মেঘ-বৃষ্টি-বাদল
ঝড়বাদলের কথা মনে করলে মনে যে ছবি আসে, তা বিলাইতি ব্লিজার্ডের নয়, গেইল-স্টর্মের যে হাওয়া গলাধাক্কা দিয়ে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যায়- চোখ থেকে স্বতপ্রবৃত্ত অশ্রুর কণা ছিটকে দেয় সেটাও নয়; সে ছবি অর্ধেক জীবন আগের বাদলা অন্ধকারের ছবি। সে অন্ধকারের রঙ কালচে সবুজ, সূর্য উঠবার পরও যে অন্ধকার চলে যাবে না- হয়ে উঠবে সবুজাভ। বাইরে গাছপালা সমস্ত রাত বৃষ্টি শোষণ করে সতেজ। যে চালতাগাছ সযত্নকুঞ্চিত পাতায় আঁধার করে রেখেছে কার্নিশ- তার আড়ালে হলুদ পরাগকেশরে ছাওয়া অমল শাদা ফুল ফুটেছে- একবেলার বরষাপীড়িত ফুল। কামিনী ফুটেছে কোথাও, সেই গন্ধের কাছে গলিতে কাঁঠালের ভুতি- আনারস- পচা আনাজের মিশ্র গন্ধ পরাভূত। পথের ডিভাইডারে পথতরু বকুলও থেমে থাকেনি, হাতে বকুলমালা জড়িয়ে শিশুরা বেচবে আরেকটু পরে, তারা কুড়িয়ে আনবে গুচ্ছ গুচ্ছ পাতাসহ কদমফুল। পানি জমে গেছে পথে, রিকশাওয়ালার মাথায় পলিথিন জড়ানো টোকা, পিঠে পলিথিনের ঢাকনা সুপারম্যানের কেইপ যেন- ফুলে ফুলে উঠছে সজল বাতাসে...আহা সেই তো ঢাকার সুপারম্যান- হৈ হৈ করে উন্মত্ত গতিতে ছুটিয়েছে রিকশা। পেছনে রেইনক্লথে মুড়ি দিয়ে রিকশার আরোহীরা চলেছে গন্তব্যে। অলিগলিতে একদা ঝপাঝপ নেমে যেত কলাগাছের মান্দাস, ভেলা বানাবার জন্য কলাঝোপ আর শহুরে ঢাকায় সুলভ নয়, সেসব ছিল আমার শৈশবে। সকালের রেডিওতে কেন যেন ঠিক ঐ বর্ষণক্লান্ত দিনেই বাজত কে এল সায়গলের মেঘমন্দ্র গলায় 'বাগ লাগা দুঁ সজনীঈঈঈ', তানসেন নেমে আসতেন উঞ্ছ সে শহরে। ছুটা বুয়ার ঘরে পানি ঢুকেছে, সে আসবে না। বান্ধা বুয়ার কাজ সেদিন শ্লথ, নিজ গ্রামে বাইষ্যামাসের ভাসা পানিতে সে কেমন উলঙ্গ হয়ে মাথার ওপর বইখাতা-পরনের কাপড় জড়ো করে সাঁতরে ইস্কুলে যেতো সেসব গল্প হবে। মাছের বাজারে একগলা জল, তবু নববর্ষার পানিতে যে মাছ উচ্ছলিত আনন্দে ধরা পড়ে গেছে- তারাও এসেছে সভায়। ছাইওয়ালীর হাঁক শোনা যাবে না সেদিন, শুধু ত্রস্ত পথিকের কানে বাজবার জন্য রিকশার ক্রিংক্রিং বেল বাজবে।
ঘরে মিটসেফের অন্তরালে বিগলিত লবণ আর চিনির দানা, করুণ কেরানীর মতো মিইয়ে গেছে মুড়ি। সন্ধ্যায় আপন জ্যোতিতে আবির্ভূত হবে বলে ডাঁই করা আছে ম্লান মোমবাতি, দেশলাই। বাজারহীন দুপুরের মেনু- পেঁপেভাজি ডাল আর ডিমসেদ্ধ। বিকেলের সভা পেকে উঠবে মৃদু আঁচে টনটনে করে টালা কাঁঠালবিচি চিবিয়ে। সারাদিন বারান্দায় মেলে রাখবার পরেও যত শাড়ি লুঙ্গি চাদর শুকায়নি- তারা শুকাতে আসবে আয়তাকার ঘরের ভিতর, আয়তক্ষেত্রের কর্ণ-বরাবর ঝোলানো হয়েছে কাপড় শুকাবার দড়ি- সেখানে মাড়-নীল-এরারুটের সম্মিলিত গুমোট গন্ধ, মাতাল পাখার হাওয়ায় শুকাবে কাপড়। ততক্ষণে ভাত