অপরাধ, অপরাধী, সত্য-মিথ্যা
আলামত যখন কথা বলে, বিজ্ঞান কি সব সত্য জানে?
শার্লক হোমসের কাছে অপরাধের রহস্য সমাধানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল পর্যবেক্ষণ। অন্যেরা যেখানে সাধারণ কোনো বস্তু দেখতেন, হোমস সেখানে খুঁজে পেতেন অজানা ঘটনার সূত্র। মেঝেতে পড়ে থাকা ছাই, পোশাকে লেগে থাকা দাগ কিংবা কারও জুতার ছাপ—সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজতেন অপরাধীর রেখে যাওয়া চিহ্ন। তাঁর গল্প পড়ে মনে হতে পারে, অপরাধস্থলে পাওয়া সামান্য একটি সূত্রই যথেষ্ট। একটু মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেই বেরিয়ে আসবে অপরাধীর পরিচয়। ঘটনার বিবরণ। এমনকি তার উদ্দেশ্যও।
কিন্তু বাস্তবের অপরাধ তদন্ত কি এত সহজ?
আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দারা মানুষের কথার অসংগতি, গোপন উদ্দেশ্য ও আচরণের সূক্ষ্ম পরিবর্তন থেকে রহস্যের জট খুলতেন। আধুনিক তদন্তকারীদেরও তেমনি নানা সূত্র একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। জেমস বন্ডের হাতে থাকা অত্যাধুনিক যন্ত্র কিংবা মাসুদ রানার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের কাজে লাগতে পারে কল্পনার জগতে। বাস্তবে অবশ্য একটি যন্ত্রের ফল, একটি আঙুলের ছাপ কিংবা এক ফোঁটা রক্তের ওপর নির্ভর করে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। আলামত কী বলছে। তার পাশাপাশি জানতে হয়, সেই আলামত থেকে সত্যিই কতটা জানা সম্ভব।
একটি অপরাধস্থলে যা যা পাওয়া যায়—জৈবিক উপাদান থেকে শুরু করে সুপ্ত আঙুলের ছাপ। জুতো বা গাড়ির টায়ারের দাগ। এমনকি অদৃশ্যপ্রায় কাচ বা মাটির কণা। তার প্রতিটি যেন একেকটি স্তব্ধ নীরব সাক্ষী। ফরাসি চিকিৎসক ও অপরাধতত্ত্ববিদ এডমন্ড লোকর্ড (১৮৭৭–১৯৬৬) ছিলেন আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। অ্যাডমন্ড লোকর্ডের বিখ্যাত বিনিময় নীতি (Locard's Exchange Principle) বলে, অপরাধস্থলে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিটি মানুষ কিছু না কিছু রেখে যায়। আবার সেখান থেকে কিছু নিয়েও যায়। অর্থাৎ চুল, তন্তু, ধুলা কিংবা অন্য ক্ষুদ্র কণা, এমন কিছু আলামত অপরাধী অপরাধস্থলে রেখে যেতে পারে, যা তদন্তে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে সাহায্য করে। আর এই নীতিকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে তদন্তের মূল শৃঙ্খলা।
ফরেনসিক বিজ্ঞানের জগৎ এই প্রশ্নেরই মুখোমুখি হয় প্রতিনিয়ত। এখানে কখনো ক্ষুদ্রতম রাসায়নিকের উপস্থিতি অপরাধের রহস্যের কেন্দ্রে চলে আসে। আবার কখনো বহুল ব্যবহৃত কোনো পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে অপরাধস্থলে পাওয়া সব চিহ্নের অর্থ উদ্ধার করা যায় না। আর যে চিহ্নের অর্থ উদ্ধার করা যায়, তার ব্যাখ্যাও সব সময় নির্ভুল হয় না।
বিষয়টি বোঝার জন্য ফিরে যাওয়া যাক একটি আলোচিত মামলায়।
নেটফ্লিক্সের অপরাধবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র 'মেকিং আ মার্ডারার'-এর কেন্দ্রে ছিলেন স্টিভেন অ্যাভেরি। তাঁর মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল, পুলিশ কি একটি গাড়িতে রক্ত সাজিয়ে রেখেছিল? অভিযোগটি সত্য হলে, ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে কতটা নির্ভরযোগ্য, সে প্রশ্নও সামনে আসে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ইডিটিএ নামের একটি রাসায়নিক। সাধারণত গবেষণাগারে ব্যবহৃত এই রাসায়নিক রক্তের নমুনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগে। অভিযোগ ছিল, সংরক্ষিত রক্ত কোনো পাত্র থেকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নমুনায় ইডিটিএর উপস্থিতি পরীক্ষা করে বোঝা সম্ভব।
