প্রকল্প বিলম্বের মূল্য: বিশ্বব্যাংকের গ্রেস পিরিয়ড হারাচ্ছে বাংলাদেশ
ধরুন কোনো কারখানার মালিককে একটিও পণ্য উৎপাদনের আগেই ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক চাপ তৈরি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় নিশ্চিত।
বাস্তবে অনেকটা এমন পরিস্থিতির মুখেই পড়ছে বাংলাদেশ সরকার। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—বেসরকারি ঋণগ্রহীতাদের মতো সরকার খেলাপি হয় না; বরং ঋণ পরিশোধের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে করদাতাদের ঘাড়ে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ২৯টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে চার থেকে ছয় বছরের গ্রেস পিরিয়ড ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, যদিও এসব প্রকল্পে গৃহীত ঋণের মধ্যে ১৯৩ কোটি ডলার এখনো ব্যবহারই করা হয়নি। এর ফলে অনেক প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে যাচ্ছে, যা ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
গ্রেস পিরিয়ড কী এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থায়, গ্রেস পিরিয়ড বলতে বোঝায় ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পর নির্ধারিত এমন একটি সময়কাল—যখন ঋণের মূল অর্থ পরিশোধ শুরু করতে হয় না। এ সময় সুদ জমতে পারে বা পরিশোধযোগ্য হতে পারে, তবে মূল অর্থ পরিশোধ স্থগিত থাকে; যাতে ঋণগ্রহীতা প্রকল্প বাস্তবায়ন, আয় সৃষ্টি এবং অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গ্রেস পিরিয়ড একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে—যাতে প্রকল্প চালু হয়ে সুফল দেওয়া শুরু করার পর যেন ঋণ পরিশোধের চাপ আসে, তার আগে না। এই সময়সীমা সংকুচিত হলে প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক সুফল বা রাজস্ব আয় আসার আগেই কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে যায়।
মূল সমস্যা কাঠামোগত অসামঞ্জস্য
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যার মূল উৎস বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কাঠামো এবং বাংলাদেশের প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে কাঠামোগত অসামঞ্জস্য।
বিশ্বব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেস পিরিয়ড শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বোর্ড অনুমোদনের পর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করা, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি, আন্তঃমন্ত্রণালয় ছাড়পত্র নিশ্চিত করা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। একনেক অনুমোদনের পরই কেবল ঋণচুক্তি সই হয়।
ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর আগেই গ্রেস পিরিয়ডের বড় একটি পেরিয়ে হয়ে যায়।
ইআরডি কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই অনেক সময় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ আলোচনা শুরু করা হয়। আলোচনা শেষ হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের বোর্ডের অনুমোদন দ্রুত মিললেও দেশের ভেতরের প্রক্রিয়া এগোয় ধীরগতিতে।
"আমাদের প্রকল্পগুলো যেন অপরিণত শিশু—যেকারণে প্রকল্পের সময়সীমা বা মেয়াদ বাড়ানো থেকে শুরু করে ব্যয় বৃদ্ধির মতো নানা চিকিৎসা দরকার হয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া আর ঋণ নেব না," দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
গ্রেস পিরিয়ড শেষ, আটকে আছে ১৯০ কোটি ডলার
ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলেও এখনো বিপুল অঙ্কের ঋণের অর্থছাড় হয়নি।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (প্রথম ধাপ) যেখানে অব্যবহৃত অর্থ ৪৪৪ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলার; ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প (১৪৪ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার); অপারেশন ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস (১৫২ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার); লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট (১৪১ মিলিয়ন ডলার); রিজিওনাল ওয়াটারওয়ে ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প (৯১ মিলিয়ন ডলার); এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (৬৩ মিলিয়ন ডলার); এবং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড স্ট্রেংথেনিং অব পাওয়ার ট্রান্সমিশন (৫৪ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার)।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের বেধে দেওয়া হয়েছে মধ্যে অর্থছাড় না হলে মেয়াদও বাড়ানো হয়, কিন্তু গ্রেস পিরিয়িডের মেয়াদ কখনো বাড়ানো হয় না। ফলে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুবিধা স্থায়ীভাবে কমে যায়।
কৌশল পরিবর্তন—তবে সাম্প্রতিক সময়েই
নাম না প্রকাশের শর্তে ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আগে বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই বাংলাদেশ ঋণ আলোচনায় যেত। তবে এর পরিবর্তন হচ্ছে। যার পেছনে বিশ্বব্যাংকের চাপও কিছুটা ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন বিশ্বব্যাংক এখন যদি আমাদের বলে, নেগোসিয়েশন শুরু না করলে ঋণ অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, ইআরডি এখন সেই চাপ আমলে নিচ্ছে না। এখন সব ধরণের প্রস্তুতির পরই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ আলোচনায় বসার কৌশল নিয়েছে ইআরডি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত অনেক ঋণের আলোচনা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে বিশ্বব্যাংকের ঋণ কমে গেলেও গ্রেস পিরিয়ড 'মিস' করার ঝুঁকি কমে আসবে।