ফুটবার আর মাছ ভাজবার গন্ধের কাছে ফিরত এসেছে ক্লান্ত মোজার গন্ধ, আবার বৃষ্টি হবে কিনা গৃহস্থ সেসব আলাপে মশগুল। পথের কুকুর ভাবছে- আর কত সিক্ত হব ঈশ্বর! গানের মাস্টার এসেছে কোনো না কোনো বাড়িতে, উজ্জ্বল গলায় গান ধরেছে- "হে-এ-এ-এ আকাশবিহারী-নীরদবাহন জল"! (ঐ 'হে'-টুকু আমরা কেমন রে-রে করে গাইতাম, মনে হতো আখড়ায় লাঠি-হাতে নামছি।) বাইরে বর্ষণক্ষান্ত গোধূলি গগন, পশ্চিম দিগন্তে নীল মেঘের পাহাড়ের ওপর পুঞ্জ পুঞ্জ সোনা, সেই গাঢ় ধূসরতম নীলের ওপর দিয়ে এক পোঁচ শাদা গোবকের সারি উড়ে যাবে শহরের শেষতম জলাশয়ের একটি থেকে অপরটিতে। বৃষ্টির পর বাতাস এত পরিষ্কার যে ফিঙে পাখির তীব্র শিস শোনা যাবে। পৃথিবীতে আমি যত সুন্দর দেখেছি, তাদের সব্বার রূপ শৈশবে বাংলাদেশে দেখা শ্রাবণসন্ধ্যার কাছে ম্লান।
টানা বৃষ্টিতে স্কুলে তখন 'রেইনি ডে' হতো। সে এক অদ্ভুত অর্ধনমিত দিন। বেশির ভাগ পড়ুয়া অনুপস্থিত, শিক্ষকশিক্ষিকারাও ঢিলেঢালা বেগে পড়াচ্ছেন, গল্প বলছেন, গান গাইতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের। পরীক্ষা নেই কোনো। খেলার মাঠেও জল দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের কলেজের দালানের পেছনে একটা কেয়াঝোপ ছিল, সেখানে সৌরভের উৎসব। শহরের শেষ ব্যাঙ মোমমাখা ট্রাফে বিঁধে ব্যবচ্ছিন্ন হবার ভয় জয় করে ডেকে ফেলেছে- গ্যাঙর গ্যাঙ। সেসব দিনে একতলার গরাদ দেয়া জানালার বাইরে দেখতে পেতাম পাশের বাড়ির দেয়ালে গাঢ় শ্যাওলার তেলচিত্র। একটি বাড়ি থেকে জন্মবিরহী কোনো মানুষ প্রতিদিন বাজাত কয়েকটি গান। মুছে যাওয়া দিনগুলি। আমার জীবনের এত আলো। বড় সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি। শেষোক্ত গানে 'কতকাল' শব্দটি প্রতিমা যে দিনক্ষয়ে-অক্ষয় বেদনার সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, আমাকে তা আজও আলোড়িত করে, তখন অবশ্য প্রতিদিন একই গান শুনতে বিরক্ত লাগত। কিছুদিন পর কেমন হাওয়া বদলে গেল। ইটের রাস্তায় কদমতলা স্কুলের সামনে ছেলেরা জড়ো হয়ে গাইতে লাগল- "দে দে পেয়ার দে।" আকুল বরষার ব্যাকুল বিরহ কেমন নেই হয়ে গেল, লোকে তখন সেধে-মেঙে ভালোবাসা নিতে পারঙ্গম। আমরা তো অনেক ছোট, হিহি করে গাইলাম- মেরে আঙনে মে তুমহারা কেয়া কাম হ্যাঁয়। আমাদের আঙন থেকে বিরহী-বিরহিনীরা সরে গেল। বর্ষা যদিও ফিরে ফিরে এল।