টেলিভিশনের কোনো গোয়েন্দা সিরিজে দৃশ্যটি দেখানো হলে হয়ত তদন্তকারী একটি যন্ত্রে রক্তমাখা কাঠি ঢোকাতেন। বিপ বিপ বিপের মতো কয়েকটি শব্দ হতো। তারপর পর্দায় ভেসে উঠত চূড়ান্ত ফল। রক্তটি কোথা থেকে এসেছে, কত দিন আগে সেখানে পড়েছে, এমনকি কে সেটি ফেলেছে, তারও উত্তর। বাস্তবে কয়েক মিনিটে একটি নমুনা থেকে অপরাধের সব রহস্য তুলে ধরতে দিতে পারে এমন কোনও যন্ত্র আজতক নেই।
অ্যাভেরির মামলায় এফবিআই ১৯৯৫ সালে ও. জে. সিম্পসনের বিচারে ব্যবহৃত পুরোনো একটি পরীক্ষাপদ্ধতি প্রয়োগ করে। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, সংগৃহীত রক্তে ইডিটিএ পাওয়া যায়নি। সেই ফলের ভিত্তিতে তারা জানায়, সংরক্ষিত রক্ত এনে ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মেলেনি। শেষ পর্যন্ত অ্যাভেরি দোষী সাব্যস্ত হন।
তবে এখানেই বিতর্কের অবসান হয়নি। ওই পরীক্ষার ক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার পর অনেক দর্শক ও বিদ্যানুরাগী রেডিটে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ। পানীয় কিংবা প্রাকৃতিক পানিতে অতি সামান্য পরিমাণ ইডিটিএ শনাক্ত করার নানা পদ্ধতি রয়েছে। তাহলে রক্তের নমুনায় এ উপাদান শনাক্ত করা এত কঠিন কেন?
কারণ, পানীয়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণ আর অপরাধ তদন্তের জন্য সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করা এক বিষয় নয়। অপরাধস্থলের নমুনা কত দিন আগে সংগ্রহ করা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, পরিবেশের প্রভাবে তার রাসায়নিক গঠন বদলেছে কি না—এসব বিষয় ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। ইডিটিএর পরিমাণ এত কম ছিল যে পরীক্ষায় ধরা পড়েনি, কিংবা সময়ের সাথে সাথে নমুনায় তার অবস্থা বদলে গিয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
নিহত টেরিজা হালবাখের গাড়ি থেকে সংগৃহীত রক্তে সত্যিই ইডিটিএ ছিল না, নাকি ব্যবহৃত পরীক্ষায় তা শনাক্ত করা যায়নি, শুধু পরীক্ষার ফল দেখে এই প্রশ্নের সব উত্তর পাওয়া কঠিন। ঘটনাস্থলের পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরীক্ষা চালানো গেলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হতে হয়ত।
এই ঘটনাই ফরেনসিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে আনে। কোনো পরীক্ষায় একটি রাসায়নিক শনাক্ত না হওয়ার অর্থ সব সময় এই নয় যে সেখানে রাসায়নিকটি কখনোই ছিল না। পরীক্ষার নিজস্ব সীমা রয়েছে। সেই সীমা বিবেচনা না করলে ফলের ব্যাখ্যাও ভুল হতে পারে।
অপরাধ তদন্তের জগতে এমন জটিলতা বিরল নয়। আঙুলের ছাপ, চুল, হাড় কিংবা ডিএনএ, প্রতিটি আলামতেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনোটির সাহায্যে পরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। আবার কোনোটির ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার ভিত্তিই দুর্বল।
ধরা যাক, একটি অগভীর কবর থেকে শুধু হাড় ও দাঁত উদ্ধার করা হয়েছে। শরীরের নরম টিস্যু পচে গেছে। ফরেনসিক নৃতত্ত্ববিদ হাড় পরীক্ষা করে জানালেন, মৃত ব্যক্তি পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা এবং স্থূলকায় ছিলেন। শুধু হাড় দেখে কি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব?
