প্রতিবাদ সভা, ‘মব’, গভর্নর নিয়োগ ও বিদায়: বাংলাদেশ ব্যাংকে দিনভর যা হলো
বিভিন্ন দাবি, তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে আজ বুধবার সকালে প্রতিবাদ সভা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন থেকে চারশ কর্মকর্তা। তাদের অভিযোগ, গভর্নরের 'স্বৈরাচারী' পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের এই অবস্থান। এ নিয়ে দিনভর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উত্তেজনা চলে। এমন দৃশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অতীতে কখনো দেখা গেছে বলে জানা নেই সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একদিন আগে ব্যাংকের অফিসার্স কাউন্সিলের তিন কর্মকর্তাকে প্রধান কার্যালয় থেকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তারা হলেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক মাসুম বিল্লাহ ও গোলাম মোস্তফা। এই তিন জনের দুজনই ব্যাংকের অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতৃত্বে রয়েছেন।
ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলাকালে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা হয়।
একই দিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সংবাদ সম্মেলন ডাকে। সেই সম্মেলনে কাউন্সিলের নেতারা গভর্নরকে 'স্বৈরাচার' আখ্যা দিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও ব্যাংক মার্জার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন।
সংবাদ সম্মেলন ডাকার এখতিয়ার কর্মকর্তাদের আছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এক আইনজীবীর মতামত নেওয়া হয়। তার মতামত অনুযায়ী তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয় এবং ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। অন্যদিকে শোকজের পরদিনই তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ
আজ সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের সামনে তিন শতাধিক কর্মকর্তা প্রতিবাদ সভায় জড়ো হন। সভায় কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, 'গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। গতকাল আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য ওনার কাছে গেলেও উনি দেখা করেন না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আমাদের শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।'
প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, 'আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওনার (গভর্নর) অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে ওনাকে জবাবদিহি করতে হবে।'
এ সময় শোকজ ও বদলি প্রত্যাহারের দাবি জানান শাহরিয়ার সিদ্দিকী। তা না হলে সবাইকে শোকজ ও বদলির দাবি জানান।
একটি 'কুচক্রী মহল' মার্জ হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যর্থ করতে চায়: বিদায়ী গভর্নরের পাল্টা বার্তা
কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভা শেষ হতেই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি দাবি করেন, একটি 'কুচক্রী মহল' মার্জ হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে সেগুলো আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরে যায়।
গভর্নরের ভাষ্য, ব্যাংক একীভূতকরণ ও দুর্বল ব্যাংক উদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড 'ষড়যন্ত্র' ও 'অপপ্রচার'। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই সরকারি নীতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তোলার। এটি তাদের আওতাভুক্ত বিষয় নয়। যারা অপপ্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, শোকজের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করব, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানবো না— এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
গভর্নর বলেন, 'সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং সামগ্রিক বাজার স্থিতিশীল রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কৌশলগত ও আবশ্যিক দায়িত্ব। এজন্য ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়া হয়েছে। এই হস্তক্ষেপ না করা হলে আমানতকারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করত। এই আর্থিক সহায়তা কোনো একক ব্যাংকের জন্য নয়, বরং গোটা খাতের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এরপরও এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই এসব বিষয়ে কথা বলার। এজন্য তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
নিজের পদত্যাগের দাবির প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, 'পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।'
দুপুরের পর নতুন গভর্নর গুঞ্জন
দুপুর দেড়টার পর থেকেই ব্যাংক পাড়ায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আহসান এইচ মনসুর সংবাদ সম্মেলন শেষে নিজের কক্ষে ফিরে যান। এ সময় একটি গণমাধ্যমে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের খবর প্রচার করা হয়। কিছুক্ষণ পরই একাধিক টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমেও এ খবর প্রচার করা হয়।
দুপুর ২টায় আহসান এইচ মনসুরের ভবন ত্যাগ
সংবাদ সম্মেলন শেষে গভর্নর নিজের কক্ষে ছিলেন। কয়েকজন সাংবাদিক তখন গভর্নর ভবনের ওয়েটিং রুমে ছিলেন মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো তথ্য এসেছে কি না, তা জানতে।
গভর্নরের ব্যক্তিগত সহকারী কামরুল ইসলাম জানান, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী যমুনা টিভিকে সাক্ষাৎকার দেবেন গভর্নর। এ সময় যমুনা টিভির দুজন প্রতিনিধিও সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন।
গভর্নরের কক্ষে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নতুন গভর্নর নিয়োগের খবরের মধ্যেই গভর্নর কর্মকর্তাদের ডেকে বলেন, 'অবসরে না বসে থেকে যতক্ষণ থাকবেন, কাজ করবেন'। তিনি সে সময় কয়েকটি ফাইলে সইও করেন।
নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর দেখে ডেপুটি গভর্নরেরা আহসান এইচ মনসুরকে বাসায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। ওয়েটিং রুম থেকে দেখা যায়, ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, হাবিবুর রহমান ও কবির আহমেদ তাকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেন।
উপদেষ্টাকে 'মব' করে বের করে দেওয়া
দুপুর ৩টার দিকে আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ তার কক্ষে ছিলেন। এ সময় নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার আলম ও এসএমই বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা তার কক্ষে গিয়ে জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত, তাকে নিরাপদে এগিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা 'মব' তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। তারা 'ধর ধর' বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন।
আহসান উল্লাহ জানান, দুই কর্মকর্তাই আগে তার অধীনে কাজ করেছেন, তাই তাদের অনুরোধে তিনি বেরিয়ে যান। নিচে নেমে তিনি দেখেন ৩০-৪০ জন কর্মকর্তা অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে দুয়েকজনের আচরণ ছিল উচ্ছৃঙ্খল। এ সময় তৌহিদুল নামে এক কর্মকর্তা উচ্চস্বরে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে তার গাড়ির সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।
আহসান উল্লাহ বলেন, 'এমন কর্মকাণ্ড দেখে আমি মর্মাহত। এই প্রতিষ্ঠানেই আমি কর্মজীবন শেষ করেছি। ব্যাচে প্রথম হয়ে যোগদান করেছি। ২০১২ সালে ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হলেও বিএনপির পরিবারের অজুহাতে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।'
তিনি জানান, সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান তাকে যেতে দেননি, পরবর্তীতে ফজলে কবিরের সময়ও ছিলেন। রউফ তালুকদার যোগ দেওয়ার পর তিনি নিজেই আর কন্টিনিউ করেননি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আহসান এইচ মনসুর তাকে উপদেষ্টা হিসেবে ডাকেন।
তার দাবি, 'আমরা খাদের কিনারের অর্থনীতি থেকে দেশকে তুলে এনে ৩৫ বিলিয়ন রিজার্ভে উন্নীত করেছি। আমার ক্যারিয়ারে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই।'
তিনি জানান, নতুন গভর্নরের অধীনে তার কাজ করার ইচ্ছা নেই।