শিখেছি বর্ষা নাইয়র যাবার ঋতু। কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া। পুঁথিঘর প্রকাশিত হরলাল রায়ের রচনা বই, সেখানে পত্র লেখার নমুনাও থাকত। পাঠাগার স্থাপনের আবেদন, ভিপিপি-যোগে বই পাঠানোর অনুরোধ, সংবাদ প্রতিবেদন। আর ব্যক্তিগত পত্রলিখন- ভাই বোনকে নিতে আসতে পারছে না। অতঃপর ভাই লিখছে- "তোমার জীবন হোক চন্দনের মতো, ক্ষয়ে ক্ষয়ে দিতে শান্তি, তোমার জীবন হোক ধূপের মতো, পুড়ে পুড়ে দিতে স্বস্তি।" আর আমি ভাবছি- দুচ্ছাই! স্কুলের খাতায় রচনা লিখতাম- 'বর্ষাকাল'। কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা। কখনো রচনার নাম- 'একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা'। হরলাল রায় শিখিয়েছিলেন- রচনায় কবিতা থেকে কোটেশন দিতে। কবিতাময় তখন আমার ভুবন, সন্ধ্যা থেকে হ্যারিকেনের ডুম সাফ করা হচ্ছে- বিজলিবাতিহীন সেইসব সন্ধ্যায় সঞ্চয়িতা খুলে যে কোনো জায়গা থেকে পড়তে শুরু করে দিতে হবে, মোমের কম্পিত আলোয় বসে নিষ্কম্প মুখে শুনবে আমার দাদি। তেমনি এক দিনে পড়ে ফেলেছি 'হৃদয় যমুনা'র সেই অমোঘ লাইন, "আজি বরষা গাঢ়তম; নিবিড় কুন্তলসম মেঘ নামিয়াছে মম দুইটি তীরে।" বাংলাভাষায় পারসনিফিকেশনের কি আশ্চর্য নমুনা। সত্যিই যেন নিচু হয়ে আমার মুখের কাছে নেমে এসেছে মেঘময়ী বাদলা আকাশ, তার কপালের দু'ধার থেকে কালো কেশ নেমে এসে আঁধার করে দিয়েছে আমার আর তার নিরালা চুম্বিত ভুবন।
আম্মার কাছে তখন পড়ছি গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো। 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন'-এ বর্ষাকাল এসেছে, "ক্ষুধিত পদ্মা উদ্যান গ্রাম শস্যক্ষেত্র এক-এক গ্রাসে মুখে পুরিতে লাগিল। বালুকাচরের কাশবন এবং বনঝাউ জলে ডুবিয়া গেল। পাড় ভাঙার অবিশ্রাম ঝুপঝাপ শব্দ এবং জলের গর্জনে দশ দিক মুখরিত হইয়া উঠিল।" ঘোর বর্ষার বিকেলে প্র্যামে করে রাইচরণ মনিবের পুত্রশিশুকে নিয়ে ধানখেত-নদীতীরে ঘুরতে বের হয়েছে। শিশু কদমফুলের বায়না করেছে, কাদা মাড়িয়ে রাইচরণ ফুল পাড়তে গেল, যাবার আগে বলে গেল- "খবরদার জলের ধারে যেয়ো না।" "কিন্তু ঐ-যে জলের ধারে যাইতে নিষেধ করিয়া গেল, তাহাতে শিশুর মন কদম্ব ফুল হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া সেই মুহূর্তেই জলের দিকে ধাবিত হইল। দেখিল, জল খলবল ছলছল করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে; যেন দুষ্টামি করিয়া কোন-এক বৃহৎ রাইচরণের হাত এড়াইয়া এক লক্ষ শিশুপ্রবাহ সহাস্য কলস্বরে নিষিদ্ধ স্থানাভিমুখে দ্রুত বেগে পলায়ন করিতেছে। তাহাদের সেই অসাধু দৃষ্টান্তে মানবশিশুর চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল...দুরন্ত জলরাশি অস্ফুট কলভাষায় শিশুকে বার বার আপনাদের খেলাঘরে আহ্বান করিল।" তখনো আমি প্রির্যাফায়ালাইটদের আঁকা সর্বনাশিনী জলপরীদের দেখিনি, রবীন্দ্রনাথের শব্দে আঁকা নিম্ফদের দেখেই আমি অভিভূত। এরপর রাইচরণের জীবনব্যাপী ট্রাজেডির শুরু। তার চেয়ে 'সমাপ্তি' গল্পের সেই বর্ষাকাল ভালো। মেঘমুক্ত আকাশ, ঘনবর্ষার জল গ্রামের বেড়া- বাশঝাঁড়ের তলা চুমে ঝলমলিয়ে চলেছে, নৌকায় করে অপূর্বকৃষ্ণ গ্রামে ফিরছে, "যুবকের মানস-নদী নববর্ষায় কূলে কূলে ভরিয়া আলোকে জ্বলজ্বল এবং বাতাসে ছলছল করিয়া উঠিতেছে।" আমারও। কেননা এরপর প্রেম আসছে, অপূর্বকৃষ্ণ গ্রামের অবাধ্য-অনিচ্ছুক কিশোরী মৃন্ময়ীকে বিয়ে করবে। রাতের রানার যে পথে ডাক নিয়ে যায়, সেই পথ ধরে মৃন্ময়ী শ্বশুরবাড়ি থেকে পালাতে চাইবে, পরিচিত মাঝি অকল্যাণের ভয়ে তাকে ফিরিয়ে আনবে শ্বশুরবাড়িতে। একদিন স্বামীর সঙ্গেই মৃন্ময়ী পালাবে কুশীগঞ্জে বাপের কর্মস্থলে। সেই তো তিনটি দিনের পিকনিক তাদের, বর্ষাশেষে জলপথযাত্রার সে কি আশ্চর্য আনন্দময় ছবি! যুবকের সঙ্গে তার কিশোরী স্ত্রীর প্রথম মানসিক সন্ধি। তবে সবচেয়ে ভালো 'পোস্টমাস্টার'-এর শেষের সেই বর্ষার নৌপথ, তাতে এমন এক ব্যথা আছে যার সঙ্গে জন্ম-মরণ-পুনর্জন্ম গাঁথা। যে জলপথে চলেছে- তার মন উদাসীন বিরহী, সে ফিরতে পারে কিন্তু চায় না, কেননা "তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে- এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।" কিন্তু যে স্থলে রয়ে গেল, সে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে লাগলো মায়া-করুণা-ভালোবাসার দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ। 'মেঘ ও রৌদ্র'তেও একইরকম দশা। কিশোরী গিরিবালার বিয়ে হয়ে গেলে সে নৌকোয় করে চলে গেল- পাপিয়া ডাকা সেই রোদেলা সকালে যেন জলের দুলুনির সঙ্গে বয়ে এলো তার নববর্ষার সওগাত- ভেজা বকুলফুল, কেয়াখয়ের, ডাঁসা পেয়ারা, কালোজাম, প্রায়ান্ধ শশিশেখর এই প্রথম যেন সেসবের মানে খুঁজে পেলেন; তিনি নিঃস্বপ্রায় স্থলে দাঁড়িয়ে—ঘরে- পথে- গ্রামে কোথাও তাঁর সান্ত্বনা রইল না। 'একরাত্রি'র সুরবালা অবশ্য তার বাল্যপ্রেমিকের সঙ্গে স্থলেই দাঁড়িয়ে ছিল, দুর্যোগময় সে রাতে জল-স্থল একাকার হয়ে গেছিল।
যাক, রবীন্দ্রনাথ কতভাবে আমাদের বর্ষাকাল চিনিয়েছেন তা বলতে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ নয়, প্রবন্ধমালা জরুরি। এ লেখার উদ্দেশ্য তা নয়। শুধু নতুন পানির মাছের মতো রবীন্দ্রজালে আটকা পড়া ছাড়া আমাদের বাংলাভাষাভাষীদের গতি নেই বলে ঐটুকু। 'পল্লী বর্ষা'র পরিচয় দিয়েছিলেন জসীমউদ্দীন- "আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাটে-মেঘের আড়ে, কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছলছল জল-ধারে।" আরেকটু বড় হবার পর পাঠ্যবইয়ে বুদ্ধদেব বসু আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর ছয়টি বছরের আশ্রয়- পুরানা পল্টনের টিনের ঘরে। সেখানে সতেরো বছর বয়সের বুদ্ধদেব দেখা পাচ্ছেন এক অবিস্মরণীয় বর্ষার।
