বায়ান্নর কার্টুন: কাজী আবুল কাসেম যখন ‘দোপেয়াজা’ হয়ে উঠলেন
কড়া ভাজা বা ডাবল ভাজা অর্থে কাজী আবুল কাসেম 'দোপেয়াজা' ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এটি ছিল প্রচলিত রেওয়াজ। যারা কার্টুন আঁকতেন, তাদের প্রায় সবারই অন্তত একটি করে ছদ্মনাম থাকত। যেমন শিল্পী কামরুল হাসান আঁকতেন 'ভিমরুল' নামে। চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত নিয়েছিলেন 'মিতাজি' নাম। শিল্পী কালাম মাহমুদ ব্যবহার করতেন একাধিক নাম—কালাম, মাহমুদ, তিতু বা বীরবল। কাইয়ুম চৌধুরীর ছিল দুটি নাম—চৌকা ও কাচৌ।
রফিকুন্নবী 'রনবী' নামে পূর্বদেশ ও সচিত্র সন্ধানীর জন্য আঁকতেন। আজিজুর রহমান 'অরূপ' নামে হলিডে পত্রিকায় সরাসরি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতেন। হাশেম খান 'ছবি খান' ছদ্মনামে দৈনিক ইত্তেফাকে কার্টুন প্রকাশ করতেন। ষাটের দশকের আরেকজন নামী কার্টুনিস্ট সিরাজুল হক আঁকতেন 'সারদা' নামে। তোফা, শাহতাব, জমির ও মিজানও ছিলেন ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কার্টুনিস্ট। আওয়াজ ও পয়গাম পত্রিকাতেও তখন রাজনৈতিক কার্টুন প্রকাশিত হতো।
ফোরামের প্রচ্ছদ হতো কার্টুন দিয়ে
ষাটের দশকের শেষ দিকে গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের আন্দোলনে গতি বৃদ্ধি পায়। এর প্রকাশ দেখা যায় শিল্প-সাহিত্যের সব মাধ্যমে।
মানবাধিকার কর্মী হামিদা হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখের উদ্যোগে তখন প্রকাশিত হয় ইংরেজি সাময়িকী 'ফোরাম', যার প্রচ্ছদ তৈরি হতো কার্টুন দিয়ে। বাঙালির স্বাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান আর্মি ফোরাম বন্ধ করে দেয়।
কাছাকাছি সময়ে সন্ধানী প্রকাশনী 'এক্সপ্রেস' নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করত, যাতে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক মন্তব্যসমেত কার্টুন প্রকাশিত হতো।
দেশের পথিকৃৎ রম্য ও ব্যঙ্গ কার্টুন-সাময়িকী উন্মাদের নির্বাহী সম্পাদক এবং নিউ এজ পত্রিকার সিনিয়র কার্টুনিস্ট মেহেদী হক বলেন, "ছদ্মনাম নেওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল নিরাপত্তা। শাসকগোষ্ঠী কার্টুনকে তাদের জন্য হুমকি হিসেবে নিত, তাই কার্টুনিস্টদের বিপদগ্রস্ত করত।"
একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ঢাকার রাজপথে যেসব ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা গেছে, সেগুলোতে সামরিক শাসন ও কুচক্রী ভুট্টোর চরিত্র প্রকাশে কার্টুন ব্যবহার করা হয়েছে। সেসব ব্যঙ্গাত্মক ও তিরস্কারমূলক কার্টুন নিয়ে একাত্তরের ৩ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়াম ঘিরে একটি কার্টুন প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল—যা ঢাকায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পোস্টার আকারে প্রকাশিত কামরুল হাসানের বিখ্যাত কার্টুন 'এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে' মুক্তিযোদ্ধা ও সমগ্র জাতিকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।
দোপেয়াজার হরফ খেদাও
ঢাকায় প্রথম ক্ষুরধার রাজনৈতিক কার্টুনের প্রকাশ দেখা যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়। দোপেয়াজা কাজী আবুল কাসেমের 'হরফ খেদাও' শীর্ষক কার্টুনটি এর একটি অসাধারণ নমুনা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল দেশভাগের পরপরই। কারণ সাতচল্লিশের দেশভাগ একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সূচনা করে।
ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট নতুন এই রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রে অদ্ভুত এক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রসায়ন লক্ষ্য করা যায়। প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে তাই রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।
