হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, তার রাজনীতি ও সমাজতত্ত্ব
যে কোনো ঘটনা কিংবা প্রপঞ্চকে নানান দিক থেকে দেখতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত সমাজ, রাজনীতি এবং ইতিহাস যখন কোনো ঘটনায় পরস্পরকে ছেদ করে, তখন তাকে নানান দিক থেকে তলিয়ে দেখাটা অতি আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
গত কয়েক দিন ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জান, মাল, বিশ্বাসের ওপরে প্রায় লাগাতারভাবে হামলা, হত্যা আর লুটতরাজের ঘটনা ঘটে চলেছে। এই ঘটনাপ্রবাহকে বুঝতে গেলে রাষ্ট্র, শাসক, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি, এই দৃশ্যমান কাঠামোগুলোর সাথে সংঘটিত সহিংসতার সম্পর্ককে দেখতে হবে। একইসাথে, একে বুঝতে নজর দিতে হবে চট করে চোখে পড়ে না এমন পরিসর, যথা সামাজিক সম্পর্ক, সম্প্রদায়ের বোধ, 'নিজ ও অপর'-এর সীমানা ইত্যাদির দিকে। কী করে সমাজের একটা বড় অংশের মানুষের মনোভঙ্গি এবং দৃষ্টিভঙ্গি 'অপর'-এর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠল, সেই প্রশ্ন করতে পারাটা জরুরি।
যদিও পূজার বিগ্রহ এখনো ধুলায় গড়াচ্ছে, পুড়ে যাওয়া ঘর থেকে এখনো উঠছে ধোঁয়া, স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি এখনো থামেনি, ঠিক এরকম একটা মূহুর্তে বসে আমার এই আলাপ হয়তো সঙ্গত না-ও মনে হতে পারে। কিন্তু ঠিক এখনই নোকতাটা রেখে যাওয়া জরুরি বলেই আমি মনে করি।
যারা বলছেন এই হামলা নজীরবিহীন, তারা সম্ভবত আবেগের আতিশয্যে কথাটা ব্যবহার করে ফেলেছেন। বছর বছর প্রায় নিয়ম করেই দুর্গাপূজার সময় এমন ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রায় প্রত্যেক বছরই সংবেদনশীল মুসলমানেরা বলতে থাকি যে, 'আমরা লজ্জিত'। এবং আমাদের এই লজ্জা বা ব্রীড়া সংখ্যাতত্ত্বে লঘুতর হতে থাকা মানুষজনদের তেমন একটা রক্ষাটক্ষা করে বলে দেখতে পাই না। এক সময় যে ভূখণ্ডে হিন্দু জনগোষ্ঠীর শতকরা হার ছিল ২৫-৩০-এর মতো, এখন সেটা ৭-৮-এ এসে দাঁড়িয়েছে। তার পেছনে বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক রাজনীতির ভূমিকা আছে আমরা জানি।
আমাদের দেশে যখন নির্বাচন-টির্বাচন হতো, তার পরে-পরে হিন্দুঘর পোড়েনি, এমন নজিরই বরং বিরল। কিন্তু এখন এমন একটা সময় লাগাতার হামলাগুলো হলো, যখন একচ্ছত্রভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, যারা নিজেরাই ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলতেন। স্যেকুলার এবং বাম প্রগতিশীলদের একটা বিরাট অংশ এই সরকারের প্রতি প্রশ্নাতীত সমর্থন দিয়ে রেখেছে, এমনকি ব্লগার হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা না হওয়া সত্ত্বেও। উপরন্তু সরকারের বাহিনী আর এজেন্সিগুলো নজরদারির একশো এক রকম প্রযুক্তি কিনেছে, নিজেদেরকে সাজিয়েছে। যে কারো ফোনে আড়িপাতা, ফোনালাপের রেকর্ড নেট দুনিয়ায় সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার অসংখ্য অশ্রুতপূর্ব নজির আমরা ইদানিংকালে দেখছি।
কথা হলো, স্যেকুলার ও প্রগতিশীলদের ব্যাপক নৈতিক সমর্থন সমেত ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবিদার এই সরকার তার সকল গোয়েন্দা শক্তি ব্যবহার করেও কেন লাগাতার হামলাকে, ভাঙচুরকে ঠেকাতে পারল না? এটা কি নিছক ব্যর্থতা নাকি কোথাও সদিচ্ছার ঘাটতিও ছিল? রাজনীতির মাঠে এখন এমন কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নাই, যারা চাইলেই দেশজুড়ে এমন কাণ্ড বাঁধাতে সক্ষম। তাহলে একের পর এক হামলা চালাল কারা?