"অমন ধ্বনিবর্ণবহুল, উচ্ছৃঙ্খল, অজস্র বর্ষা আর দেখতে পাবো না! কী ঘন সমারোহেই না বর্ষা নামতো সেই নির্জন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে! সারা আকাশ মেঘে-মেঘে নিবিড়—স্তরের পর স্তর, ঢেউয়ের পরে ঢেউ, গাঢ়-নীল; কখনো দিগন্ত থেকে যেন মেঘের স্তম্ভ উঠে আকাশ বিদীর্ণ করে দিতো; কখনো তরঙ্গক্ষুব্ধ মেঘের সমুদ্র আকাশকে জাপটে ধরে থাকতো, শুধু দিকরেখার কাছে খানিকটা দেখা যেতো বর্ণহীন শূন্য। মেঘের মিছিল গড়িয়ে চলেছে, প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে আকাশের চেহারা, জানলার কাছে বসে-বসে আমি দেখতুম... চালের উপর বৃষ্টির অবিরাম গান...সকালবেলাকার ছেঁড়া মেঘের আকাশ, ভিজে হাওয়া, মাঠে জমে-থাকা জল, মাঠ-ভরা নতুন সবুজ ঘাস, আমাদের উঠোনের তুলসী-মঞ্চে ঘন লতার আড়ালে ঘন-নীল অপরাজিতা, মাটির গন্ধ, বুনো ফুলের গন্ধ। আকাশ-ভরা সেই নরম-নীল মেঘ, সেই অশ্রান্ত, অজস্র বর্ষণ; বাইরে তাকালে মনে হতো সমস্ত সৃষ্টি যেন ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে; মনে হতো, পৃথিবীর শেষ সীমা এইখানে।"
নিরালা সেই টিনের ঘর থেকে বুদ্ধদেব বসুই একদিন টেনে আনবেন 'রাত ভ'রে বৃষ্টি'র সেই অবিমৃষ্যকারী রাতে, সেরাতে ঝড়-জলের কারণে ট্রাম চলবে না, তিনিই শোনাবেন 'ভালোবাসা'র মতো অমন একটি আত্মম্ভরী শব্দ আসলে জৈব এবং যৌন- সেকারণেই শরীর মরতে চলা প্রৌঢ় স্বামীস্ত্রী অত খিটখিট করে। তবে তখনো তার দেরি আছে।
ঝড়বাদলের এক রাতে ক্যাথির জীবন থেকে হারিয়ে গেল তার বাল্যপ্রেমিক- শৈশবসঙ্গী- বাপের পোষ্যপুত্র হীথক্লিফ। মুরল্যান্ডে সারা রাত খুঁজেও ক্যাথি আর তাকে ফিরে পেল না, সেই যে অসুখ করল তার- সেটা রইল আমৃত্যু। হীথক্লিফ যখন আবার ফিরল, তখন ক্যাথি বিবাহিতা। এমিলি ব্রন্টির এই উপন্যাস পড়ে আর্ত-বিচলিত-সংক্ষুব্ধ হয়নি এমন কি কেউ আছে? আমার জানা নেই। শার্লট ব্রন্টি আর জেন অস্টেনের নায়িকা-সহনায়িকারাও বৃষ্টির ভিতর ভবিতব্যের সামনে পড়ে গেছেন বারবার। ডিকেন্সের 'গ্রেট এক্সপেক্টেশন' আর 'ব্লিক হাউজ'-এর দিনমান বৃষ্টি-ঝড়জল কে ভুলতে পারে! 'আ ক্রিসমাস ক্যারল'-এ শীতের জবুথবু বৃষ্টি? ডিকেন্সে বৃষ্টিপাত শীতকালে (সারা বছরই কমবেশি), অনন্ত অবিরাম জলধারা, যেন ভূতের পদক্ষেপ, গলিগুলো নোংরা নালায় পরিণত, কাদার বন্যা পথে, বাতাসে কয়লার কালিমা মিশে যেত বৃষ্টিকণায়। ফকনারের বৃষ্টি প্রথম এসেছিল দীর্ঘশ্বাসের বেশে- যেন অদম্য উত্তেজনার সমাপ্তি হলো মাত্র এমন শ্বাসের মতো, এরপর সেই বৃষ্টি হয়ে উঠলো গরম ছররা গুলির মতো বড় বড় হিসহিসে দানা (অ্যাজ আই লে ডায়িং)। 