প্রশাসন ক্যাডারের বিরোধিতায় কি ঝুলে যাচ্ছে এনবিআর ভাগ করা?
বহুল আলোাচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগে ভাগ করার পর তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে জটিলতার মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের ঠিক আগে এসে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিরোধিতায় এর বাস্তবায়ন ঝুলে যাচ্ছে।
গত ২৮ জানুয়ারি এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাতজন সচিবকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন তানভীর আহমেদ নামে একজন যুগ্ম সচিব। এতে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের অনুরোধও জানানো হয়।
সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তাদের একটি অংশ অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাত করে নির্বাচনের আগে দুই বিভাগে নতুন করে সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিলের করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দুই বিভাগে দুই সচিব নিয়োগসহ অন্যান্য কার্যক্রম কার্যত এই সরকারের সময়ে ঝুলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে এনবিআরের একাধিক সূত্র। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নতুন সরকার আসার পর এই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ—রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গঠনের অধ্যাদেশ জারি সরকার। তবে সে সময় এনবিআর কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে সরকার সিদ্ধান্ত সংশোধন করে এবং গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর পরিমার্জিত অধ্যাদেশ জারি করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে এনবিআরের নিজস্ব দুটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অন্তত একটি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ পাওয়ার পথ সুগম করা হয়।
গত ২০ জানুয়ারি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় নতুন দুই বিভাগের কাঠামো, জনবল ও কার্যপদ্ধতি অনুমোদন করা হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী, নিকার সভায় এ ধরনের কোনো প্রস্তাব উত্থাপনের আগে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন নিতে হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় এই নিয়মটি যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্রমতে, সচিব নিয়োগ ও অন্যান্য কার্যক্রম ঝুলে থাকায় এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ফলে নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্বে এলে এ উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব আবদুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে এনবিআর ভেঙে দুই ভাগ করার পর বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের সাসপেন্ড করা হয়েছিল, তাদেরকে লঘু দণ্ড দিয়ে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এনবিআর দুই ভাগ করার সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান ছিল—এনবিআরের এমন একজন সদস্য গতকাল (২ ফেব্রুয়ারি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, 'শেষ সময়ে এসে প্রশাসন ক্যাডারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা করা হচ্ছে না—এটা বাস্তব। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এটি বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা তো এমনিতেই কমে যায়।'
নির্বাচনের আগে সম্ভবত দুই বিভাগের বাস্তবায়ন ঝুলে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'যদি দেড়-দুই মাস আগেও এটা করা হতো, তাহলে বর্তমানের পরিস্থিতি তৈরি হতো না।'
তবে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে দুটি সভার সিদ্ধান্ত হলেও তা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অনাগ্রহে সম্পন্ন হয়নি বলে জানিয়েছে সূত্র।
এনবিআরের অপর একজন সিনিয়র কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, তিনি শুনেছেন যে নীতি বিভাগের সচিব পদটি প্রশাসন ক্যাডার থেকে এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদটি এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তবে প্রশাসন ক্যাডার সম্ভবত দুটি সচিব পদের ওপরই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদের পাঠানো আইনি নোটিশেও এর সত্যতা পাওয়া যায়।
এই কর্মকর্তার পক্ষে ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাটের পাঠানো ওই নোটিশে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশটি সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিবেচনা থেকে বাদ দিয়ে তাদের পদোন্নতির অধিকার, চাকরির শর্তাবলি, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাকে বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সংকুচিত করেছে।
নোটিশে অবিলম্বে এই অধ্যাদেশ বাতিল বা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া 'বিতর্কিত অধ্যাদেশের' আলোকে রাজস্ব নীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে কোনো সচিব নিয়োগ বা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়।
তিন দিনের মধ্যে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয় এতে।
দণ্ড দিয়ে ফেরত আনা হচ্ছে এনবিআর কর্মকর্তাদের
আইআরডির এক নির্দেশনায় এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা ট্যাক্স ক্যাডারের অতিরিক্ত কমিশনার সেহেলে সিদ্দিকাকে দুটি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কর্তন ও এক বছরের পদোন্নতি স্থগিত করে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
আরও প্রায় ২৫ জন কর্মকর্তাকেও একই রকম দণ্ড দিয়ে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে জানান।
আইআরডির এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সেহেলা সিদ্দিকা হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক বার্তার মাধ্যমে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পরিত্যাগ করে রাজস্ব ভবনে আসতে বাধ্য করতে সংগঠনের ভুমিকা পালন করেন। সরকারি কর্মচারি আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী এটি অসদাচরণের শামিল।
আন্দোলন চলাকালে তিনি কর্মকর্তাদের প্ল্যাটফর্ম 'এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ'-এর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বেতন গ্রেড দুই ধাপ অবনমিত করে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রহ্যাতার করা হয়েছে।
ওই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচজন এনবিআর কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাদের আর চাকরিতে ফেরত আসার সুযোগ নেই বলে জানা গেছে।
