 'প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব জায়গায় করদাতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে, এসব ক্ষেত্রে করহার কমানো বা আরো সহজ করার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। এর অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত করহার আরো কমানো হতে পারে।'
অবশ্য এর ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বেশিরভাগ করদাতাই কর রিটার্নে ৩০ থেকে ৪০ ভরি পরিমাণ স্বর্ণ দেখান, যার বেশিরভাগই হয়তো ভুয়া। পরে কোন ব্যয় হলে তা সোনা বিক্রির মাধ্যমে হয়েছে বলে সাধারণত দেখানো হয়। এতদিন এর উপর কোনো কর ছিল না।
বাজেটে প্রস্তাবে সোনার বিক্রয়মূল্য থেকে ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে বাকি টাকাকে ক্যাাপিটাল গেইনস হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের কথা বলা হয়েছিল। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করে আসছিলেন।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এই করের হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে অর্ধেক করা হতে পারে।
এছাড়া স্থানীয় উৎপাদকনকারীদের সুরক্ষা দিতে সরকার পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিন আমদানির ওপর শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছিল। তবে প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারকদের আপত্তির মুখে এই শুল্ক আবার আগের জায়গায় আনা হতে পারে।
পাইপ, পানির ট্যাংক, প্যাকেজিং সামগ্রী, স্বাস্থ্যসেবা পণ্য, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, পানীয়ের বোতল ও ওষুধের মোড়ক তৈরির জন্য এ দুটি কাঁচামালই অপরিহার্য। খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।
অনলাইন বিজ্ঞাপনে বর্তমানে দেশে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। তবে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই হার যথাক্রমে ৯ শতাংশ ও ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে ভ্যাটের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওই দেশগুলোর মাধ্যমে অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করে থাকে। এ কারনে বাংলাদেশ রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হতো। এজন্য এই হার কমিয়ে দেশে এ খাত থেকে আরো বেশি পরিমাণে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থেকে সরে আসছে সরকার
আবাসন খাতে অতীতে কোনো বিনিয়োগ হলে দলিলমূল্যের বাইরে কেউ যদি প্রকৃত মূল্য দেখায় বা বাড়তি অর্থ দেখায়, তাহলে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোন সংস্থা প্রশ্ন করবে না বলে যে বিধান আনা হয়েছিল, সমালোচনার মুখে তা বাতিল করা হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বিধান অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ পাচারের বা বৈধ করার একটি সুযোগ তৈরি করে দেবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলো গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ।
বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের আইনি সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে এনবিআর চেয়ারম্যান বারবার দাবি করলেও, আয়কর বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব এখন পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই বিধান বাতিল হলে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, প্রযোজ্য করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে যেকোনো খাতেই অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কোনো দায়মুক্তি পাবেন না। অর্থাৎ যেকোনো সংস্থা ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারবে। যার ফলে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ কার্যত বন্ধই থাকছে।