'ডাবলিনার্স'-এ জয়েস টের পেয়েছেন অবিরত ছুঁচের মতো বৃষ্টি- ভাঙা শার্সির ওপারে, ভিজিয়ে দিচ্ছে চষা জমি। ভার্জিনিয়া উলফের বৃষ্টি মিহি হয়ে ঝরছিল দুধিয়া আকাশ থেকে, তারাগুলো ঝাপসা করে, পেভমেন্ট পিচ্ছিল করে। থিয়েটার থেকে বের হওয়া দর্শক ভাবছিল ছাতাটাতা খুলবে কি না। খেতের ওপর বাগানের ওপর সেই বারিপাতে মাটির গভীর গন্ধ বের হয়ে এসেছে। বৃষ্টির দানা কোথাও ঘাসের ফলকে স্থির, কোথাও বুনোফুলের গহ্বর পুরেছে, কোথাও বাতাসের আঘাতে বিভক্ত, মাঠের গোরুর দল ঝোপের ছায়ায় ভেজা গায়ে ঘাস রোমন্থনরত। গারগয়েলগুলোর ভ্যাঙচানো হাসি বেয়ে ঝরছে বৃষ্টি। মাতাল পাবের সামনে আছাড় খেয়ে গালি পাড়ছে বৃষ্টিকে। সন্তান জন্ম দিতে দিতে জননী শুনতে পেয়েছে ডাক্তার ধাত্রীকে বলছেন- "বৃষ্টি পড়ছে!" মিহি-সুমন্দ বৃষ্টি, ঢাকা মাথা আর খোলা মাথায় সমান যোগে পড়ছে- এমন নিরপেক্ষতায় যেন মনে হয় বৃষ্টির ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন তবে সেই ঈশ্বর ভেবেছেন- "এ ধারা শুধু পরম জ্ঞানীর তরে নয়, চরম ক্ষমতাধরের নয়, বরং সকল শ্বাসপ্রশ্বাসশীল জীবের এতে সমানাধিকার, চর্ব্য-চোষ্যবিলাসীর, অধম-মুর্খের, বেদনাদীর্ণের, কুমোরের লাল লাল কুন্ড থেকে প্রতিদিন একই ছাঁচের অসংখ্য পাত্র বের করে আনা লোকটির, দলামোচড়া চিঠিতে তপ্তলাল চিহ্ন রেখে যাওয়া মনীষার, গলির মিসেস জোন্সের, সক্কলেই যেন আমার এ অপার দানে অধিকার পায়!" (দ্য ইয়ার্স) 'কাফকা অন দ্য শোর'-এ মুরাকামির কলমে একটি দৃশ্য আছে প্রবল বৃষ্টির- দু'হাত স্বর্গের দিকে বাড়িয়ে বৃষ্টির তীক্ষ্ণ ফলার আঁচড় খেতে খেতে একটি উলঙ্গ মানুষ মুক্তি অনুভব করছে, যেন সে এবার কারও সত্যিকারের সান্নিধ্য পেল, এবার কেউ তার সঙ্গে ন্যায্য ব্যবহার করল। একদা হার্ডির 'ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড'-এ অমন আদ্যোপান্ত ভিজেছিল চাষাভুষো গ্যাব্রিয়েল ওক, নগ্ন হয়ে নয় অবশ্য- তার পরনের কাপড়ের কাঁচা রঙ ভিজে টপটপ করে বেয়ে পড়েছিল মইয়ের তলায়। একইভাবে কাঁচামাটির পথ তথা কাদার সমুদ্র ধরে স্কুলে যেতে যেতে বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন ছোট্ট নেরুদা। পাবলো নেরুদার শৈশবস্মৃতি জুড়ে কেবল বৃষ্টি, "মেরু অঞ্চল থেকে, হর্ন অন্তরীপের আকাশ থেকে ফ্রন্টিয়ারে ঝেঁপে আসা প্রপাতের মতো সেই দারুণ দখিনা বৃষ্টি।" চিলির বন্য পশ্চিমে প্রথম চোখ মেলে তিনি চিনেছিলেন "মাটি-কবিতা-বৃষ্টি"। কখনো সারা মাস, কখনো সারা বছর বৃষ্টি হতো। সেই বৃষ্টি কেমন? "বৃষ্টির সুতোগুলো, কাঁচের লম্বা লম্বা সুচের মতো ছাদের ওপর, জানালার ওপর স্বচ্ছ ঢেউয়ে ভেঙে পড়ত। প্রতিটি বাড়ি তখন শীতের সমুদ্রে বন্দর-অন্বেষু একেকটি পোত।"
