প্রকাশনা সংস্থায় গোপনে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার: ক্ষুব্ধ কর্মীরা
মার্কিন প্রকাশনা সংস্থাগুলো জেনারেটিভ এআই এর বিরুদ্ধে জোর লড়াই চালাচ্ছে, এমন সব শিরোনামে ছেয়ে আছে এ বছরের খবরের পাতা। গুগলের বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলা থেকে শুরু করে, লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলের (এলএলএম) লেখা সন্দেহে লেখকদের বই বাতিল করার মতো পদক্ষেপও নিয়েছে অনেক প্রকাশনী।
কিন্তু পর্দার আড়ালের চিত্র ভিন্ন। কোনো ধরনের প্রকাশ্য ঘোষণা বা লেখকদের সম্মতি ছাড়াই আমেরিকার শীর্ষ পাঁচটি প্রকাশনা সংস্থার (বিগ ফাইভ) অন্তত তিনটি— হার্পারকলিন্স, সাইমন অ্যান্ড শুস্টার এবং হ্যাশেট গোপনে তাদের কর্মপ্রক্রিয়ায় এআই টুল অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করে যাচ্ছে।
বিভিন্ন প্রকাশনীর দুই ডজনেরও বেশি কর্মীর সাক্ষাৎকার থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অবশ্য তারা সবাই চাকরি হারানোর ভয়ে পরিচয় প্রকাশ না করে কথা বলেছেন। কর্মীদের ভাষ্যমতে, প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন ক্লদ ও চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল দিয়ে এজেন্টদের কাছে ই-মেইল পাঠানো, প্রচারণা, পেছনের মলাটের লেখা তৈরি, প্রচ্ছদের নকশা এবং বিপণনের উপকরণ তৈরি করছে। যা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশেই করা হচ্ছে বলে জানান কর্মীরা।
একই সময়ে একাধিক সম্পাদকও জানান, এআই দিয়ে লেখার কারণে যে কয়েকটি বই বাতিল হওয়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছে তা মূল সমস্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। যেমন হ্যাশেটের হরর উপন্যাস 'শাই গার্ল' বা ম্যাকমিলানের ক্রাইম থ্রিলার 'কল মি আই উইল হাইড দা বডি', পত্রিকায় এ বইয়ের খবর আসেনি। এআই ব্যবহারের কারণে নামকরা লেখকের বই বাতিল হয়েছে এমন ঘটনা প্রতিটি প্রকাশনা বিভাগেই রয়েছে বলে জানান একজন সম্পাদক।
কয়েক মাস আগেই হার্পারকলিন্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অ্যানথ্রোপিক থেকে ক্লদ-এর লাইসেন্স কিনেছেন। তবে শীঘ্রই তারা টের পান, নিজেদের কাজে এআইয়ের সঠিক প্রয়োগ তারা জানেন না। এরপর একরকম জোর করে অসংখ্য কর্মীকে বাধ্য করা হয় নিজে থেকে এআই এর কাজ শিখে 'এআই চ্যাম্পিয়ান' হয়ে উঠতে। এ যেন অনেকটা বাধ্যতামূলক স্বেচ্ছাশ্রম। এ ছাড়াও মাসিক আলোচনা সভায় পুরো কোম্পানির কর্মীদের জন্য এআই ব্যবহারের উপায় খুঁজে বের করার কাজ দেওয়া হয়।
চলতি বছরের এক সভায় হার্পারকলিন্সের কিছু কর্মী এআইএর আইনি, নৈতিক এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সে সময় সভার প্রধান তাদের সংশয়কে অবহেলা করে বলেন, 'ব্যাবসা করতে গেলে এটুকু অসুবিধা মেনে নিতেই হয়।'
এর কিছুসময় পরেই হার্পারকলিন্সের কর্মচারীদের অনলাইন পোর্টালে একটি বিবৃতি যুক্ত করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয় 'যদিও পরিবেশের ওপর এআইএর প্রভাব রয়েছে, তবে একজন ব্যক্তির মোট ডিজিটাল কার্বন ফুটপ্রিন্টের তুলনায় তা খুবই সামান্য।'
এসব আলোচনা সভা নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ হন হার্পারকলিন্সের কিছু কর্মী। একজন বলেন, 'আমরা বছরের পর বছর ধরে যৌক্তিকভাবে বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছি। আর তারা এখন টাকা ঢালছে এমন সফটওয়্যারের পেছনে যা আমাদের বেশিরভাগেরই পছন্দ নয়। এ যেন আমাদের মুখে চড় মারার মতো। ক্লদ ছাড়াও চ্যাটজিপিটি এবং জ্যাসপারের লাইসেন্স কিনেছে প্রকাশনীটি- এসব এআই প্ল্যাটফর্ম মার্কেটিংয়ের পুরো কর্মপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে পারে।'