হ্যাঁ। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা জানেন, শরীরের অতিরিক্ত ওজন বহনকারী হাড়ের গঠনে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, হাতের মতো শরীরের যে-সব হাড় সরাসরি শরীরের মূল ওজন বহন করে না, সেগুলোও স্থূল মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভারী ও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে পায়ের হাড় না থাকলেও কঙ্কালের অন্য হাড় থেকে ব্যক্তির শরীরের গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এবার উলটো একটি পরিস্থিতি কল্পনা করুন। সংরক্ষিত বনভূমিতে এক ব্যক্তির ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গেল। বন্যপ্রাণীর কামড়ে হাড়ে গর্তের মতো চিহ্ন তৈরি হয়েছে। এক্স-রে পরীক্ষায় ক্ষতের চারপাশে সূক্ষ্ম রেখা দেখা গেল। একজন বিশেষজ্ঞ দাবি করলেন, রেখাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, ক্ষত তৈরি হয়েছিল মৃত্যুর প্রায় ১০ বছর আগে।
এবার উত্তর হবে—না, শুধু ওই রেখা দেখে এভাবে ক্ষতের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ 'বোন্স'-এর একটি পর্বে এ ধরনের দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। সেখানে কাল্পনিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. টেম্পারেন্স ব্রেনান হাড়ের 'হ্যারিস লাইনস' দেখে ক্ষতের বয়স নির্ধারণ করেন। বাস্তবে হাড়ে এমন রেখা দেখা যায়। কিন্তু এগুলো তৈরি হয় হাড়ের বৃদ্ধির সময়। তাই এগুলো থেকে শৈশবের অসুস্থতা বা আঘাতের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে; প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাড়ে তৈরি ক্ষতের বয়স নির্ধারণের জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়।
আবার আঙুলের ছাপের কথাই ধরা যাক। একটি বাড়িতে নারী খুন হয়েছেন। লাশের পাশে রক্তমাখা কড়াই পড়ে আছে। প্রধান সন্দেহভাজন তাঁর স্বামী। কড়াইয়ের হাতলে পাওয়া আঙুলের ছাপ অস্পষ্ট। কিন্তু একজন বিশ্লেষক দাবি করলেন, ছাপগুলো নারীর, পুরুষের নয়। তাহলে কি স্বামীকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে?
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘামে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ পুরুষদের তুলনায় নারীদের আঙুলের ছাপে প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এই পার্থক্য কাজে লাগিয়ে আঙুলের ছাপ থেকে ব্যক্তির লিঙ্গ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো গবেষণায় সম্ভাবনা দেখা দেওয়া আর আদালতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া এক কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে 'ডবার্ট স্ট্যান্ডার্ড' অনুসরণ করা হয়। কোনো নতুন পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক মহলে কতটা পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য, বিচারকেরা সে বিষয়টি বিবেচনা করেন।
অর্থাৎ, আঙুলের ছাপের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থেকে কিছু ধারণা পাওয়া গেলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধ থেকে সরাসরি দায়মুক্ত করা যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। একজন নারী যৌন নির্যাতনের অভিযোগে একজন পুরুষকে শনাক্ত করলেন। তাঁর শরীর থেকে পাওয়া নমুনার ডিএনএর সাথে সন্দেহভাজনের ডিএনএ মিলে গেল। কিন্তু আদালতে আসামি জানালেন, তাঁর এক যমজ ভাই আছেন, যাঁর চেহারা-সুরত অবিকল তাঁরই মতো। দুই ভাইয়ের কেউই অপরাধ স্বীকার করছেন না। তাহলে আলামতে পাওয়া ডিএনএ আসলে কোন ভাইয়ের?