পৃথিবীময় অতসব বৃষ্টি-দিনের গোলোযোগ জানতে পারিনি তখনো, বিহ্বল বালিকা। গানের স্কুলে দিব্যি নজরুলগীতি গেয়েছি দুলে দুলে- রিমঝিম রিমঝিম নামিলো দেয়া। কাজরী নাচিয়া চলো পুরনারী হরষে। কেতকী-কদম-যুথিকা কুসুমে বরষায় গাঁথো মালিকা। ধানি রঙ ঘাগরি, মেঘ-রঙ ওড়না পরিতে আমারে মাগো, অনুরোধ ক'রো না...অগ্রণী স্কুল থেকে আমাদের স্কুলে এসেছিল একটি চশমাপরা মেয়ে, খোঁনা গলায় গাইত- "শাওনরাতে যদি স্মরণে আসে মোরে।" মাঝে মাঝে ক্যাসেট প্লেয়ারে বেজেছে মৃদু মৃণাল চক্রবর্তী- "আজি বর্ষারাতের শেষে।" একখানা ক্যাসেটে খুঁজে পেয়েছি লতা-সলিলে বর্ষার অবিরল ধারা- "বরখা বাহার আয়ি, রস কি পুহার লায়ি।" তারপরপরই মদনমোহন- লতার সেতারে-জলতরঙ্গে-বাঁশিতে- "যারে বাদরা-ব্যায়রি যা!" গান নিয়ে গেছে মেঘদূতের জমানায়, নিয়ে গেছে শ্রীকৃষ্ণের জন্মরাতের ঘনঘটায়, এমন আশ্চর্য পরিবাহী সে।
আমাদের শৈশবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান উৎসব বিশাল এক ঘটনা। ছোটপর্দায় উত্তমসুচিত্রা! ঝড়বাদলের রাতে উন্মাদ-আশ্রম থেকে পালিয়ে গিয়ে সুচিত্রা সেনের ঘরে আশ্রয় নিলেন যুবক উত্তমকুমার, অন্তরঙ্গ জীবনে এমন সুর ভাঁজলেন যে পাগলামি সেরে উঠবার পরেও বুঝি সে সুরের রেশ রয়ে গেল (হারানো সুর)। কে ভুলতে পারে 'পথের পাঁচালী'র সেই বৃষ্টি আসবার মুহূর্ত? 'আতঙ্ক'তে খুন চাক্ষুষ করে হতভম্ব শিক্ষক সৌমিত্রকে মনে পড়ে, ঝড়ঝঞ্ঝার সে'রাতে ছাত্ররা তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলছে, আর বলছে- "আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি মাস্টারমশাই!" তখন পাড়ায় পাড়ায় হিন্দি সিনেমার জয়জয়কার, একটি বাড়িতে ভিসিআর এলেই প্রতিবেশীরা সমবেত হয়। সেটা বৃষ্টির রমরমা যুগ। সদ্যবিধবা নারীর সন্তান জন্ম নিচ্ছে- যে কলির কংসাবতারকে মেরে ফেলবে, বৃষ্টিতে সয়লাব চারদিক। নায়কের যুবতী বোন বাড়ি ফিরছে, ভরপুর মাংস আর আজানুলম্বিত কেশ তার, প্রবল বৃষ্টির ভেতর সে চোখে পড়ে যাবে দুর্ধর্ষ মাস্তানের। অমিতাভ বচ্চন আর স্মিতা পাতিল ভিজে একসা- নাচছেন, আজ রপট যায়ে তো হামে না উঠাইয়ো! জিনাত আমান বিরক্তমুখে জানাচ্ছেন- তোর দুকড়ির চাকরি জোটানোর আশায় আমার লাখ টাকার শ্রাবণমাস চলে যায়! মুভি অভ দ্য উইকে ডরোথিকে ঝড় উড়িয়ে নিল অজের দেশে (দ্য উইজার্ড অভ অজ)। জীন কেলি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কেমন আনন্দগান গাইলেন (সিংগিং ইন দ্য রেইন)। 'ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানীজ'-এর শেষ দৃশ্যে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে একসা বেড়ালটাকে কি ভোলা যায়? নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো নামপরিচয়হীনা নারী তার নিজের মতোই উঞ্ছ বেড়ালটাকে ট্যাক্সি থেকে বের করে দেয়- বলে- "যা খুঁটে খা!" ভালোবাসা থেকে পালিয়ে বেড়ানো কোনো মুক্তি নয়, ভালোবাসা নিজেই অপরিণাম সাহস আর মুক্তি...