দেশভাগের পর প্রথম প্রবল রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত হয় বায়ান্নয় ভাষার দাবিতে। শিল্পীদের মধ্যে মুর্তজা বশীর, বিজন চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী এবং ইমদাদ হোসেন ব্যানার ও ফেস্টুনে ভাষার দাবিতে সক্রিয় অংশ নেন। তবে সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুনের মধ্যে দোপেয়াজার কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা শাসকগোষ্ঠীর জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।
এ প্রসঙ্গে মেহেদী হককে দোপেয়াজা বলেছিলেন, "আমি টের পেতাম আমার পেছনে ফেউ (গুপ্তচর) লেগেছে। কয়েকবার বাসাও বদল করেছি।"
দোপেয়াজা নিয়মিত আঁকতেন সৈনিকে
নব্বইয়ের দশকের পরিচিত কার্টুনিস্ট ইব্রাহীম মণ্ডল, যিনি 'কার্টুনের কথা' নামের বই লিখেছেন, তিনি বলেন, "দোপেয়াজা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে অন্তত দুই ডজন কার্টুন এঁকেছিলেন। তবে সবগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যে চারটি কার্টুন আমরা দেখতে পাই, তার মধ্যে 'হরফ খেদাও' সত্যিই অসাধারণ। এটি যে কাউকেই চমৎকৃত করবে।"
'হরফ খেদাও' কার্টুনে দেখা যায়, ক্ষমতাবান উর্দুভাষীরা তলোয়ার হাতে বাংলা অক্ষরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে বাঙালিরাও। কার্টুনটি প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সৈনিকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারার আবুল কাশেম (পরে প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম নামে পরিচিত) ছিলেন সৈনিকের প্রতিষ্ঠাতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। এই দাবি থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি এবং এর বাস্তবায়নে সর্বশক্তি ব্যয় করেছেন।
সৈনিক ছিল সমকালীন শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব কাগজ। এর মাস্টহেড এঁকেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। দোপেয়াজা এতে সমসাময়িক নানা বিষয়ে নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন।
দোপেয়াজা ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী। তার জন্ম ১৯১৩ সালে, ঝিনাইদহে। ছোটবেলা থেকেই শিল্পচর্চার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৯৮ সালে তার কলাবাগানের বাসায় একটি সাক্ষাৎকার নেন ইব্রাহীম মণ্ডল। সেখানে দোপেয়াজা বলেন, "আমার স্কুলের শিক্ষক চক দিয়ে বোর্ডে সুন্দর নৌকার ছবি আঁকতেন, তা দেখেই ছবির প্রতি আকৃষ্ট হই।"
তিনি আরও বলেন, "১৯২৮ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য যাই, কিন্তু সুযোগ পেয়েও অর্থের অভাবে পড়তে পারিনি। পরে পরিচিত এক সাংবাদিক বন্ধুর মাধ্যমে একটি কমার্শিয়াল আর্ট স্টুডিওতে অল্প বেতনে চাকরি নিই। সেখানে শিল্পী নগেন্দ্র মিত্রের কাছে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।"
শিশুতোষ বইয়ের শিল্পী
শুরুর দিকে তিনি 'হাতেম তাই'-এর মতো শিশুতোষ বই অলংকরণ করেছেন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'টুনটুনির বই' তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে তিনি নিজস্ব শিল্পশৈলী গড়ে তোলেন, যার প্রকাশ 'অবাক অভিযান' ও 'বাণিজ্যেতে যাবো আমি' বইয়ে দৃশ্যমান।
বাংলায় ঠাট্টা-মশকরার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে হাসির খোরাক জোগাত এমন দলও ছিল। ব্রিটিশদের আগমনের পর উনিশ শতকের মাঝামাঝি ও শেষভাগে কালিঘাটের পট ও বটতলার ছাপচিত্রে নানা ধরনের হাস্যরসাত্মক উপাদান দেখা যায়। সামাজিক ঘটনাই ছিল এসবের মূল বিষয়।
নতুন বাবুদের মদ্যপ হয়ে পড়া ছিল একটি জনপ্রিয় বিষয়। মাতাল হয়ে স্ত্রী বা রক্ষিতার পা ধরে কান্নাকাটির দৃশ্যও তখন হাসির খোরাক জুগিয়েছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে খেতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার ঘটনাও বারবার উঠে এসেছে। তবে এগুলোকে কার্টুন না মৃতবাজারবলে কার্টুনের পূর্বসূরি বলা যেতে পারে।
