জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক বকেয়া ৩৪ হাজার কোটি টাকা: বিপিসি, পেট্রোবাংলার দায়ের চাপ কাস্টমসের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায়
বেসরকারি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করাতে হলে আগেই সব ধরনের শুল্ক ও কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারের দুই বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক সংস্থা—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলা—সঙ্গেসঙ্গেই শুল্ক পরিশোধ না করেই জ্বালানির চালান ছাড় করে নিচ্ছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের হিসাবে, এর ফলে দুই সংস্থার বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, এই চর্চার ফলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ পেট্রোলিয়াম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি এই কাস্টম হাউসের আওতায় হওয়ায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বিপিসি ও পেট্রোবাংলার অর্থ পরিশোধের ওপর তাদের নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি তৈরি হয়েছে পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে।
৮ জানুয়ারি তারিখে এক চিঠিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য পেট্রোবাংলার কাছে ২২ হাজার ৪৮.৬২ কোটি টাকা বকেয়া শুল্ক ও কর দাবি করেছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আইনসম্মত মূল্যায়ন ও অর্থ পরিশোধ ছাড়াই এলএনজি কার্গো ছাড় করা হয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা ওই চিঠি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৪০৮টি বিল অব এন্ট্রির আওতায় এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৮টি বিলের বিপরীতে ১ হাজার ৬১০.৫৪ কোটি টাকা শুল্ক পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ৩৭০টি চালান কোনো ধরনের পরিশোধ ছাড়াই ছাড় করা হয়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, এই প্রক্রিয়া কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৮৩, ৮৪ ও ৯০ ধারার পরিপন্থী, যেখানে পণ্য ছাড়ের আগে বিল অব এন্ট্রি দাখিল, মূল্যায়ন সম্পন্ন এবং প্রযোজ্য সব শুল্ক ও কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার তফছির উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, "পেট্রোবাংলা শুল্ক বা কর পরিশোধ না করেই বিল অব এন্ট্রি দাখিলের মাধ্যমে এলএনজি চালান ছাড় করছে, যা স্পষ্টতই আইনের পরিপন্থী।"
বিপিসির দায় ১২ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা
বিপিসি এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল কোম্পানি, ইস্টার্ন রিফাইনারি ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক-ও বিপুল অঙ্কের কাস্টমস দায় জমিয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান ৭ হাজার ১৯০টি বিল অব এন্ট্রির আওতায় পণ্য আমদানি করেছে। এতে সম্ভাব্য বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৬৯৫টি বিলের বিপরীতে শোকজ ও ডিমান্ড নোটিশ জারি করে ৩ হাজার ৪৩০.৩২ কোটি টাকা দাবি করা হয়। পরে বিপিসি ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করলেও, ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৭৮টি বিলের বিপরীতে ২ হাজার ৭৩০.৩২ কোটি টাকার চূড়ান্ত ডিমান্ড নোটিশ এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
'অসম ব্যবস্থাপনা'
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও সময়মতো অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় চূড়ান্ত ডিমান্ড নোটিশ দিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের অভিযোগ, সরকারি মালিকানাধীন আমদানিকারকরা এমন কিছু পরিচালন সুবিধা ভোগ করছে, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পায় না—এর ফলে তারা তাৎক্ষণিক শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই পণ্য ছাড় করাতে পারছে।
তফছির উদ্দিন বলেন, "বেসরকারি আমদানিকারকরা শুল্ক না দিলে পণ্য ছাড় করতে পারে না। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো পারে। এই বৈষম্যের কারণেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।"
চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি হওয়ায়—বিপিসি ও পেট্রোবাংলার যেকোনো বিলম্ব সরাসরি জাতীয় রাজস্ব পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এই দুই সংস্থা ভোক্তাদের কাছ থেকে শুল্ক ও কর আদায় করলেও তা সরকারের কাছে সময়মতো জমা দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, "শুল্ক না দিয়ে আমদানি ছাড় করানো স্পষ্টতই অনিয়ম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচিত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা।"
শুল্ক পরিশোধে বিলম্ব কেন
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, আগে এলএনজি আমদানিতে দ্বৈত কর ব্যবস্থা ছিল—আমদানির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বিতরণের পর্যায়ে আরও ১৫ শতাংশ ভ্যাট।
তিনি বলেন, "২০২৫ সালের জুনে সরকার আমদানি পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এখন কেবল ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) রয়েছে, এলএনজিতে কোনো কাস্টমস শুল্ক নেই।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা নিয়মিত এআইটি পরিশোধ করছি। ২২ হাজার ৪৮ কোটি টাকার অধিকাংশ বকেয়া জুন ২০২৫-এর আগের সময়ের।"
পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারের ভর্তুকি পরিশোধে দীর্ঘস্থায়ী বিলম্বই মূলত সংস্থাটি কর পরিশোধে অক্ষমতার প্রধান কারণ।
তিনি বলেন, "আমরা প্রায় ২ টাকা প্রতি ইউনিট ভর্তুকি রেটে গ্যাস বিক্রি করি। সরকার এই ভর্তুকি পরিশোধ করার কথা থাকলেও অর্থ বিভাগের বিলম্বে নগদ সংকট তৈরি হয়েছে।"
টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈশ্বিক এলএনজি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজনুর রহমান বলেন, "আমরা এনবিআর ও অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। কিছু বকেয়া ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ভর্তুকির অর্থ ছাড় হলে বাকি দায়ও নিষ্পত্তি করা হবে।"
বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, করপোরেশনের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত কর ও শুল্ক পরিশোধ করে থাকে এবং কেবল কাস্টমস দাবি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেই অর্থ আটকে রাখা হয়।
বাজেটে শুল্ক প্রত্যাহার
২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বেশ কয়েকটি জ্বালানির আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সিএনজি, এনপিজি ও এলএনজিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানো হয়েছে। অপরিশোধিত ও আংশিক পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, ফুয়েল অয়েল, গ্যাস অয়েল ও অন্যান্য ভারী তেলের ওপর শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সিএনজি, এনপিজি ও এলএনজির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এছাড়া বিটুমিনাস খনিজজাত অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
জেট ফুয়েল, কেরোসিন, ন্যাফথা, মোটর ও এভিয়েশন স্পিরিট, হোয়াইট স্পিরিটসহ উড়োজাহাজের জ্বালানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একই হার প্রযোজ্য হবে লাইট ডিজেল ও হাই-স্পিড ডিজেলের ক্ষেত্রেও।