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্ক শহরের বিগ ফাইভ এবং স্কলাস্টিক প্রকাশনায় শিক্ষানবিশ পর্যায়ের কর্মীদের গড় বার্ষিক বেতন ছিল ৪৭ হাজার ৫৮৩ ডলার।
সফ্টওয়্যার লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে হার্পারকলিন্সের অন্তত একটি বিভাগ পুরোপুরি এআইভিত্তিক হয়ে গেছে। তবে হার্পারকলিন্স, সাইমন অ্যান্ড শুস্টার এবং হ্যাশেটের কর্মীদের মতে, এখন পর্যন্ত লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল এর সবচেয়ে সাধারণ ব্যবহার হচ্ছে প্রচারণার লেখা তৈরি করায়।
আমাজন, গুডরিডস থেকে শুরু করে বইয়ের পিছনের মলাটে পাঠকেরা যে-সব লেখা দেখেন, সবই প্রচারণা পত্র। বই বিক্রেতা, সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সমালোচকদের কাছে বইয়ের কথা পৌঁছে দিতে এসব লেখা কাজে লাগে। এ বিষয়ে 'বিগ ফাইভ' এর একজন গণসংযোগ কর্মকর্তা জানান, 'এআই দিয়ে প্রচার পত্র তৈরি করা নেহাত অদূরদর্শিতা। পাঠকদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে সততার সাথে বইয়ের তথ্য পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব। তারা এআইয়ের বানানো প্রচারপত্র খুবই অপছন্দ করেন।'
অন্যদিকে স্বাধীন প্রকাশনা সংস্থা হাব সিটি প্রেস এর প্রকাশক মেগ রিড জানান, 'বিগ ফাইভের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এলএলএম দিয়ে প্রচারণা ও বিপণন পরিচালনা করা একপ্রকার আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই আমরা সামনের দিনগুলোতে একটা বড় পরিবর্তন দেখতে পাবো। করপোরেট প্রকাশকেরা চান দ্রুত ও সহজে বেশি কাজ শেষ করতে। এ সুযোগে ছোট প্রকাশক যাদের কাছে মানুষের সৃজনশীলতাই মুখ্য, তাদের কাজের একটা জায়গা তৈরি হবে।'
ইতোমধ্যে, এজেন্টরা সন্দেহ করছেন যে বিগ ফাইভের সম্পাদকেরা বই প্রত্যাখ্যানের চিঠি লিখতে এআই ব্যবহার করছেন। এক এজেন্ট বলেন, 'কয়েকজন সহকর্মীর কাছে একই সম্পাদকের পাঠানো একাধিক ই-মেইল ঘেঁটে দেখেছি আমরা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সেগুলো এআই দিয়ে লেখা।' সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, হার্পারকলিন্স এবং হ্যাশেটের কর্মীরাও বিশ্বাস করেন, এজেন্টদের এই সন্দেহ সত্য।
হ্যাশেটের এক মুখপাত্র বলেন, 'দাপ্তরিক কিছু কাজের ক্ষেত্রে কোম্পানি এআই টুল ব্যবহারকে সমর্থন করে। তাতে লেখকদের বইকে আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে সুবিধা হয়। তবে সৃজনশীল কাজে অথবা লেখক বা অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ করতে এআইয়ের ব্যবহার কোম্পানি সমর্থন করে না।
সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের গ্লোবাল চিফ মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা উইবকে গ্রুটজেন জানান, 'সব বিভাগের কর্মীদেরই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অনুমোদিত নির্দিষ্ট কিছু এআই ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে সেটা বাধ্যতামূলক নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুমোদন ছাড়া যে-কোনো এআই টুলের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে কোম্পানি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো কর্মচারীদের সময় বাঁচানো। এতে করে তারা লেখকদের প্রতি গভীর মনোযোগ ও সৃজনশীল কাজে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।'
