ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বাড়ায় সরকারের ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়েছে
রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি ও তারল্য সংকোচনের আশঙ্কায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কম সুদে সরকারকে আর ঋণ দিতে চাচ্ছে না, এতে সরকারি ঋণের খরচ দ্রুত বাড়ছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এ হারে নিলামের মাধ্যমে ৩,০০০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে সরকার। মার্চে এই হার ছিল ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, মূলত সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার আসার পর থেকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন সরকারের অর্থের চাহিদা বেশি।
এদিকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় সরকারের কোষাগারে চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় রেকর্ড ৯৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবছর শেষ হতে আরও তিন মাস বাকি। সম্ভাব্য ঘাটতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে মোট ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলো সরকারকে সস্তায় ঋণ দেবে না। সরকার ইতোমধ্যে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে ঋণ নিয়েছে এবং জুন পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতেও উদ্বৃত্ত তারল্য বেশি নেই, ফলে সরকার ঋণ নিলে চাপ তৈরি হয়।"
ব্যাংকাররা জানান, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ।
এক বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সামনে সরকার আরও ঋণ নেবে—এমন ধারণা থেকেই ব্যাংকগুলো ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বেশি রিটার্ন চাইছে।
তিনি বলেন, "কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনছে, কারণ ওই ব্যাংকগুলোর তহবিলের চাহিদা বেশি। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য আছে—এমনটা বলা যায় না। তাই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বেড়েছে।"
ঋণের সুদহারে প্রভাব
ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বাড়ে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা মনে করছেন, নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদের হার কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা শিগগিরই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কারণ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হারই অন্যান্য ঋণের বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, "সরকার এখন অর্থসংকটে রয়েছে। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। তাই সরকারকে আরও ঋণ নিতে হবে।"
তিনি বলেন, "ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সুদের হার বাড়বে, আর ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বাড়বে।"
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম
এদিকে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরপর দুই মাস প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণও কমছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে টিকে থাকতে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে হয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় তারা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যেখানে তুলনামূলক বেশি সুদ ও নিশ্চিত রিটার্ন পাওয়া যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণের সুদের হার বেশি থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন বিনিয়োগ আরও কমে যেতে পারে।
