খালাসে ধীরগতি, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম বন্দরে ভয়াবহ জট; আমদানিকারকদের পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে মারাত্মক জট সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি বড় আমদানিকারক গোষ্ঠী ২০০টির বেশি লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস না করে আটকে রাখায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশ দিয়েছে, অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বন্দর ও শিপিং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রেকর্ড ১৭৬টি মাদার ভেসেল নোঙর করে রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি জাহাজে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। গত বছর রমজানের আগের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪১টি, যা থেকে চলতি সংকটের গভীরতা স্পষ্ট।
কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আমদানিকারকদের মজুতদারি, নিয়ন্ত্রণহীন আমদানি এবং ধীর ও প্রায় ম্যানুয়াল-খালাস নির্ভর ব্যবস্থা—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে বন্দরের কার্যক্রম ও লাইটারিং সক্ষমতাকে ভেঙে পড়ার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, কিছু বড় আমদানিকারক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না করে লাইটার জাহাজগুলোকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে ২০০টির বেশি লাইটার জাহাজ আটকে আছে, যা সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পর্যাপ্ত আমদানি থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ সংকুচিত করছে।
সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)-এর আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, গত দুই দিনে মাত্র ৮৪টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, অথচ চাহিদা ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি।
তিনি বলেন, "বন্দরে নোঙর করা অধিকাংশ জাহাজই পণ্য খালাস করতে পারছে না।" শিপিং খাতে ৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এ ধরনের পরিস্থিতি আমি আগে কখনো দেখিনি।"
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম
সংকট মোকাবিলায় মঙ্গলবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বড় আমদানিকারক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আমদানিকারকদের পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে আটকে থাকা লাইটার জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ না মানলে কঠোর ব্যবস্থা, এমনকি ফৌজদারি মামলা দায়েরের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী টিবিএস'কে জানান, সাপ্লাই চেইনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহনে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করেছে।" তিনি জানান, খুলনায় একটি এবং ঢাকা অঞ্চলে (নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ) দুটি টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ করছে এবং তাদের প্রতিদিন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত এসব টাস্কফোর্সকে ইচ্ছাকৃতভাবে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব করা, এবং রমজান সামনে রেখে পণ্য মজুত ও দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারকারী আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলমান সংকটের ব্যাপ্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহাপরিচালক বলেন, নোঙর করা জাহাজের সংখ্যা সিস্টেমের হ্যান্ডলিং সক্ষমতার অনেক বাইরে চলে গেছে।
তিনি বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে রেকর্ড ১৭৬টি মাদার ভেসেল নোঙর করে আছে, যার মধ্যে ৬১টিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।"
তার মতে, বিডব্লিউটিসিসি একসঙ্গে কার্যকরভাবে প্রায় ৫০টি মাদার ভেসেল পরিচালনা করতে পারে। "এর তিন গুণের বেশি জাহাজ অপেক্ষমাণ থাকায় বন্দর কার্যক্রমের ওপর চাপ তীব্র হয়েছে," তিনি যোগ করেন।
ম্যানুয়াল-খালাস ব্যবস্থাই প্রধান বাধা
কর্মকর্তারা জানান, পুরোনো ও মূলত ম্যানুয়াল-নির্ভর খালাস ব্যবস্থা এই বিলম্বের প্রধান কারণ।
মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের পর লাইটার জাহাজ সাধারণত এক থেকে দেড় দিনের মধ্যে নদীবন্দর বা ডিপোতে পৌঁছে যায়। কিন্তু, প্রকৃত সংকট শুরু হয় খালাস পর্যায়ে, বিশেষ করে গমের মতো বাল্ক পণ্যের ক্ষেত্রে।
এক কর্মকর্তা বলেন, "এগুলো কনটেইনারজাত পণ্য নয়। গম বাল্ক আকারে আসে, সেটিকে শ্রমিকদের বস্তাবন্দি করতে হয়, সেলাই করতে হয়, হাতে বহন করে ট্রাকে তুলতে হয়, তারপর বাজার বা গুদামে পাঠাতে হয়।"
অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের নির্দিষ্ট গুদাম না থাকায় সরাসরি বাজারে পাঠাতে হয়, যেখানে অনেক সময় আগে থেকেই পণ্যের জট থাকে।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক একটানা কাজ করলেও একটি লাইটার জাহাজ খালাস করতে ১০ থেকে ১২ দিন লেগে যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, "ক্রেন বা মেকানিক্যাল সিস্টেম থাকলে একই কাজ চার দিনের মধ্যেই শেষ করা যেত।"
ফলে যে জাহাজ চার দিনের মধ্যে খালাস হওয়ার কথা, তা ১০ দিনের বেশি সময় ধরে আটকে থাকে, সৃষ্টি হয় জট ও পণ্যের কৃত্রিম সরবরাহ সংকট।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পড়ে আছে দিনের পর দিন
টাস্কফোর্সের অভিযানে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘসময় ধরে পড়ে আছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, "আমরা দেখেছি, আমদানি করা সার—ঘাট বা নদীবন্দরে ২০ থেকে ৫৪ দিন পর্যন্ত পড়ে আছে, যা সরানোই হয়নি।"
কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এখন নজরদারিতে রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, একটি বড় আমদানিকারক গোষ্ঠী একাই প্রায় ৮০টি জাহাজ আটকে রেখেছে, যেগুলোতে সার, বিটুমিন, সরিষা, ভোজ্যতেল, গম ও চিনি রয়েছে।
অন্যান্য বড় আমদানিকারকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চর্চা লক্ষ করা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকারকেরা তাদের ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের মাধ্যমে খালাসের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, আমদানিকারকেরা পণ্য খালাসের জন্য ১২ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পান। এরপর বিলম্ব হলে জাহাজমালিককে প্রতিদিন প্রতি টন পণ্যের জন্য ৭ টাকা হারে ডেমারেজ দিতে হয়। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘসূত্রতা শেষপর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা সামনের সপ্তাহগুলোয় মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।
নিয়ন্ত্রণহীন আমদানি ও বে ক্রসিং শিথিল
কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রণহীন আমদানিকেও একটি কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, খালাস সক্ষমতা না বাড়িয়ে আমদানির পরিমাণ বাড়ালে সংকট কমার বদলে আরও তীব্র হবে।
জট কমাতে কর্তৃপক্ষ চলতি মৌসুমে বে ক্রসিংয়ের বিধিনিষেধ শিথিল করেছে, যাতে আরও বেশি জাহাজ বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে পারে। সাধারণত ৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭০০ রেজিস্টার্ড টনের বেশি জাহাজই এই অনুমতি পায়।
কর্মকর্তারা জানান, এখন তুলনামূলকভাবে শিথিলভাবে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যাতে জাহাজগুলো বহির্নোঙরে খালাস করতে পারে।
কমডোর শফিউল বলেন, "বে ক্রসিংয়ের নিয়ম শিথিল করে আমরা প্রায় ১০০টি অতিরিক্ত জাহাজ যুক্ত করার আশা করছি। পাশাপাশি আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে যদি বড় আমদানিকারকদের আটকে রাখা ২০০টি লাইটার জাহাজ মুক্ত করা যায়, তাহলে জট অনেকটাই কমে আসবে।"
