অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি ব্যয় কমেছে ৭,২৮৭ কোটি টাকা
সরকারের উন্নয়ন বাজেট ব্যয়ে ধীরগতি পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। রোববার প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এডিপির অর্থ ব্যয় হয়েছে ৭৫,৬০৭.২৪ কোটি টাকা—যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭,২৮৭ কোটি টাকা কম।
আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল না। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়। অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ছেড়ে যান, ফলে এডিপি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। ওই সময়ে এডিপি বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়েছিল ৮২,৮৯৪.০৮ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানান, এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে, যা স্বাভাবিক সময় হিসেবে বিবেচিত, এডিপি থেকে ব্যয় হয়েছিল ১,০৭,৬১২.৪৫ কোটি টাকা।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপির বাস্তবায়ন হার কমেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ৩৬.১৯ শতাংশ, যেখানে গত অর্থবছরে ছিল ৩৬.৬৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪২.৩০ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২,০৮,৯৩৫.৫৩ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি, দুর্নীতির অভিযোগে সরে যাওয়া এবং নতুন পরিচালক নিয়োগে সময় লাগায় কাজের গতি কমে যায়। পাশাপাশি অনেক প্রকল্প সংশোধন করতে হওয়ায় কার্যক্রম পুনরায় শুরুতে বিলম্ব ঘটে। নতুন সরকারি ক্রয়নীতির কারণে দরপত্র প্রক্রিয়াও ধীর হয়েছে। এসব কারণে এডিপির বরাদ্দ লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলমান প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আগামী মাসের মধ্যে প্রায় ১,৩০০ প্রকল্পের যাচাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অনেক প্রকল্পের বরাদ্দ আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের গতি আরও কমতে পারে বলে মনে করছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, "নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন হওয়া স্বাভাবিক। আগের সরকারের নীতির ভিত্তিতে নেওয়া প্রকল্পগুলো নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে না মিললে সেগুলো সংশোধন বা বাতিল হতে পারে।"
তিনি বলেন, "এ প্রক্রিয়ায় কিছু প্রকল্প বাদ পড়তে পারে, আবার খাল পুনঃখনন বা পানি ব্যবস্থাপনার মতো অগ্রাধিকার প্রকল্প যুক্ত হতে পারে। তবে এ কাজ শেষ করতে সময় লাগবে, ফলে স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নের গতি বাড়ার সম্ভাবনা কম।"
তিনি আরও বলেন, "শুধু বাস্তবায়নের হার বাড়াতে তড়িঘড়ি করে ব্যয় বাড়ানো উচিত নয়। বরং সময় নিয়ে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে দীর্ঘমেয়াদে তা বেশি কার্যকর হবে।"
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৪২,২৯৩ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৩৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৪৪,৩৭৬ কোটি টাকা (৩২.৮৭ শতাংশ)।
জুলাই-মার্চ সময়ে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ব্যয় হয়েছে ২৮,৮৬০ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৪০.০৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৩২,৪১১ কোটি টাকা (৪০.০১ শতাংশ)।
এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় হয়েছে ৪,৪৫৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ৬,১০৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে মোট বরাদ্দের ৭০.৯৭ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়নের ওপরই মূলত এডিপির সামগ্রিক অগ্রগতি নির্ভর করে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সবচেয়ে কম ব্যয় করেছে—প্রথম ৯ মাসে তারা বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যবহার করেছে। রেল মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২৩.৬৪ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪.৯৯ শতাংশ।
অন্যদিকে ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যে ব্যয় করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (৩১.৩৯ শতাংশ), কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (৩৩.৫৬ শতাংশ) এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় (৩৫ শতাংশ)।
৪০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় (৫৩ শতাংশ), কৃষি মন্ত্রণালয় (৫৫ শতাংশ), সেতু বিভাগ (৪৭ শতাংশ), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (৪৫.৫৬ শতাংশ), নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় (৪১.২৮ শতাংশ), পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় (৫১.৭২ শতাংশ), বিদ্যুৎ বিভাগ (৪২.১৭ শতাংশ) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ (৪৮.৬৬ শতাংশ)।