সাধারণ ডিএনএ পরীক্ষায় জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রায় অভিন্ন যমজদের আলাদা করা যায় না। কারণ, তাঁদের ডিএনএ প্রায় অভিন্ন। তবে উন্নত পরীক্ষায় জন্মের পর ডিএনএতে ঘটে যাওয়া কিছু পরিবর্তন এবং এপিজেনেটিক পার্থক্য শনাক্ত করে দুই ভাইকে আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এপিজেনেটিক পার্থক্য বলতে বোঝায়, ডিএনএর মূল গঠন না বদলালেও জিনের কার্যক্রমে যে পরিবর্তন ঘটে। বয়স, পরিবেশ ও জীবনযাপনের প্রভাবে জিনের কার্যক্রমে এমন পার্থক্য তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করা গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যমজদের আলাদা করা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু ফরেনসিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ত পাওয়া যায় চুল পরীক্ষার একটি ঘটনা থেকে।
১৯৭৮ সালে সান্টাই ট্রিবল নামের এক ব্যক্তি খুনের দায়ে দণ্ডিত হন। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি নাইলনের মোজা থেকে উদ্ধার করা চুল। বিশেষজ্ঞের দাবি ছিল, মোজায় পাওয়া ১৩টি চুলই একজন আফ্রিকান-আমেরিকান ব্যক্তির মাথার চুল এবং সেগুলোর গুণাগুণের সাথে ট্রিবলের চুলের মিল রয়েছে। প্রসিকিউটর এমনকি দাবি করেছিলেন, চুলগুলো অন্য কারও হওয়ার সম্ভাবনা এক কোটি ভাগের এক ভাগ মাত্র।
কিন্তু পরে এই দাবির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। মার্কিন বিচার বিভাগের এক পর্যালোচনায় এফবিআইয়ের পরিচালিত ২৬৮টি চুল বিশ্লেষণের মধ্যে ২৫৭টিতে গুরুতর ভুল পাওয়া যায়। ২০১২ সালে ট্রিবলের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা গেল, মোজায় পাওয়া কোনো চুলের সঙ্গেই তাঁর ডিএনএর মিল নেই। বরং একটি চুল ছিল কুকুরের।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চুলের গঠন দেখে কারও পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও সেটিকে ডিএনএ পরীক্ষার মতো নির্ভুল পরিচয় শনাক্তকরণ বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
তাহলে ফরেনসিক বিজ্ঞান কি অবিশ্বাস্য? মোটেই নয়। বরং এর শক্তি বুঝতে হলে সীমাবদ্ধতাও বুঝতে হবে। একটি আলামত কখনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে, কখনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু তার অর্থ কী, সেটি নির্ভর করে পরীক্ষার পদ্ধতি, নমুনার অবস্থা এবং অন্যান্য প্রমাণের সাথে তার সামঞ্জস্যের ওপর।
কাল্পনিক গোয়েন্দারা প্রায়ই একটি সূত্র থেকেই রহস্যের শেষ দরজাটি খুলে ফেলেন। বাস্তবে তদন্তকারীদের কাজ অনেক বেশি ধীর, সতর্ক এবং জটিল। তাঁদের সামনে থাকা প্রতিটি আলামতকে পরীক্ষা করতে হয়, প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি খুঁজতে হয়। আর কখনো কখনো সবচেয়ে সৎ বৈজ্ঞানিক উত্তরটি হলো—এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
শার্লক হোমসের পর্যবেক্ষণক্ষমতা তাই আজও প্রাসঙ্গিক। তবে বাস্তবের হোমসকে শুধু চোখ খোলা রাখলেই চলবে না; নিজের চোখে দেখা জিনিসের ব্যাখ্যা নিয়েও তাঁকে সন্দেহ করতে হবে। কারণ অপরাধস্থলে পড়ে থাকা কোনো বস্তু নীরব হলেও, তার অর্থ সব সময় স্পষ্ট নয়।
অপরাধস্থলের প্রতিটি চিহ্নের পেছনে যে গল্প
একটি ঘর। মেঝেতে পড়ে আছে রক্তমাখা কড়াই। পাশের টেবিল উলটে গেছে। দরজার কাছে কয়েকটি জুতার ছাপ। ঘরের মালিককে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেশীরা বলছেন, রাতে তাঁরা চিৎকার শুনেছিলেন। পরিবারের একজন সদস্যের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। পুলিশের ধারণা, এটি হত্যাকাণ্ড।
