৩% সুদের সীমায় বাণিজ্য অর্থায়ন অলাভজনক হয়ে যেতে পারে, বলছেন ব্যাংকাররা; সংশোধনের দাবি
বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্য অর্থায়নের (ফরেইন কারেন্সি ট্রেড ফাইন্যান্স) ওপর সম্প্রতি আরোপিত সর্বোচ্চ সুদের হার পুনর্বিবেচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আহ্বান জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অভ ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটি বলছে, এই সীমার কারণে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যাংকগুলোর জন্য বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়তে পারে।
১৪ মে এক চিঠিতে ব্যাংকারদের সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বাণিজ্য অর্থায়নে সর্বোচ্চ সুদের হার সোফর-এর সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ করে—অর্থাৎ সোফর+৩%—নির্ধারণের বিষয়টি সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছে। এবিবির চিঠির একটি কপি টিবিএসের হাতে এসেছে।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, সংশোধিত এই সুদের সীমার কারণে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য অর্থায়নের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে সার্বিক বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্য অর্থায়ন হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত এক ধরনের ব্যাংক ঋণ। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা আমদানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়ন সংগ্রহ করে থাকেন।
দেশের আমদানিকারকরা সাধারণত ইউপিএএস (ইউজেন্স পেয়েবল অ্যাট সাইট) ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য অর্থায়নের ওপর নির্ভর করেন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সার্কুলারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, বাণিজ্য অর্থায়নের সুদের হার কোনোভাবেই 'সোফর প্লাস ৩ শতাংশ'-এর বেশি হতে পারবে না। এর আগে এই সীমা ছিল 'সোফর প্লাস ৪ শতাংশ'।
এই সার্কুলারের আগে ব্যাংকগুলো ইউপিএএস এলসির বিপরীতে প্রায় ৭.৫১ শতাংশ সুদ নিতে পারত। নতুন প্রজ্ঞাপনের পর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৫১ শতাংশ। অন্যদিকে দেশীয় মুদ্রায় ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ১২-১৩ শতাংশ সুদ নিতে পারে।
'নতুন সীমায় ট্রেড ফাইন্যান্সিং পরিচালনা করা কঠিন'
বেশ কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা টিবিএসকে বলেন, সংশোধিত এই সুদহারের সীমার মধ্যে থেকে বাণিজ্য অর্থায়ন করে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
তারা বলেন, দেশের যেসব ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট আছে, তারা আমদানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রার অর্থায়ন প্রদান করতে পারে। তাছাড়া ব্যাংকগুলো বিদেশি ব্যাংক থেকে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে ফান্ড নিয়ে আসে; তাতে সুদ খরচ পড়ে সোফর প্লাস ২.৫–২.৭৫ শতাংশ। এছাড়া স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিওর (এসএলআর) ব্যয় যোগ করার পর এই অর্থায়নের প্রকৃত খরচ বেড়ে প্রায় সোফর প্লাস ২.৮০ শতাংশে দাঁড়ায়।
সুদের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় মুনাফার মার্জিন অনেক কমে যাবে বলে জানান ব্যাংকাররা। তারা আরও বলেন, প্রতি ডলারে অন্তত ১ টাকা মুনাফার মার্জিন রেখে ব্যবসা করার সুযোগ না দিলে ব্যবসা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়ার কারণে বিদেশ থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ করতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ব্যাংকাররা।
চলতি মাসের শুরুতে ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিংয়ের আউটলুক 'স্থিতিশীল' থেকে পরিবর্তন করে 'ঋণাত্মক' করেছে। তবে তারা দেশের 'বি প্লাস' রেটিং অপরিবর্তিত রেখেছে।
ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বলেন, এমন রেটিং সংশোধনের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো প্রায়ই ডলারের অর্থায়ন করতে অনাগ্রহ দেখায়। ফলে এলসির কনফারমেশন চার্জ ব্যয় বাড়ে।
একজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন, আমদানিকারকদের বড় একটি অংশ ডলারে ঋণের ওপর নির্ভরশীল। 'এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, যে বিদেশি ব্যাংক থেকে ডলার নেওয়া হয়, তারাই সোফর প্লাস ৩ শতাংশ সুদ দাবি করবে। কারণ ফিচের রেটিং খারাপ এসেছে,' বলেন তিনি।
ওই ব্যাংকার আরও বলেন, ব্যাংকগুলো ডলারে ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারে এবং এর পরিবর্তে গ্রাহকদের দেশীয় মুদ্রায় অর্থায়ন করতে পারে।
এদিকে আমদানিকারকেরা বলেন, টাকার ঋণের চেয়ে ডলারে অর্থায়ন সস্তা হওয়ায় তারা ইউপিএএস এলসি করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তারা সতর্ক করে বলেন, সুদের হারে ক্যাপ বসিয়ে দেওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো যদি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোর মাধ্যমে ডলার সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে অর্থায়নের সংকট আরও ঘনীভূত হবে। অন্যদিকে টাকায় ঋণ বিতরণ বেড়ে গেলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, চিঠিটি পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে সুদের হার আরও কমিয়ে ২ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছিল, পরে তা ৩ শতাংশ করা হয়।
সম্ভাব্য প্রভাব
এবিবি তাদের চিঠিতে সতর্ক করে বলেছে, সুদের এই নতুন সীমা মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাংকগুলো যদি ডলারে ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেয়, তবে আমদানিকারকেরা দায় মেটানোর জন্য ডলার কিনতে টাকায় ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে এবং টাকার মান আরও কমে যাবে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, টাকায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেলে স্থানীয় বাজারে সুদের হার বেড়ে যেতে পারে। ফলে তারল্য সংকট ও বিনিময় হারের চাপের মধ্যে ব্যবসার সার্বিক ব্যয় বাড়বে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সুদের এই সীমার কারণে বৈশ্বিক ঋণদাতারা আরও বেশি ঝুঁকি-বিমুখ হয়ে উঠতে পারে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাণিজ্য অর্থায়নের ব্যয় এমনিতেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ৩ শতাংশ সীমার মধ্যে থাকার জন্য মুনাফা কমানোর চাপ দেওয়া হলে বিদেশি ঋণদাতারা বাংলাদেশের বাজারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
এসব উদ্বেগের কথা বিবেচনায় নিয়ে এবিবি বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্কুলারটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
সুদের সীমা বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে: অর্থনীতিবিদ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্য অর্থায়নের বাইরের উৎসগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বাণিজ্য অর্থায়নে সুদের যে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কোনো না কোনো পক্ষকে সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দিষ্ট সুদসীমার মধ্যে থেকে অনেক ব্যাংকের পক্ষেই ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ এ সেগমেন্টে কোনো প্রতিষ্ঠানই লোকসান দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে না।
'ফলে বিদেশ থেকে যে টাকা আসত, সেটা বন্ধ হয়ে যাবে' উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন আরও বলেন, 'ট্রেড ফাইন্যান্সের সুবিধা সংকুচিত হয়ে গেলে আমদানিকারকদের টাকার বিপরীতে বাজার থেকে ডলার কেনার প্রয়োজন হবে। তখন টাকার চাহিদা বেড়ে যাবে, যেটা ট্রেড ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে দরকার ছিল না।'
