২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৫০ শতাংশ
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে স্থির মূল্যে এ সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৫০ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ২.৫৮ শতাংশ।
সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৭২ শতাংশ।
তবে বিবিএস বলেছে, বাৎসরিক ভিত্তিতে প্রাক্কলিত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবের সঙ্গে ত্রৈমাসিকভিত্তিক হিসাবের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। অর্থবছরের চূড়ান্ত জিডিপি নির্ধারণের পর আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতি অনুযায়ী বেঞ্চমার্কিংয়ের মাধ্যমে এই পার্থক্য সমন্বয় করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
খাতভিত্তিক হিসাবে কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২.৩০ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক (-০.৬০ শতাংশ)।
শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৯৭ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের ৩.৫৯ শতাংশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৬৭ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২.৯৬ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ধীরে ধীরে বাড়ায় সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, "সাম্প্রতিক প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধির এই চিত্রটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক। বিশেষ করে গত অর্থবছরে, কোভিড–পরবর্তী সময় বাদ দিলে, দেশের প্রবৃদ্ধির হার যে জায়গায় নেমে গিয়েছিল, সেখান থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের এই সংখ্যা স্পষ্টভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে, অর্থনীতিকে আবারও বেগবান করার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।"
তিনি বলেন, এই পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে কৃষি খাত থেকে। আগের অর্থবছরে কৃষি খাতে যেখানে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, সেখানে এবার খাতটি শক্তভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাত, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে, একটি দৃশ্যমান রিবাউন্ড হয়েছে। এই দুই খাত সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে সামনে টেনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, "তবে অন্যদিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যদিও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তা কৃষি ও শিল্প খাতের রিবাউন্ডের তুলনায় অনেক কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তার প্রকৃত আয় কমে গেছে, ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সেবা খাতের ওপর, যা জিডিপির সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এ অবস্থায় যদি আমাদের লক্ষ্য হয় পুরো অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিকে ধীরে ধীরে ৫ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া, তাহলে এই প্রথম প্রান্তিকের ফলাফলকে একটি ভালো সূচনা হিসেবে দেখতে হবে, শেষ অর্জন হিসেবে নয়। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে।"
তিনি বলেন, "মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে না পারলে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়বে না, আর ভোগ না বাড়লে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গতি পাবে না। তাই সামগ্রিকভাবে বলা যায়, আগামী দিনে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ইনফ্লেশন ম্যানেজমেন্টই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।"
"মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো গেলে সেবা খাতের অবদান শক্তিশালী হবে এবং সেটিই দেশকে টেকসইভাবে ৫ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে," যোগ করেন তিনি।