একজন গোয়েন্দার চোখে দৃশ্যটি অপরাধের সূত্রে ভরা। কিন্তু অপরাধস্থল থেকে পাওয়া প্রতিটি চিহ্ন যে অপরাধীর পরিচয় দেবে, এমন নয়। কোনো ছাপ নিরপরাধ মানুষেরও হতে পারে। কোনো রক্তের দাগ অপরাধের আগেই সেখানে পড়তে পারে। আবার গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলামত অসতর্কতায় নষ্ট হয়ে গেলে তদন্তের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
জেমস বন্ডের হাতে থাকা আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মাসুদ রানার ক্ষিপ্রতা দিয়ে কল্পনার জগতে মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাস্তবে তদন্ত শুরু হয় অনেক বেশি সাধারণ কিছু কাজ দিয়ে। প্রথমে নিশ্চিত করতে হয়, ঘটনাস্থল নিরাপদ কিনা। তারপর সীমানা নির্ধারণ, ছবি তোলা, আলামত সংগ্রহ এবং প্রতিটি পদক্ষেপ নথিভুক্ত করার কাজ চলে।
এখানে তাড়াহুড়ো করার সুযোগ নেই। কারণ, অপরাধস্থলে প্রবেশ করা প্রত্যেক মানুষ নতুন কিছু রেখে যেতে পারেন, আবার সেখান থেকে কোনো আলামত সরিয়েও ফেলতে পারেন। তদন্তকারীর নিজের উপস্থিতিও ঘটনাস্থলের অবস্থা বদলে দিতে পারে।
তদন্তের প্রথম কাজ, কিছুই নষ্ট না করা
অপরাধের ধরন অনুযায়ী ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়। রক্ত, দেহের অন্যান্য তরল, চুল ও টিস্যুর মতো জৈবিক নমুনা এক ধরনের প্রমাণ। আঙুলের ছাপ, হাতের তালুর ছাপ ও পায়ের ছাপ আরেক ধরনের। জুতা ও গাড়ির টায়ারের ছাপ, কাপড়ের আঁশ, মাটি, উদ্ভিদের অংশ কিংবা কাচের টুকরোর মতো ক্ষুদ্র উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর বাইরে রয়েছে ডিজিটাল আলামত। মোবাইল ফোনের কল ও বার্তার রেকর্ড, ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্য এবং ই-মেইল থেকে তদন্তকারীরা ঘটনার সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ কিংবা তাঁদের গতিবিধি সম্পর্কে সূত্র পেতে পারেন। অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র, যন্ত্রপাতির আঘাতের চিহ্ন এবং মাদক বা আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত উপাদানও তদন্তের অংশ হতে পারে।
তবে সব অপরাধস্থলে সব ধরনের আলামত পাওয়া যাবে না। চুরির ঘটনায় যে নমুনা গুরুত্বপূর্ণ, হত্যাকাণ্ডে তা নাও হতে পারে। আবার অপরাধের ধরন একই হলেও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
সাধারণ একটি চুরির তদন্তের কথাই ধরা যাক। তদন্তকারীরা প্রথমে ঘটনাস্থলের ছবি তোলেন এবং সামগ্রিক অবস্থা নথিভুক্ত করেন। এরপর দরজা-জানালা কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির ঢোকার ও বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ থেকে ক্ষুদ্র আলামত সংগ্রহ করেন। যে-সব স্থানে অপরাধীর স্পর্শ লেগে থাকতে পারে, সেখান থেকে নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার উপযোগী উপাদান সংগ্রহ করা হয়। এরপর সংগ্রহ করা হয় অন্যান্য জৈবিক নমুনা এবং সুপ্ত আঙুলের ছাপ।
কোন কাজটি আগে করতে হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। একটি নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্যটি নষ্ট হয়ে গেলে পরে আর সেটি উদ্ধার করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই অপরাধস্থলে কাজের পরিকল্পনা তৈরি করা হয় আলামতের ধরন ও সম্ভাব্য গুরুত্ব বিবেচনা করে।
ঘটনাস্থলে কারা কাজ করেন?
