সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে দুদিনে নতুন ডিপোজিট এসেছে ৪৪ কোটি টাকা: গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, "সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত দুদিন ধরে লেনদেন কার্যক্রম শুরু করেছে। এই দুদিনে নতুন করে ৪৪ কোটি টাকা নতুন ডিপোজিট পেয়েছে ব্যাংকটি। আমি মনে করি গ্রাহকের আস্থা থাকার কারণে নতুন করে গ্রাহকেরা ডিপোজিট রাখছেন।'"
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, গত দুদিন যাবৎ ব্যাংকটি গ্রাহকের টাকা দেওয়া শুরু করেছে। এই দুদিনে আগের আমানতকারীরা ১০৭ কোটি টাকা টাকা তুলেছেন। অন্যদিকে নতুন করে ডিপোজিট এসেছে ৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিট ডিপোজিট ঘাটতি ৬৩ কোটি টাকা।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়া বলেন, "আমরা দুদিন যাবৎ গ্রাহকদের সেবা দিতে শুরু করেছি। ব্যাংকের কিছু শাখায় টাকা তোলার চেয়ে আমানত রাখার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।"
গভর্নর বলেন, "নতুন আমানতকারীরা যখন ইচ্ছা তাদের টাকা উত্তোলন করতে পারবেন এবং বাজার দরে মুনাফা পাবেন। গত দুই দিনে নেট উত্তোলন ৬৩ কোটি টাকা হলেও বিশাল মূলধনের এই ব্যাংকের জন্য তা অত্যন্ত সন্তোষজনক।"
তিনি বলেন, ব্যাংকটি লেনদেন চালুর পর থেকে গত দুই দিনে মোট ১৩ হাজার ৩১৪টি লেনদেন হয়েছে। আশাব্যঞ্জক দিক হলো, বেশ কিছু শাখায় আমানত উত্তোলনের চেয়ে নতুন আমানত জমা বেশি হয়েছে।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়া বলেন, "গত দুই দিনে আমরা গ্রাহকদের বিমা তহবিল থেকে ন্যূনতম দুই লাখ টাকা ফেরত দিতে পেরেছি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আমানত উত্তোলনের তুলনায় নতুন আমানত বেশি এসেছে। ক্যানসার ও ডায়ালাইসিস রোগীরা তাদের আমানতের পুরো টাকাই ফেরত নিতে পারবেন। নির্দিষ্ট আইটি সিস্টেমে জটিলতার কারণে আপাতত সবার পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তারা সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন।"
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা আইটি সিস্টেম ব্যবহার করেই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে দ্রুতই একটি নতুন সমন্বিত আইটি সফটওয়্যার ডেভেলপের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর আইটি টিম।
এদিকে গভর্নর বলেন, "পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে এই ব্যাংকটি গঠিত হয়েছে। আগের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বর্তমান পর্ষদ ফরেনসিক অডিট শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্রাহকের টাকা কোথায় ও কীভাবে গেছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা ঋণগ্রহীতা জড়িত কি না, তা চিহ্নিত করা হবে। অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তদন্তকারী সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে তথ্য পাঠানো হবে।"
তিনি বলেন, বর্তমানে কর্মরত ১৬ হাজারের বেশি জনবলের মধ্যে যারা দক্ষ, সৎ ও যোগ্য, তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।
গভর্নর জানান, ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্সের আওতায় গ্রাহকের আমানত কীভাবে পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রেজোলিউশন স্কিম দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির ৯৫ শতাংশ গ্রাহকের আমানত দুই লাখ টাকার নিচে, তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সহজেই পুরো টাকা ফেরত পাবেন। বড় অঙ্কের আমানতকারীরা আগামী দুই বছর পুরো টাকা তুলতে পারবেন না। তবে তারল্য প্রয়োজন হলে তারা আমানতের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে সরকারি প্রতিনিধি দিয়ে বোর্ড শুরু হলেও বেসরকারি প্রতিনিধি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ব্যাংকটি সরকারি মালিকানাধীন হলেও এটি পুরোপুরি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।
এদিকে চরম সংকটে থাকা নয়টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) 'নন-ভায়েবল' বা অকার্যকর ঘোষণার আইনি প্রক্রিয়া চলতি সপ্তাহ থেকেই শুরু হচ্ছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পর্যালোচনার ভিত্তিতে নয়টি এনবিএফআইকে অকার্যকর ঘোষণার প্রক্রিয়া এই সপ্তাহেই শুরু হবে।
তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য দ্রুত অডিটর নিয়োগ করা হবে। দেনার পরিমাণ কত—১০০ কোটি না ১০ হাজার কোটি টাকা—তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর জানান, অকার্যকর ঘোষিত এসব প্রতিষ্ঠানের সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা রমজানের মধ্যেই ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে সাধারণ আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পেলেও শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সরকারের বিশেষ তহবিল ব্যবহার করে আমানতকারীদের মূল টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের অন্যান্য দুর্বল ব্যাংক প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, 'ব্যাংক রেজোলিউশন বিভাগ' নিয়মিতভাবে এসব ব্যাংক নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ইতোমধ্যে আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা 'পাথওয়ে টু সাকসেস' নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে তারা আমানতকারীদের দায় মেটাতে পারে।
তিনি বলেন, এসব ব্যাংকের সংকট কাটাতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমান বাজেটে নেই। বিষয়টি পরবর্তী বাজেট ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
গভর্নর আরও জানান, বর্তমানে আলাদা কোনো রেজোলিউশন ফান্ড নেই এবং ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স স্কিমের ১৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
ঋণ খেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, "কোনো ঋণ খেলাপি যদি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তা মানা ছাড়া উপায় নেই। নির্বাচনে ঋণ খেলাপিদের যোগ্যতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকার ও আদালতের এখতিয়ার। সংবিধান অনুযায়ী আদালতের নির্দেশের বাইরে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।"
