এলডিসি থেকে উত্তরণ: পেছানো না-পেছানোর উভয় সংকট

অক্টোবর-নভেম্বরে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) মূল্যায়নের সময় বাংলাদেশ সরকার চাইলে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সাল থেকে পেছানোর আবেদন করার সুযোগ পাবে।
সরকার যদি এই সময়ের মধ্যে উত্তরণ পেছানোর আবেদন না করে, তবে পরে তা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকার বলছে, এই আবেদন যেকোনো সময়ই করা যেতে পারে।
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (উত্তরণ) হওয়ার কথা রয়েছে। রোববার (২৪ আগস্ট) দেশের প্রধান প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা তা ২০৩২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার বিবেচনা করছে না বলে টিবিএসকে জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
রোববার বিকেলে সিডনি থেকে হোয়াটসঅ্যাপে তিনি বলেন, ''এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তার নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। ব্যবসায়ীদের কথায় এখন পিছিয়ে আসার বিষয় সরকার বিবেচনা করবে না।
'কোনো দেশ চাইলে যেকোনো সময়ই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন থেকে পিছিয়ে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনের পরে নতুন সরকার গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর কথা বিবেচনা করলে সেটি ভিন্ন বিষয়।''
তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকরা প্রথমে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেঁছানোর দাবি করেছেন। এখন তাদের সঙ্গে জুতা রপ্তানিকারকরা যোগ দিয়েছেন। 'আমাদের তৈরি পোশাকের অর্ধেক রপ্তানি হয় ইউরোপে, যেখানে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে। বাকি অর্ধেকের বড় অংশই রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যার সঙ্গে এলডিসির কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের জুতা রপ্তানির বাজারও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। তাই তাদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দুর্বলতার পরিচয় দিতে রাজি নয়।'
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর বিষয়ে সরকারের মধ্যে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি বলে টিবিএসকে জানান বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন।
তিনি রোববার বলেন, 'এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর বিষয়ে সরকার আবেদন করবে কি না, এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়েছে বলে আমার জানা নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'সরকারের অবস্থান ইতিমধ্যে অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন।'
গত মে মাসে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'আমরা চেষ্টা করছি ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ করতে। এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে: গ্র্যাজুয়েশন করব নাকি করব না—কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা গ্র্যাজুয়েশনের দিকেই যাব। এর জন্য যা যা প্রস্তুতি নেওয়ার, তা আমরা নেব।'
আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়ীরা জ্বালানি সংকট ও যানজটসহ লজিস্টিকস খাতে দুর্বলতার কারণ তুলে ধরে গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর কথা বলছেন। 'কিন্তু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছালেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তা নয়। সরকার সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হয়েছে, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৪৫ হাজারেরও বেশি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।'
ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো হলো একটি ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা একটিমাত্র গেটওয়ে ব্যবহার করে একাধিক সরকারি সংস্থায় আমদানি, রপ্তানি ও ট্রানজিট-সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে পারেন। এর আওতায় সাতটি কাস্টমস সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
আনিসুজ্জামান পোশাক ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করে বলেন, তারা ৫০ বছর ধরে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে অর্থনীতিকে জিম্মি করে রেখেছে। 'এই সময়ে তারা পণ্য ডাইভারসিফাই করেনি, মার্কেট ডাইভারসিফাইও করেনি। কোভিডের কারণে বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ২০২৪-এর পরিবর্তে দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬-এ এনেছে। এ সময়েও তারা কেন প্রস্তুতি নেননি?'
তিনি বলেন, 'এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। এখন ফিরে এলে সবাই আমাদের নিয়ে হাসবে। জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি খারাপ হওয়ার পর জাতিসংঘ থেকে দেশটিকে এলডিসি হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। জিম্বাবুয়ে তাতে রাজি না হয়ে জানায়, "এই লজ্জার মালা আমরা গলায় পবব না।"'
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, চামড়া ও ইলেক্ট্রনিকস খাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান আনিসুজ্জামান।
তিনি বলেন, 'দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ থেকে ইলেক্ট্রনিকস খাতের উপর জোর দিয়ে মাত্র ১৫ বছরে শক্তিশালী উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। আমি ইতিমধ্যে ইনসেপ্টা, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানা পরিদর্শন করেছি। বন্দর ব্যবস্থাপনার আরও উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মিটিং করব।'
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, অক্টোবর-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশের ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ভালনারেবিলিটিসহ সার্বিক মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘের সিডিপি। সেখানে সরকার উত্তরণ পেছাতে চায় কি না, চাইলে তার কারণ কী—এসব উল্লেখ করার সুযোগ থাকবে।
এই মূল্যায়নের পরও সরকার আগ্রহী হলে উত্তরণ পেছানোর আবেদন করতে পারবে। তবে তখন পেছানো বেশ কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলেও ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীনসহ বাংলাদেশের ৬৭ শতাংশ রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। দেশের রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। এ অবস্থায় অক্টোবর-নভেম্বরে সরকার উত্তরণ পেছানোর আবেদন করলেও সেজন্য যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করা কঠিন হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর (পিআরআই) এই গবেষক আরও বলেন, দুটি দেশ যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়েছে। এর মধ্যে অ্যাঙ্গোল। তিনটি শর্তের মধ্যে একমাত্র মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) শর্ত পূরণ করে দেশটি গ্র্যাজুয়েশন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কমে যাওয়ায় তেল রপ্তানিনির্ভর দেশটির মাথাপিছু জিএনআই জাতিসংঘের শর্তপূরণের চেয়েও কমে যায়। তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেয়। আর ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়েছে নেপাল।
মোস্তফা আবিদ আরও বলেন, '২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে রপ্তানিকারকরা এখন যে নগদ প্রণোদনা পান, সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এ কারণেই তারা পেছানোর দাবি করছেন।'
আরেকজন বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, জাতিসংঘের মূল্যায়ন চলার সময়ই গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর জন্য আবেদন করলে তাতে পেছানো সহজ হবে। মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী নির্বাচিত সরকারের পক্ষে পেছানোর সুযোগ খুব বেশি থাকবে না।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য মসৃণ উত্তরণ কৌশল তৈরি করলেও সরকার ও বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারেনি। 'জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে সরকার এখন পেঁছানোর আবেদন করলে তা জাতিসংঘের গ্রহণ করতে পারে। তবে নির্বাচনের পরে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর মতো এ ধরনের যুক্তি সরকারের সামনে না-ও থাকতে পারে।'