অপরাধস্থল তদন্তের দায়িত্ব সব জায়গায় একই ধরনের নয়। বড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় প্রশিক্ষিত অপরাধস্থল বিশেষজ্ঞদের আলাদা দল থাকতে পারে। ছোট সংস্থায় প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছানো পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা গোয়েন্দাকেই তদন্তের পাশাপাশি আলামত সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
একজন গোয়েন্দা সাধারণত সম্ভাব্য সন্দেহভাজন ও ভুক্তভোগীর স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, সাক্ষীদের বক্তব্য শোনেন এবং পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে এগোন। অন্যদিকে অপরাধস্থল বিশেষজ্ঞদের দল ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে আলামত সংগ্রহ করে। এই দলে আলোকচিত্রী এবং আঙুলের ছাপ, ডিএনএ কিংবা সূক্ষ্ম আলামত সংগ্রহে দক্ষ কর্মী থাকতে পারেন।
কাজের ধরন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনও বদলে যায়। কোথাও রক্তের দাগ বিশ্লেষণ জরুরি, কোথাও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার পরীক্ষা করতে হয়, আবার কোথাও ডিজিটাল তথ্যই হয়ে ওঠে তদন্তের প্রধান সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধস্থল তদন্তকারী হিসেবে কাজ করার জন্য সারা দেশে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো বাধ্যতামূলক সনদ নেই। তবে আন্তর্জাতিক শনাক্তকরণ সমিতি থেকে অপরাধস্থল তদন্ত, আলামত বিশ্লেষণ ও ঘটনার পুনর্গঠন বিষয়ে বিভিন্ন পেশাগত সনদ নেয়া যায়। অপরাধের প্রমাণের ছবি তোলা এবং অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর কারণ তদন্তের জন্যও আলাদা সনদ রয়েছে।
কিন্তু সনদ কিংবা বিশেষজ্ঞ পরিচয়ই যথেষ্ট নয়। তদন্তের প্রতিটি ধাপ এমনভাবে সম্পন্ন করতে হয়, যাতে পরে অন্য কোনো বিশেষজ্ঞও সেই কাজ যাচাই করতে পারেন।
একটি অপরাধস্থল কীভাবে পরীক্ষা করা হয়
তদন্তের শুরুতেই পুরো এলাকা ঘিরে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। শুধু যেখানে লাশ পাওয়া গেছে, সেই জায়গাটুকু নয়; অপরাধীর সম্ভাব্য আসা-যাওয়ার পথ এবং সংশ্লিষ্ট আলামত থাকতে পারে এমন আশপাশের এলাকাও এর মধ্যে রাখতে হয়। শুরুতেই সীমানা খুব ছোট করে ফেললে বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিহ্ন বাদ পড়ে যেতে পারে।
এরপর নিশ্চিত করা হয়, সেখানে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রিত আছে কি না। হলুদ ফিতা বা অন্য ব্যবস্থা দিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। ক্রাইম সিন দলের সদস্যদের চলাচলের জন্য একটি নির্দিষ্ট পথ ঠিক করা হয়। কে কখন ঢুকছেন, কেন ঢুকছেন এবং কখন বের হচ্ছেন, তার হিসাবও রাখা হয়। তবে (অবশ্যই আমাদের দেশে এভাবে নিবিড়ভাবে অপরাধ তদন্তে আলামত সংগ্রহ চলে কিনা, পাঠকের মতো আমারও সন্দেহ আছে।)