বে কনটেইনার টার্মিনাল: কাগজে পাঁচ বছর, বাস্তবে চার
৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বে কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প গ্রেস পিরিয়ড সংকোচনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এই প্রকল্পের জন্য পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণচুক্তি সই হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পরিশোধ সূচি অনুযায়ী প্রথম কিস্তি দিতে হবে ২০২৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ফলে কার্যত গ্রেস পিরিয়ড নেমে আসে প্রায় চার বছরে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হলেও এখনো তাতে গতি আসেনি। এতে প্রকল্পের অর্থছাড়ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। এতে গ্রেস পিরিয়ড হারানোর ঝুঁকি আরো বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গত ২১ ডিসেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংকের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন বলেন,"বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইডিএ অত্যন্ত স্বল্পসুদে অর্থায়ন দেয়। আইডিএ ঋণে সুদ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ৫ থেকে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডের পর ৩০ থেকে ৪০ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। গ্রেস পিরিয়ড অর্থায়ন অনুমোদনের তারিখ থেকেই শুরু হয়।"
অনুমোদিত কিন্তু স্বাক্ষর না হওয়া প্রকল্পেও ঝুঁকি
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে এমন কয়েকটি প্রকল্পের এখনো ঋণচুক্তি করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—স্ট্রেংদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিটা) প্রকল্প, যা ২০২৫ সালের ১২ জুন ২৫০ মিলিয়ন ডলারে অনুমোদিত হয়; এবং বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্প, যা গত বছরের ১৮ জুন ২৯০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন পায় বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ প্রকল্পও একই চিত্র তুলে ধরে। ২০২০ সালের ১৯ জুন ৫০০ মিলিয়ন ঋণ ডলার অনুমোদন হলেও—চুক্তি সই হয় ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল; ফলে প্রকল্পটি পায় মাত্র চার বছরের গ্রেস পিরিয়ড।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে বাংলাদেশ প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারের গ্রেস পিরিয়ডের সুবিধা হারিয়েছে। চুক্তি সই হতেই প্রায় এক বছর সময় চলে যায়, এরপর বাস্তবায়ন পর্যায়েও বিলম্ব হয়।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, দরপত্র প্রক্রিয়ার ধীরগতি, ক্রয় পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব এবং বিশ্বব্যাংকের বিধিবিধান মানতে গিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা আগে থেকে ভালো প্রস্তুতি নেওয়া থাকলে এড়ানো যেত।
গ্রেস পিরিয়ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন কাজ শেষ করে, এবং প্রকল্প থেকে সুফল আদায়ের পর ঋণের আসল পরিশোধের সুযোগ দিতে এই গ্রেস পিরিয়ড নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু, বাংলাদেশে দেখা যায় দ্বিগুণ সময় ব্যয় করেও বাস্তবায়ন কাজ শেষ করা যায় না। একারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার আগেই আসল পরিশোধ শুরু হয়ে যায়, যা ঋণ পরিশোধের খরচ বাড়ায়, বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান ফেলে।
অনেক প্রকল্প থেকে সরাসরি রাজস্ব আনে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল দেয়। গ্রেস পিরিয়ড কম গেলে এসব প্রকল্পের আর্থিক সূচক, যেমন ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (আইআরআর) ও নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) দুর্বল হয়, অথচ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রাতেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বহুপাক্ষিক ঋণকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক ধরা হয় মূলত তিনটি কারণে—কম সুদহার, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধকাল এবং প্রাথমিক গ্রেস পিরিয়ড। তিনি বলেন, "গ্রেস পিরিয়ড মিস হলে, সুদের হার কম থাকলেও সেই সুবিধার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আগাম কিস্তি পরিশোধ রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ায়, উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ টেকসইতাকে দুর্বল করে।"
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। প্রথমত, প্রকল্প প্রস্তুতি প্রক্রিয়া ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে ঋণ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবায়ন শুরু করা যায়। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অনুমোদন, ঋণ স্বাক্ষর, কার্যকারিতা শুরু এবং গ্রেস পিরিয়ড গণনার সময়সূচির মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা যৌক্তিক ও মানসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে হবে।