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হার্পারকলিন্সের কর্মকর্তাদের থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, কয়েক মাস আগে ওপেনএআই এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি কর্মশালায় অংশ নেন সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের কর্মীরা। এক কর্মী জানান, 'আমরা কী করি সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনাকারীদের কোনো ধারণাই ছিল না। তবে বই ব্যবসায় কীভাবে এআই কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে পরামর্শ ঠিকই দিয়েছেন তারা। সেটা হলো এজেন্টদের ই-মেইল লেখার কাজে চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করা।' অবশ্য হারপারকলিন্স এবং হ্যাশেটের সম্পাদকদের মাঝে সেই চর্চা ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন কর্মীরা।
২০২৪ সালের মে মাসে সাইমন অ্যান্ড শুস্টার একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এআই ব্যবহারের সেরা আইডিয়ার জন্য কর্মচারীদের মধ্যে ১০ হাজার ডলারের পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়। রানার আপদের জন্যও ৫ হাজার ডলারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে কর্মীদের ব্যাপক আপত্তির মুখে তারা এআই ব্যবহার প্রণোদিত করার এসব উদ্যোগ কিছুটা গুটিয়ে নেয়। একাধিক কর্মীর মতে, প্রচ্ছদ শিল্পে প্রতিনিয়ত এআই দিয়ে তৈরি উপকরণের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এমনকি সাইমন অ্যান্ড শুস্টার কর্তৃক পরিবেশিত কিছু বিদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রচ্ছদের নকশা জমা দেওয়ার সময় খোলাখুলিভাবেই এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করছে।
এজেন্টদের বড় ভয় হলো, বই প্রত্যাখ্যানের চিঠি বা প্রচারণার বিবরণ লিখতে গিয়ে প্রকাশকেরা তাদের লেখকদের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি এলএলএম এর ডাটাবেজে আপলোড করে দিচ্ছেন কিনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্ট বলেন, 'আমরা আমাদের চুক্তিতে এখন শর্ত যোগ করে দিচ্ছি যাতে প্রস্তাবিত বিষয়বস্তু বা পাণ্ডুলিপি কোনো লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলে আপলোড করা না হয়। দৃশ্যত, প্রযুক্তি কোম্পানির হাত থেকে লেখকদের রক্ষা করতেই এই চুক্তির শুরু হয়েছিল। তবে তা এখন বই ক্রয় এবং প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য। যদি তারা ক্লোজড-লুপ মডেল ব্যবহার না করে লেখকের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি আপলোড করে, তাতে এলএলএম সেই লেখা থেকে তথ্য বা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের ডাটাবেজ সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।'
অধিকাংশ মানুষের ব্যবহৃত অনলাইন এলএলএম যেমন: গুগল, জেমিনাই, চ্যাটজিপিটি ইত্যাদি থেকে একটি ক্লোজড-লুপ মডেল আলাদা। এই মডেল পরিচালিত হয় কোনো একক কমপিউটার বা এয়ার-গ্যাপড নেটওয়ার্কে যা বাইরের নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ফলে তা এআই কোম্পানির ক্লাউড সার্ভারে তথ্য জোগান দিতে পারে না।