বছর কয়েক আগের নাসিরনগরের হামলাকারীরা যখন নির্বাচনে সরকারি দলের টিকেট পায়, তখন এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না যে, সরকার সহিংসতা সৃষ্টিকারীদেরকে পুরস্কৃত করে কী বার্তা দলকে কিংবা জনগণকে দিতে চাইছে? মোদ্দা কথা হলো, ব্যর্থতা হোক বা অন্যকিছু, সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
কিন্তু জল যতটা গড়িয়েছে তাতে এইটুকু বলে হাত ধুয়ে উঠে যাবার অবকাশ বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য খুব একটা নেই। জায়গায় জায়গায় হামলা তো চালিয়েছে দশজন-বিশজন কিংবা ধরা যাক শ'খানেক লোক। কিন্তু এই হাতে গোনা গুটিকয়েক মানুষের জন্য হামলার জমিন বিছিয়ে রেখেছি আমরা বাদবাকি মুসলমানেরা। সমাজের একটা বড় অংশের মধ্যে অমুসলিম, বিশেষত হিন্দুদের প্রতি যে বৈরীভাব, যে ঘৃণার চর্চা বিরাজমান, তাকে কি আমরা কখনো উলটে দেখেছি?
১৯৭১-এ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসবার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি, সেই দাবির অনুকূলে সমাজের সর্বস্তরের মাঝে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা, পরধর্মের প্রতি সহনশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করার কাজটা কি আদৌ স্বাধীনতার পরে-পরে এই দেশে হয়েছে? হয়নি।
আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাস করেন আপন ক্ষুদ্র বলয়ে। তারা শহরে বসে রুচিশীল গান করেন, ছবি আঁকেন, তাবৎ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে মনোযোগী হন আর স্যেকুলারিজমের চর্চা করেন যা দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবনাচরণ থেকে বিচ্ছিন্ন। দেশের বড় অংশের জনগণ, যারা আপনাদের এই সাজানো বাগানে ঢুকতে পারেন না, ভেবে দেখেছেন, তাদের ঠিক কেমন বোধ হয়? এই বিচ্ছিন্নতার দায় অগ্রসর মধ্যবিত্ত কখনোই নিজের ঘাড়ে নেননি। উলটো তারা হতদরিদ্র বিশাল অংশের মানুষকে অসচেতনতার দায়ে দায়ী করে গেছেন। কেন মানুষ মাদ্রাসায় বাচ্চাকে পাঠায় তার কারণ খোঁজেননি, অথচ নিজের বাচ্চাকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়িয়েছেন।
ইরানে, মিশরে একদা যখন স্যেকুলার সরকারের উত্থান ঘটেছিল, তারাও এমন জনবিচ্ছিন্নতায় ভুগেছিলেন। দেশের সাধারণ মানুষ শাসকদেরকে পশ্চিমের দালাল ঠাওরেছিলেন। তার ফল আমরা ঐ দেশগুলোতে দেখেছি। আজ এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষের মনে যদি জেহাদি জোশ দেখতে পান, সেখানে আপনার-আমার দায় নেই বলে মনে করেন? আপনি তাকে যত দূরে ঠেলবেন, ততই সে আঞ্চলিক, বৈশ্বিক রাজনীতির কুশীলবদের হাতে গিয়ে পড়বে। অগ্রসর, সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে শিক্ষিত মধ্যবিত্তকেই দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের বৃহত্তর 'অপর', খেটে খাওয়া মানুষের সাথে যোগাযোগক্ষম রাজনীতির ভাষা তৈরি করার, সমান মর্যাদার যোগাযোগ তৈরি করার।
একদিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আপন শ্রেণি দম্ভের বিরুদ্ধে লড়াই, সমাজের স্যেকুলার ও ইসলামপন্থীদের মাঝে বাড়তে থাকা অনতিক্রম্য বিভক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, জাতীয় রাজনীতির জটিল বিন্যাসে বদলে যাওয়া যে রাষ্ট্র ও শাসন—তাকে বুঝতে চাওয়া। কাজটা আমাদের জন্য মোটেও সহজ নয়। এই বিবিধ ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাবার জন্য আমরা কি আদৌ প্রস্তুত?
বছরের পর বছর হামলা হয় আর আমরা ন্যাকা ন্যাকা লিপ সার্ভিস দিয়ে যাই নিয়ম করে। বলি 'আমরা লজ্জিত'। বলি 'এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।' হিন্দু প্রতিবেশীকে বাঁচাতে পারি না, কিন্তু তাকে বলি 'উঠে দাঁড়ান'; বলি 'বিশ্বাস হারাবেন না।' আমাদের এই সব ঘ্যানঘ্যানানি বড় ক্লিশে, বড় অক্ষম। আমাদের শাহবাগের পুলিশঘেরা মানববন্ধন কিংবা ফেসবুকের অ্যাক্টিভিজমও আক্রান্ত মানুষকে রক্ষা করতে পারে না। রাজনীতির মাঠে যখন সংগঠিত শক্তির অনুপস্থিতি থাকে, তখন সত্যিকারের লড়াইয়ের পথ অসম্ভব হয়ে পড়ে। বানানো বিরোধীদল, কিংবা লোক দেখানো নির্বাচন কখনোই জনগণের রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না।
এই দেউলিয়া সময়ে জীর্ণ পুরাতন প্রতিবাদের ভাষা আমাদেরকে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারবে না। সমাজে সহিষ্ণুতা নিশ্চিত করতে চায়, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা স্যেকুলার, নারী, পুরুষ ও ভিন্ন লিঙ্গ, আদিবাসী, বাঙালি কিংবা বাংলাদেশি, সকল শ্রেণি ও বর্গকে ধারণ করতে চায়, এমন সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ এবং বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া এই চক্র থেকে বেরোবার পথ দেখি না।
-
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
