চট্টগ্রামে ঈদ বাজারে নারীদের পছন্দের শীর্ষে পাকিস্তানি পোশাক, বাড়ছে আমদানি
কয়েক বছর আগেও ভারতীয় টেলিভিশন সিরিয়ালের আলোচিত চরিত্রের নামে পোশাক বাংলাদেশে ঈদ বাজারে ছেয়ে যেত। পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি পাল্টেছে। ভারতীয় পোশাকের চেয়ে পাকিস্তানি পোশাকের কদর বেড়েছে ঈদ বাজারে।
চট্টগ্রাম নগরীর নামা-দামি সব শপিংমলের থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, গাউনের মতো নারীদের পোশাকের দোকানে হরদম বিক্রি হচ্ছে এসব পাকিস্তানি পোশাক।
জতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যও বলছে, এবারের ঈদের বাজারে ভারতীয় পোশাকের দ্বিগুণের বেশি আমদানি হয়েছে পাকিস্তানি পোশাক। তবে ভারতীয় পোশাকের চাহিদা কমলেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
চট্টগ্রাম নগরীর স্যানমার ওশান সিটি, ফিনলে স্কয়ার, বালি-আর্কেডসহ ছোট বড় সব শপিংমলের নারীদের পোশাকের দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাক। প্রতিটি শপিংমলে এবার ভারতীয় পোশাকের চেয়ে পাকিস্তানি পোশাকের কদর বেশি। পাকিস্তানের পোশাকের পাশাপাশি ভারতীয় মুম্বাইয়ের পোশাকও বেশ বিক্রি হচ্ছে।
পাকিস্তানি পোশাকের মধ্যে ফারসি, মারিয়া, সাতরাহা, কারিজমা ও হোসনেআরা নামের পোশাকের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ভারতীয় পোশাকের মধ্যে কারচুপি, জারদোসি ও হাতের কাজ করা পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।
নগরীর স্যানমারওসান সিটি মার্কেটে সুপার নুর ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক লায়ন আকলিমা আক্তার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)-বলেন, 'এবারের ঈদে পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বেশি। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ও মুম্বাইয়ের পোশাকও বেশ বিক্রি হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'পাকিস্তানি পোশাকের মধ্যে ফারসি, মারিয়া, সাতরাহা, কারিজমা ও হোসনেআরা নামের পোশাকের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান পোশাকের মধ্যে কারচুপি, জারদোসি ও হাতের কাজ করা পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। এসব পোশাকের দাম ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।'
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশে ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪৯ পিস মেয়েদের পোশাক আমদানি হয়েছে।
এসব পোশাক আমদানি করা হয়েছে- ভারত, পাকিস্তান, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ ১১টি দেশ থেকে। তবে এসব পোশাকের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে পাকিস্তান ও ভারত থেকে।
আর পাকিস্তান থেকে আমদানি হয়েছে মোট পোশাকের প্রায় ৬৭ শতাংশ। আর ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২৮ শতাংশ।
একই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক আমদানি হয়েছে পাকিস্তান থেকে। গত আট মাসে দেশটি থেকে থ্রি-পিস আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৩ পিস। এসব ড্রেসের আমদানিকারক ঘোষিত মূল্য ছিল ২৮ লাখ ৮১ হাজার ২৩০ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।
আর ভারত থেকে থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, গাউন, ফ্লোর টাচ গাউনসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২২৬ পিস। এসব পোশাকের আমদানিকারক ঘোষিত মূল্য ১৫ লাখ ১১ হাজার ৭৩০ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮ কোটি ৪৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
নগরীর বালি আর্কেডের একই মার্কেটের লেডিস কেয়ারের বিক্রেতা মোহাম্মদ সুমন টিবিএসকে জানান, ক্রেতারা বেশি খুঁজছেন পাকিস্তানি পোশাক, বিশেষ করে অর্গানজা থ্রিপিস ও সুতার ম্যাটেরিয়ালের পোশাকের চাহিদা বেশি।
এই শপিংমলের আসা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী সাদিয়া সিদ্দিকী টিবিএসকে বলেন, 'পাকিস্তানি পোশাকের কাটিং ভালো এবং ডিজাইনে ভ্যারিয়েশন বেশি। আর মানও ভালো। এজন্য আমাদের পছন্দ পাকিস্তানি পোশাক।'
এনবিআরের তথ্যমতে, পাকিস্তান ও ভারতের পর সবচেয়ে বেশি নারীদের পোশাক আমদানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এ দেশ থেকে গত আট মাসে আমদানি ৩৬ হাজার ৪৯০ পিস পোশাক ঘোষিত মূল্য ৯৪ হাজার ৮৯১ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
একই সময়ে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ৩৪ হাজার ৮৮৬ পিস পোশাক। এসব পোশাকের আমদানিকারক ঘোষিত মূল্য ৯৪ হাজার ৮৯১ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
এছাড়া যুক্তরাজ্য থেকে ৩১৩৫ পিস, মালয়েশিয়া থেকে ১৬৫৫ পিস, থাইল্যান্ড থেকে ৫০ পিস, জার্মানি থেকে ২২ পিস, হংকং থেকে ২০ পিস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭ পিস এবং সাউথ আফ্রিকা থেকে ৫ পিস ড্রেস আমদানি হয়েছে। এই ৪৮৯৪ পিস পোশাকের আমদানিকারক ঘোষিত মূল্য ১৭ হাজার ৩৯৫ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১ লাখ ২২ হাজার ১৯০ টাকা।
নগরীর বালি আর্কেডের লেডিস পয়েন্ট দোকানের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'তরুণীদের মধ্যে পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাকের চাহিদা বেশি। তবে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পাকিস্তানি। এছাড়া ফারসি, সারারব ও জারারা ধরনের পোশাকৗ কিনছেন ক্রেতারা।'
তিনি বলেন, 'দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। তবে সব শ্রেণির ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন দামের পোশাক রাখা হয়েছে।'
নগরীর ভিআইপি টাওয়ার মার্কেটের রূপন্তি বুটিকসের স্বত্বাধিকারী মো. রুহুল আমিন সালমান টিবিএসকে বলেন, 'ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং বেচাকেনাও বেশ ভালো হচ্ছে। ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পোশাক রাখা হয়েছে। দোকানে ফারসি, সারারা ও ঘারারা পোশাকের চাহিদা বেশি।'
তিনি জানান তার দোকানে বিভিন্ন পোশাকের দাম ১ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত।