হার্পারকলিন্সের এক সূত্র জানায়, একাধিক সম্পাদক ম্যানেজারদের কাছে জানতে চেয়েছেন তারা লেখকদের সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি ওপেন লুপ এলএলএম এ আপলোড করতে পারবেন কি না। তবে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিষেধ করা হয়।
নবনিযুক্ত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা কার্ল হিকসনের অধীনে এআই নীতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা করছেন হ্যাশেটের কর্মীরা। কারণ তিনি পূর্বে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এসআরএমজি তে কাজ করতেন, যা প্রকাশ্যে এজেন্টিক এআই ব্যবহারের পক্ষে কথা বলত।
এদিকে, বিগ ফাইভের অনেক কর্মী জানান, নির্বাহী কর্মকর্তারা ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে দল ছোট করে তাদের কাজের চাপ তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে তারা একরকম বাধ্য হয়েই এআই ব্যবহার করছেন। এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'সব বিভাগেই কর্মীর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফেলা হয়েছে। যেখানে বড়বড় দল ছিল, সেখানে এখন ৫ থেকে ৬ জন মাত্র কাজ করছে। ফলে তাদের ওপর আগের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ বইয়ের চাপ এসে পড়েছে। তাই কাজের সহজ পথ খোঁজা আশ্চর্য কিছু নয়। এ নিয়ে কর্মীদের কিছু বলার নেই আমার। বরং আমি বলতে চাই কোম্পানি আমাদের গলা চেপে ধরে বেশি কাজ করিয়ে নিচ্ছে আর বলছে, এআই ব্যবহার না করলে আমরা পিছিয়ে যাবো।'
কয়েক সপ্তাহ আগেই সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের কর্মচারীদের মধ্যে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে যে কোম্পানিটি স্ক্যান এআই এর সাথে একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০২৩ সালে সাইমন অ্যান্ড শুস্টার কিনে নেয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কেকেআর। তাদের চাপেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের খরচ কমানো, স্বয়ংক্রিয়করণকে প্রাধান্য দেওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন সংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করে থাকে স্ক্যান এআই।
এর জবাবে সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের কর্মীরা তাদের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি খোলা চিঠি সিইও গ্রেগ গ্রিলির কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। চিঠিতে তারা কোম্পানির উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে বা ভবিষ্যতে সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের কাজের প্রক্রিয়ায় স্ক্যান এআই বা এর সমকক্ষ অন্য কোনো সফ্টওয়্যার না আনার বিষয়ে নিশ্চয়তা দাবি করেন। স্ক্যান এআই-এর নজরদারি ক্ষমতা ছাড়াও অনেক কর্মী চিন্তিত ছিলেন যে এর অটোমেশন টুলগুলো ভবিষ্যতে তাদের চাকরিচ্যুত করতে ব্যবহার করা হতে পারে।
৬ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনের 'বুক গসিপ' নিউজলেটারে এই খোলা চিঠির খবরটি প্রকাশিত হয়। একই দিনে গ্রিলি তার কর্মচারীদের কাছে একটি মেমো পাঠান। তিনি নিশ্চিত করেন যে কোম্পানিটি স্ক্যান এআই এর ব্লুপ্রিন্ট পণ্যটি নিয়ে প্রাথমিক খোঁজখবর নিচ্ছিল। তবে ব্লুপ্রিন্ট বা অন্য কোনো প্রোডাক্টিভিটি-মনিটরিং বা ওয়ার্ক ফ্লো-অ্যানালিসিস টুল ব্যবহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কর্মীদের উদ্বেগ প্রকাশের আগে এই প্রাথমিক পর্যালোচনার কোনো নথিপত্র তিনি দেখেননি বলেও দাবি করেন। মজার বিষয় হলো, জনপ্রিয় এআই ডিটেকশন প্ল্যাটফর্ম প্যানগ্রাম এর মতে, গ্রিলির পাঠানো মেমোর অন্তত কিছু অংশ এআই দিয়ে লেখা হয়েছিল।
আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে ইউবিএস গ্লোবাল মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কনফারেন্সে হার্পারকলিন্সের সিইও ব্রায়ান মারে বলেছিলেন, 'বই প্রকাশনায় ঝুঁকির চেয়ে সুযোগ বেশি নিয়ে এসেছে এআই।' তিনি ভবিষ্যদ্বানী করেন, 'হার্পারকলিন্স কর্তৃক অনূদিত বই ও অডিওবুকের সংখ্যা বাড়াতে এআই ভূমিকা রাখবে।' এর পর থেকে বার্ষিক ফ্রাঙ্কফুর্ট ও লন্ডন বইমেলায় এআই ব্যবহারের উল্লেখসহ এলএলএম অনূদিত পাণ্ডুলিপি দেখা গেছে বলে জানান একাধিক সম্পাদক। এসব মেলায় মার্কিন প্রকাশকরা বিদেশি সাহিত্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও অনুবাদের অধিকার কিনে থাকেন।
এলেনা ফেরান্তের 'নেয়াপোলিটান কোয়ার্টেট' উপন্যাসের জন্য সুপরিচিত নিউ ইয়র্কের স্বাধীন প্রকাশনী ইউরোপা এডিশনস। ইউরোপার নির্বাহী প্রকাশক মাইকেল রেনোল্ডস বাল্টিমোর সম্প্রতি 'নিউ ভয়েসেস নিউ রুমস' নামক এক কনফারেন্সে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, অনুবাদ সাহিত্যে এআই-এর সম্ভাবনায় তিনি রোমাঞ্চিত। বরং এর নেতিবাচক সমালোচনা দেখে তিনি বেশ অবাক হয়েছেন বলে জানান সেখানে উপস্থিতরা। ইউরোপা এডিশনস ইতোমধ্যে সাহিত্য অঙ্গনে কিছুটা বিতর্কিত, কারণ তারা তাদের বইয়ের প্রচ্ছদে অনুবাদকের নাম ছাপায় না।
'বিগ ফাইভ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের চিন্তা-ভাবনার সাথে অন্য আমেরিকান বড় কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মিল বেশি। নিজেদের সম্পাদক, গণসংযোগ কর্মকর্তা বা অনুবাদকদের সাথে তাদের সামঞ্জস্য নেই। তারা সবসময় আরও বেশি লাভ করার পথ খুঁজে বেড়ায়। আজকাল তারা দেখার চেষ্টা করছে, কর্মচারী বা লেখকদের বিদ্রোহ গড়ে ওঠার আগে ঠিক কতদূর পর্যন্ত পার পেয়ে যেতে পারে প্রকাশনীগুলো।' একথা বলেন, 'বিগ ফিকশন : হাও কগলোমোরেশন চেঞ্জড দা পাবলিশিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড আমেরিকান লিটারেচার' বইয়ের লেখক ড্যান সিলিকন।
বর্তমান বিশৃঙ্খলা কিছুটা কমানোর জন্য প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পেশাদারদের বেশিরভাগই চান, প্রকাশকেরা যেন অন্তত এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা এবং তথ্য প্রকাশ করেন। ট্রায়াঙ্গেল হাউস লিটারারির এজেন্ট এমা ড্রিস একসময় হার্পারকলিন্স এবং পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের সম্পাদনা বিভাগে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, 'কোন ক্ষেত্রে এবং কখন এআই ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রকাশকদের স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।'
এদিকে হার্পারকলিন্সের এক কর্মী জানান, 'এআই ব্যবহারের বিষয়ে লেখক বা এজেন্টদের কী বলতে হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কারণ আমার মনে হয়, তারা ভালো করেই জানে এ বিষয়ে জানাজানি হলে চরম হট্টগোল শুরু হবে।'
এমা ড্রিস বলেন, 'আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এসব টুলের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। তবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের সবার নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বেশি স্পষ্ট হওয়া উচিত।'
অনুবাদ: নুসরাত জাহান