তদন্তে নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। ঘটনাস্থলে অস্ত্র, বিপজ্জনক রাসায়নিক কিংবা জৈবিক ঝুঁকি থাকতে পারে। চিকিৎসাকর্মী, ফায়ার সার্ভিস বা ময়নাতদন্তকারী দলের সদস্যদের সেখানে ঢুকতে হলে তাঁদেরও আলামত সুরক্ষার নিয়ম জানাতে হয়।
এরপর তদন্তকারীরা পরিকল্পনা করেন। কী ধরনের অপরাধ ঘটেছে, কী কী আলামত পাওয়া যেতে পারে এবং কোন পদ্ধতিতে সেগুলো সংগ্রহ করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রাথমিক ধারণা তৈরি করেন। সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও এই পরিকল্পনায় কাজে লাগে। আবহাওয়া, সময় এবং বিশেষ কোনো ঝুঁকি থাকলে সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হয় (আমাদের দেশে এমন করেন কিনা আবারও সন্দেহের কথা জানাচ্ছি)।
অপরাধ তদন্তে পরিকল্পনা তৈরি হলে শুরু হয় প্রাথমিক পরিদর্শন। তদন্তকারী পুরো এলাকা ঘুরে দেখেন। ঘরের আলো জ্বলছিল কি না, দরজা ও জানালার অবস্থা কী ছিল, পর্দা কোথায় ছিল, আসবাবপত্র কীভাবে সাজানো ছিল—এসব তথ্য লিখে রাখা হয়। কোনো অস্বাভাবিক গন্ধ কিংবা ঘরের তাপমাত্রাও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ আলামতের ছবি তোলা হয়, নোট নেওয়া হয় এবং সংগ্রহের অগ্রাধিকার ঠিক করা হয়।
এরপর আলামত সংগ্রহের পালা। ক্যামেরা, ভিডিও এবং প্রয়োজনে ত্রিমাত্রিক স্ক্যানারের সাহায্যে ঘটনাস্থলের বিস্তারিত অবস্থা ধরে রাখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী নকশা ও স্কেচ তৈরি করা হয়। নমুনা সংগ্রহ, প্যাকেটজাত ও সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বিশেষ করে রক্ত কিংবা অন্য জৈবিক নমুনার ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও বিপদ ডেকে আনতে পারে। পরিবেশের প্রভাবে নমুনা নষ্ট হতে পারে, আবার মানুষের অসতর্কতায় অন্য উপাদানের সংস্পর্শে এসে দূষিতও হতে পারে।
তদন্ত শেষ করার আগে পুরো এলাকা আবার পরীক্ষা করা হয়। এই দ্বিতীয় পরিদর্শনের উদ্দেশ্য হলো, কোনো জায়গা বা আলামত যেন বাদ না পড়ে। এরপর সংগৃহীত প্রতিটি আলামতের তালিকা তৈরি করা হয়। তালিকার বিবরণের সাথে ছবির তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। একটি পিস্তল উদ্ধার করা হলে তার সিরিয়াল নম্বরও নথিতে ঠিকভাবে উল্লেখ করতে হয়।
এই নথিপত্রের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পর তা কার হাতে ছিল, কোথায় রাখা হয়েছিল, কখন পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে—প্রতিটি পর্যায়ের হিসাব সংরক্ষণ করতে হয়। এই ধারাবাহিক নথিকে বলা হয় 'প্রমাণের হেফাজত-শৃঙ্খল'। আদালতে কোনো আলামত উপস্থাপনের সময় তার পরিচয় ও সংরক্ষণের ধারাবাহিকতা যাচাই করা যায় এই নথির মাধ্যমে।
ল্যাবরেটরির আগেই কি রহস্যের সূত্র মেলে?
