বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে
চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে— যা ব্যবসায়িক আস্থা কমে যাওয়া, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবসা কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করার গভীর সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি।
তারা আরও বলেন, মার্চ মাসে জ্বালানি সংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা দেয়, যার ফলে আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত হ্রাস পায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সেটি ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির থাকে, তবে মার্চে এসে তা হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে বেসরকারি খাতে মোট আউটস্ট্যান্ডিং লোনের (ঋণের স্থিতি) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ কোটি টাকা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'মূল প্রবণতা বলছে এটি বাড়ছে না। এখানে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত—দুই ধরনের উপাদানই কাজ করছে।'
তিনি বলেন, 'প্রয়োজনীয় উপাদান হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা নির্বাচনের পর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত উপাদানগুলো—যেমন ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, লজিস্টিক নীতি এবং আরও অনেক বিষয়—এগুলোতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।'
তিনি জানিয়েছেন, মার্চ মাসে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'এই সমস্যাগুলো আগে থেকেই ছিল, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং অন্যান্য বিষয়গুলো অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করে আসছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৪ বছরের মধ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না।
তিনি জানান, নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ ও গাজী গ্রুপসহ বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে ব্যাংক ঋণের চাহিদা কমেছে। তিনি বলেন, 'কারখানাগুলো চালু থাকাকালে তারা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করত। কিন্তু এখনো যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে, তাদের উৎপাদনও ৬০–৭০ শতাংশ কমে গেছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকাররা
বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে তারা এখনো স্পষ্ট ধারণা পাননি।
ব্যাংকাররা বলেন, ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত অনেকাংশে নির্ভর করে সামগ্রিক নীতিগত স্পষ্টতার ওপর—যার মধ্যে সুদের হার, বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতির প্রবণতা অন্তর্ভুক্ত।
তারা ব্যাখ্যা করেন, ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ বা উদ্যোগের জন্য ঋণ চাইলে ব্যাংকগুলো সামগ্রিক নীতিগত পরিবেশ, ঋণ গ্রহণের খরচ এবং মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য অবস্থান বিবেচনা করেই অর্থায়নের অনুমোদন দেয়।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, গভর্নর ঋণের সুদের হার কমানোর কথা বলেছেন, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এটি কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও সমালোচনা করে বলে, স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় ধরে রেখেছে।
আরেকজন এমডি বলেন, সংকটকালীন সময়ে ট্রেড ফাইন্যান্সে সুদের হার ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় দাঁড়িয়েছে 'সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট' (এসওএফআর)-এর সঙ্গে ২.৫ শতাংশ যোগ করে। আর ইউপাস—যা বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক আমদানি অর্থায়নের একটি ব্যবস্থা—এ অতিরিক্ত সীমা আরোপ অর্থায়নের সুযোগ আরও সীমিত করবে।
তিনি বলেন, 'যদি ইউপাসের মাধ্যমে অর্থায়ন কঠিন হয়ে যায়, তবে ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় ১২–১৩ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে এতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে, এজন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুদের হার কমানো হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সঠিক নয়—এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত।'
আরেক ব্যাংক এমডি বলেন, ব্যবসা ও ব্যাংকগুলোর কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল অগ্রাধিকার—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো নাকি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো—তা এখনো অস্পষ্ট।
'নির্বাচনের পর অনেক নতুন প্রকল্প আসবে বলে প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি,' তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের ব্যাংক থেকে ব্যাপক ঋণ গ্রহণ সুদের হার আরও বাড়াতে পারে এবং বেসরকারি ঋণগ্রহীতাদের বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে। 'আগামী ছয় মাসে বিনিময় হার কোথায় দাঁড়াবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে,' তিনি যোগ করেন।
আরেকজন ব্যাংক এমডি বলেন, অনেক বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নীতি সহায়তা চেয়েছে, যা তাদের আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, 'যখন কোনো কোম্পানিকে নীতি সহায়তা নিতে হয়, তখন ব্যাংকগুলো তাদের অর্থায়নে কম আগ্রহী হয়। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।'
ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আয় বাড়াতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে।
একই সময়ে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে, যার মধ্যে অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিয়মিত ঋণসূচির বাইরে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সীমিত বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগের কারণে ব্যাংকগুলো কার্যত ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ আয় করছে।
অনেক প্রচলিত ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ এখন এই খাত থেকেই আসছে।
২০২৫ সালের শুরুতে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল ঋণ চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকগুলো মূলত ঋণ সম্প্রসারণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয়ের মাধ্যমে বেশি মুনাফা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এপ্রিলে তা মাসিক ভিত্তিতে ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পূর্বে ইস্যুকৃত ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। ফলে এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।