জানবার পর নারী আবার খুঁজে বের করে পথের বেড়ালটিকে (যাকে সে ভালোবেসে নামটা পর্যন্ত দেয়নি, ডেকেছে শুধু 'ক্যাট' বলে), অবিরাম বৃষ্টির ভিতর আদর করে বুকে তুলে নেয়। ঝড়বৃষ্টিতে উত্তাল সমুদ্রে জুলিয়া রবার্টসও পালিয়ে গেছিলেন অত্যাচারী স্বামীর হাত থেকে (স্লিপিং উইথ দ্য এনিমি)। 'দ্য শওশাংক রিডেম্পশন' কিংবা 'ফোর ওয়েডিংস অ্যান্ড আ ফিউনারেল'-এও ক্লাইমেক্সে ঝুমবৃষ্টির মুহূর্ত, একটি কারামুক্তির, আরেকটি ভালোবাসায় মুক্তি খুঁজে পাবার। আরও অনেক পরে ঋতুপর্ণর 'রেইনকোট'-এ বৃষ্টিভেজা গুমোট ঘরের ভিতর গোটা মুভির উত্থানপতন, ভারী ভালো লেগেছিল সেই আবহ।
কখনো সিনেমা থামিয়ে বিটিভি সংবাদে সম্প্রচার করত আরেক সিনেমা, টানা-বর্ষণে তলিয়ে যাওয়া জনপদে ঘুরছেন একনায়ক আর তাঁর সহগামী মোসাহেবের দল, গায়ে নিখুঁত সাফারি স্যুট, পায়ে বুট। পেছনে বাজছে একনায়কের লেখা গান- "তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হতে আজকের চেষ্টা অপার, তোমাদের সাথে মিশে সব ব্যথা বুকে নিয়ে আমিও যে হবো একাকার।" তিন চার মাসের জন্য বাড়িতে আসত বন্যা-উপদ্রুত এলাকার আত্মীয়স্বজন, মেঝেয় টানা বিছানা পাতা হতো। পড়ালেখা ডকে উঠত, আমাদের আর পায় কে! বাড়ি নুহের নৌকার মতন জমজমাট। স্নেহব্যগ্র আত্মীয়স্বজনের সামনে তো আর বাপমা শাসন করতে পারতো না অত। বন্যার কথা উঠল যখন, বলি। বন্যার কারণ, বিবরণ, ফলাফল ফলাও করে লিখতে হতো পরীক্ষায়। আমাদের বাংলাদেশে প্রকৃতিমাতার দুই লালকমল নীলকমল, অফুরন্ত সূর্য আর অঢেল বৃষ্টি। দুইয়ের একটিকেও আমরা আপন কল্যাণে যথার্থ ব্যবহার করতে পারছি না। নদীর স্বাস্থ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস- বন্যার অন্যতম কারণ, সেদিকে আমরা চেয়ে দেখি কি? জলবায়ু পরিবর্তন নামক যে সর্ববিধ্বংসী বিপদ আমাদের দুয়ারে উপস্থিত- নদীর সুস্বাস্থ্য সেই বিপদে আমাদের বিরাট সহায় হতে পারত। ঈশ্বরের দান বলি, আল্লাহর নিয়ামত বলি, প্রকৃতিতে যা অঢেল- তার দিকে আমরা মনোযোগী কবে হব, জানি না।
ঝড়বাদলের সঙ্গে কেন আমাদের আখ্যানে-গানে-কবিতায় প্রেমের- বিরহের- চরম মুহূর্তের অত যোগাযোগ? কতবার ভেবেছি। হয়তো ঝড়বাদল নিজেই প্রকৃতির তুমুল নাটকীয়তা বলে। আকণ্ঠ কাঁথা টেনে নিতে নিতে আশরীর ঘুমের আমেজ মেখে অমন দিনেই তো বলেছি- আজ আমি কোত্থাও যাব না। আজ খিচুড়ি-দিবস। সে কথা শুনিবে না কেহ আর। ভেজা বিকেলে ঘরে ঢুকে সক্কলকে বাড়িতে জড়ো দেখবার একান্ত নিরাপত্তা। আকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব। পুনর্নবায়ন। বিষাদ। বাদলশেষের রাতে সহজিয়া অনুরাগ।