অ পত্রিকায় প্রথম কার্টুন প্রকাশিত হয় ১৮৭২ সালে। ১৮৭৪ সালের বসন্তক সাময়িকীতেও বেশ কিছু ক্যারিকেচার প্রকাশিত হয়। তবে বাংলার প্রথম কার্টুনিস্ট হিসেবে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধরা হয়। গত শতকের প্রথম তিন দশকের রাজনীতি ও সমাজ তার কার্টুনে সফলভাবে উঠে এসেছে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার কার্টুন ভাইসরয়কে বিব্রত করেছিল। তিনি গান্ধীজীর কথার সঙ্গে কাজের অমিল নিয়েও কার্টুন করেছিলেন। স্নেহলতার আত্মহত্যাকে উপজীব্য করে তিনি তৎকালীন সমাজকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেন। যৌতুকের দাবির কারণে পিতার দুর্ভোগ সহ্য করতে না পেরে স্নেহলতা আত্মহত্যা করেছিলেন।
গগনেন্দ্রনাথের সমসাময়িক কার্টুনিস্টদের মধ্যে দিনেশরঞ্জন দাশ ও চারু রায় উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে বিনয় বসুকে সবচেয়ে সফল কার্টুনিস্ট হিসেবে ধরা হয়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও সুকুমার রায় শিশুসাহিত্যে কার্টুনধর্মী অলংকরণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এমন সময়ে একজন মুসলমান কার্টুনিস্ট ও শিল্পীর আবির্ভাবকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন মেহেদী হক। যখন মুখাবয়ব আঁকায় ধর্মীয় বিধিনিষেধ ছিল, তখন কোন সাহসে কাজী আবুল কাসেম শিল্পী হলেন—এই প্রশ্নের উত্তরে আবুল কাসেম বলেন, "সবারই নিজস্ব পছন্দ থাকে এবং ছোটবেলা থেকেই তার পেছনে লেগে থাকে, যেখানে সে নিজেকে খুঁজে পায়। ছোটবেলা থেকেই ড্রয়িং আমার ভালো লাগত, স্কুলের নোটবুকে আঁকাআঁকি করতাম। আমি প্রথম এঁকেছিলাম একজন রোগা মানুষের ছবি, যে আগে অনেক মোটা ছিল, কিন্তু সিগারেট খেতে খেতে তার চামড়া গায়ে লেগে যায়।"
উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম কার্টুনিস্ট
আবুল কাসেমকে উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম কার্টুনিস্ট বলা হয়। তার প্রথম কার্টুন প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে 'সওগাত' পত্রিকায়। কার্টুনটি প্রশংসিতও হয়েছিল।
মেহেদী হকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "কার্টুন এঁকে ব্রিটিশ আমলে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি, তবে পাকিস্তান আমলে খুব সমস্যায় পড়েছিলাম। একবার এক গাভীর ছবি এঁকেছিলাম, যে ঘাস খাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে, কিন্তু দুধ দিচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। এটি প্রকাশ হওয়ার পর হুমকি–ধমকি দেওয়া হয়েছিল।"
এ প্রসঙ্গে মেহেদী হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সে আমলে কার্টুন এঁকে টাকা-পয়সাও বেশি পাওয়া যেত না, ঝুঁকিও ছিল। তবু দোপেয়াজা কার্টুন আঁকা থেকে বিরত থাকেননি। এর কারণ একটাই, তিনি মনেপ্রাণে একজন শিল্পী ছিলেন। পছন্দের কাজটি না করে থাকতে পারতেন না। তার ড্রয়িং ছিল প্রাঞ্জল, এবং তার মধ্যেই প্রবল রসবোধ ফুটে উঠত।"
কার্টুনে ড্রয়িং না ডায়লগ—কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এ প্রশ্নে দোপেয়াজা মেহেদী হককে বলেন, "ড্রয়িং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ড্রয়িংয়ের উদ্দেশ্যকে সহায়তা করার জন্য কখনো কখনো ডায়লগের দরকার পড়ে।"
মেহেদী হক ২০০০ সালের দিকে তার বাসায় সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল নব্বই ছুঁইছুঁই (মৃত্যু ২০০৪ সালে)। তখনও তিনি রসবোধে ভরপুর ছিলেন। দাড়ি-গোঁফে প্রায় ঢাকা পড়া মানুষটি হেসে বলেছিলেন, "আমার কার্টুন দেখতে এসেছ? আরে, আমি নিজেই তো একটা কার্টুন।"
মেহেদী হক বলেন, "তার অনেক কাজ হারিয়ে গেছে। সময় যত যাবে, ততই তিনি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবেন। এটি দেশের জন্য বড় ক্ষতি। তাই সময় থাকতেই তার কাজগুলোর আর্কাইভিং জরুরি। তিনি সাদামাটা ও স্বল্প রেখায় অত্যন্ত এক্সপ্রেসিভ ছিলেন। তিনি যা-ই আঁকতেন, তা হয়ে উঠত স্বদেশী। এটা পারতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।"
"বাংলার প্রকৃতি-সংস্কৃতিই ছিল তার শিক্ষক, যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি পাননি। তাই তিনি এতটা স্বদেশি তথা বাঙালি। এই শিল্পীকে হারিয়ে ফেলা নিশ্চয়ই বড় ক্ষতি," যোগ করেন তিনি।