সব আলামত সরাসরি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় না। কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা ঘটনাস্থলেই করা সম্ভব। এসব পরীক্ষার সাহায্যে কোনো পদার্থের সম্ভাব্য ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা লাল তরলটি রক্ত, নাকি সস—প্রাথমিক পরীক্ষায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে। কোনো পদার্থ বিষ বা মাদক কি না, সে সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এ ধরনের পরীক্ষাকে বলা হয় 'প্রিজাম্পটিভ টেস্ট' বা প্রাথমিক শনাক্তকরণ পরীক্ষা। এতে সব সময় কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। তবে পদার্থটি কোন ধরনের, তা বোঝার সূত্র পাওয়া যায়। ফলে তদন্তকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো সবচেয়ে জরুরি।
পরীক্ষাগারে পাঠানোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা নমুনা বিশ্লেষণ করেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা না থাকলে অন্য পরীক্ষাগারের সাহায্যও নেওয়া হতে পারে। কোন আলামত মামলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা সব সময় ঘটনাস্থলেই বোঝা যায় না। তাই নমুনা সংগ্রহের পর তার গুরুত্ব নতুন করে যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ক্রমেই ছোট ও সহজলভ্য হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে অপরাধস্থলেই আরও বেশি ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। এতে তদন্তের গতি বাড়বে, দ্রুত কিছু প্রশ্নের উত্তরও মিলতে পারে। তবে প্রযুক্তি উন্নত হলেই ভুলের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
শেষ পর্যন্ত আলামতই কি অপরাধীকে চিনিয়ে দেয়?
ধরা যাক, একটি হত্যাকাণ্ডের স্থানে আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল। সেই ছাপের সাথে একজন সন্দেহভাজনের ছাপের মিল রয়েছে। এই মিল তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু ছাপটি কখন সেখানে পড়েছিল, ব্যক্তি কীভাবে সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁর উপস্থিতির কোনো স্বাভাবিক ব্যাখ্যা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
একইভাবে ডিএনএর মিল কিংবা রক্তের নমুনা থেকে পাওয়া তথ্যও অন্যান্য আলামত ও সাক্ষ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হয়। ফরেনসিক পরীক্ষার ফল তদন্তকে নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ফলের অর্থ নির্ভর করে তার প্রেক্ষাপটের ওপর।
শার্লক হোমসের কাছে ছোটোখাটো কোনো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল। বাস্তব তদন্তেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তবে তাঁর মতো তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক হলেও তদন্তকারীকে জানতে হবে, কোন তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় আর কোথায় থামতে হয়।
কারণ অপরাধ তদন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু দ্রুত রহস্যের সমাধান নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো, সঠিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা, নিরপরাধ কাউকে ভুলভাবে অভিযুক্ত না করা এবং আদালতে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা।
গোয়েন্দা কাহিনিতে শেষ পাতায় অপরাধীর মুখোশ খুলে যায়। বাস্তবে সেই মুখোশ খুলতে লাগে ধৈর্য, পদ্ধতিগত কাজ এবং নিজের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সাহস। একটি ক্ষুদ্র চিহ্ন অনেক সময় বড় রহস্যের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢোকার আগে নিশ্চিত হতে হয়, যে পথটি বেছে নেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রমাণের পথ কি না। এই লেখাটি তৈরি হয়েছে মূলত লেখকের গোয়েন্দা নির্ভর অপরাধ কাহিনির দীর্ঘ পাঠ থেকে। এখানে যুক্ত হয়েছে উন্নত বিশ্বের অপরাধ তদন্তে নিবিড় ফরেনসিক পরীক্ষা পদ্ধতি-বলা বাহুল্য আমরা অপরাধ তদন্তে এখনও বলপ্রয়োগ কৌশলই প্রয়োগ করি সবার আগে। মানে মাইর। তারপর শুরু হয় প্রশ্ন-উত্তর পর্বের- পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন; এই বিশেষ ফরেনসিক তদন্ত কৌশল একান্তই আমাদের।