নূরুল আমীনের খাঁচা
সিএম তারেক রেজা সংকলিত 'একুশ : ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস' (১৯৪৭–১৯৫৬) গ্রন্থে ভাষা আন্দোলন নিয়ে দোপেয়াজার চারটি কার্টুন সংযুক্ত হয়েছে, যার একটি 'হরফ খেদাও'। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালের প্রথম শহীদ দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে।
দিনটি পালনের ব্যাপকতা এতই ছিল যে ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক তার 'পথ চলতে যা দেখেছি' বইতে লিখেছেন, "আমাদের জন্য সেবার বছরটা জানুয়ারিতে নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের মধ্য দিয়েই বুঝি শুরু হয়।"
প্রভাতফেরির মিছিল যেমন আয়তনে বড় ছিল, তেমনি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও ছিল অনেক। কারো হাতে কালো ফিতা বাঁধা, কারো বুকে কালো ব্যাজ আঁটা ছিল। এসব আয়োজন নিয়মিত পালনের মধ্য দিয়ে একসময় প্রথায় পরিণত হয়।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে দোপেয়াজার আরেকটি বিদ্রুপাত্মক কার্টুনে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন ও তার মুসলিম লীগের পাণ্ডারা বাংলা ভাষার প্রতীক একটি মুরগিকে খাঁচায় বন্দি করছে। কার্টুনটি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, তবে এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ইত্তেফাক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট। পত্রিকাটি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং বাঙালির অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৫২ সালের ১৪ মার্চ ইত্তেফাকে প্রকাশিত আরেকটি কার্টুনে দোপেয়াজা শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত একটি কন্ট্রোল রুম এঁকেছেন। সেখান থেকে পুরস্কারভোগী, সরকারি কন্ট্রাক্টর ও রেশন মালিকরা বেরিয়ে এসে বলছে, "ছাত্রদের বেয়াদবি সইব না।" ধর্মের মুখোশধারীরা আন্দোলনের মোড় ঘোরাতে "কাদিয়ানী খেদাও" স্লোগান তুলছে। কার্টুনটির নিচের প্যানেলে নিরন্ন ও বস্ত্রহীন বাঙালিদের দেখা যায় "অন্ন চাই, বস্ত্র চাই" দাবি তুলতে। তারা আরও বলছে, "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।"
একুশে পদক পাননি তিনি
কাজী আবুল কাসেম ছিলেন একাধারে গল্পকার, গীতিকার, অনুবাদক, ছড়াকার, কার্টুনিস্ট ও চিত্রশিল্পী। দেশভাগের আগেই তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তার একটি কার্টুনের নিচে ছড়া লিখে দিয়েছিলেন কবি নজরুল ইসলাম।
তার 'পাকাপাকি বন্দোবস্ত' নামের একটি কার্টুনে তৎকালীন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা চিত্রিত হয়। শিশুতোষ গ্রন্থ অলংকরণে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। বিজ্ঞাপনচিত্রেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। তার 'টেলিফোন' নামের একটি ছড়ার কয়েকটি লাইন অনেকেরই পরিচিত—
ক্রিং ক্রিং টেলিফোন
হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
কে তুমি, কাকে চাই?
বলো বলো বলো!
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে দোপেয়াজা ছদ্মনামে কার্টুন আঁকা শুরু করে তিনি সত্তরের দশক পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। তিনি বাংলা একাডেমি পদক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পদক, শিল্পী এসএম সুলতান পদক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু একুশে পদক পাননি।
এ প্রসঙ্গে মেহেদী হক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কি মনে করেন, তিনি উপযুক্ত সম্মান পাননি?
দোপেয়াজা বলেন, "আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তবে আমার বন্ধুরা মনে করে, আমাকে একুশে পদক দেওয়া উচিত ছিল।"
মেহেদী হকও মনে করেন, "আর দেরি না করে কাজী আবুল কাসেমকে (মরণোত্তর) একুশে পদক দেওয়া উচিত। এটি তার অবশ্য প্রাপ্য।"
ছবি: কাজী আবুল কাসেম শীর্ষক ফেসবুক পাতা থেকে
