বিচারহীনতাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল কারণ
এই ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির বিদায়ের ভেতর থেকে অতীতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিলুপ্ত হয়েছে বলে এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করেছিল। বাংলাদেশের মানুষকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে '৭২ সালের সংবিধান রচিত হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সরকারের সেই ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় মৌলবাদীরা নানাভাবে সমালোচনার মুখোমুখি করেছিল। ফলে সেই সময়কার সরকারকে প্রমাণ করতে হচ্ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়।
'৭৫-এর পর সেই ধর্মীয় মৌলবাদীরা নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের নুতনরূপে আত্মপ্রকাশ শুরু করে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলদাররা দ্রুত উপলব্ধি করেছিল, এ দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি সাথে রাখা গেলে দখলদারিত্ব বজায় রাখা সহজ। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রহমানের রহিম' যুক্ত করার আড়ালে তারা ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশের বৈধতা দিয়েছিল।
পঞ্চম সংশোধনীর ৯ বছর পর আরেক জেনারেল ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' সংবিধানে যুক্ত করেন।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার জন্য আপস করলেন পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন। ধর্মভাবাপন্ন পঞ্চম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে সংবিধানে ধর্মীয় ভাব নিয়ে আসা হয়। আর 'কপট' ধার্মিক এরশাদ তো সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম সংযোজন করেন।
আগের সংশোধনী বাতিল ও নতুন সংশোধনীতে 'ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম' পরস্পরবিরোধী ধারণা পাশাপাশি রাখা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কেতাবি বিষয় হয়েই আছে বাংলাদেশে।
আগামীকাল (বুধবার) পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী। দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি যথাযথভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে যে সার্কুলার জারি করা হয়েছে, সেখানে প্রতি বছর যে সকল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা থাকে, তার সাথে এবার যুক্ত হয়েছে ওয়াজ মহফিল। ওয়াজ মহফিল এর আগে ছিল না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য ওয়াজ মহফিল সমাজের জন্য প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ওয়াজ মহফিলের নামে অনেক সময় অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা এবং নারীর প্রতি অবদমনটাকেই বেশি করে সামনে নিয়ে আসা হয়।
ওয়াজ মহফিলের উষ্কানি আমরা প্রতিনিয়ত দেখি ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে। অন্যদিকে, ভারতীয় শাসক পার্টির স্লোগান দিয়ে মিছিল বা হিন্দুধর্মীয় সংগঠন ইসকনের বিবৃতি- এর কোনটাই কাম্য হতে পারে না। এই অসহিঞ্চুতার সুযোগে দেশে ক্রমান্বয়ে ধর্মীয় মৌলবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে কোনো অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে থাকে।
ড. আবুল বারাকাত তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, শত্রু সম্পত্তি আইনসহ নানাবিধ কারণে কীভাবে সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ করছেন। দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। এখন জনসংখ্যা ১৮ কোটি হলে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির ওপর হওয়ার কথা। হালের পরিসংখ্যার কী বলে? এই লোকগুলো কোথায় গেল এবং কেন?
রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় প্রথম ও প্রধান শিকার হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। রাজনীতির হিসাব-নিকাশে বড় হয়ে ওঠে কারা তাদের ভোট পাবে, কারা পাবে না। নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে। নব্বই ও বিরানব্বইয়ের পর ২০০১ সালে এবং রামু, সাথিয়া, নাসিরনগরের ঘটনায় এর প্রমাণ মিলেছে। নির্বাচিত দল বা সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ঐ সময়ের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিশ্বসম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হয়েছে।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর সহিংসতার ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই বছরের মে মাসে রুল জারি করেন আদালত। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ওই বছরের ৬ মে হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে দুই মাসের মধ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর অবসরপ্রাপ্ত বিচারক শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়। ২০১১ সালে কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু ওই প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য আবার আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
২০১৩ সালের পর আবারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নুতন করে নির্যাতনের শিকার হতে থাকে, যখন যুদ্ধাপরাধী বিচারের রায় হতে থাকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় প্রকাশ হয়। তখন অকারণে গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে হিন্দুদের ওপর, তাদের ধর্মস্থানের ওপর, ব্যবসা ও বাসস্থানে আক্রমণ চালানো হয়েছে। তাদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে। গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে হিন্দুদের আতংকিত করা হয়েছে। দেশের অনেক স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দাবি করে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। কথাটা এক সময়ের জন্য সত্য। এই দেশ মুসলিম- হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর যৌথ সমাজ ছিল। এখন যখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের দাবি করেন, তখন অবাক লাগে; কেননা, এই দলগুলোই সম্প্রীতি বিনষ্ট করবার জন্য দায়ী। তবে এটা সত্য, এখানে 'দাঙ্গা' হয় না। দাঙ্গা-যুদ্ধ হয়, সমানে সমানে।
বাংলাদেশের প্রথম সারির নয়টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে ২০১৩ সাল হতে গত ৯ বছরে সারা দেশে পৌনে ৪ হাজারের অধিক সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা যায়, সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি- এমন ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। নানাবিধ অভিযোগের মধ্যে বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, উপসনালয় ভাঙচুর, প্রতিমা ও মন্দির ভাঙচুর। এইসব হামলায় ৮৬২ জন আহত এবং নিহত ১১ জন। ২০১৪ সালে দুই নারী ধর্ষণের শিকার হন। জমি থেকে উচ্ছেদ ও দখলের ঘটনাও রয়েছে এর মধ্যে।
আমাদের দেশে যে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় রাজনৈতিক মাঠ গরম থাকে বেশ কিছু দিন। পক্ষে-বিপক্ষে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলতেই থাকে। সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ রাস্তায় নামে এবং প্রতিকার খোঁজার চেষ্টা করে। তেমন সমাধান পাওয়া যায় না। মামলা হয়; কিন্তু বিচার হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনাও। অভিযোগ, নেপথ্যে ক্ষমতাসীনরা জড়িত থাকায় তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যায় না। এবারের ঘটনাতেও ক্ষমতাসীনদের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে।
'অপরাধী যেই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনা হবে'- এরকম আপ্তবাক্য মানুষ আর শুনতে চায় না। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত কোনো সংখ্যালঘু হামলা মামলার বিচার হয়নি, এটাই সত্য। ফলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর জান-মালের নিরাপত্তার কোনো সুরাহা হয় না। নিরাপত্তাহীনতা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
একটা দেশ কতটা সভ্য, কতটা গণতান্ত্রিক- তা দেখার অন্যতম লেন্স হলো, সংখ্যালঘুরা কতট নিরাপদ, তার ওপর। কিন্তু এই নিরাপত্তা কে দেবে? এর প্রথম উত্তর, নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সর্বাগ্রে রাষ্ট্রের। সকল মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিবে রাষ্ট্র। ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে কাউকে বিভাজন করা যাবে না। আক্রান্ত মানুষ এই সংবিধানের ছায়াতলে আশ্রয় খুঁজতে থাকে। যারা এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নেন, দায়িত্ব তাদের বেশি। আমরা সেই দায়িত্বপালন দেখতে চাই।
এই নিরাপত্তাহীন মানুষকে সাহস দিতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে, মানসিক নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সকল পথ অনুসরণ করতে হবে। এটা তখনই সম্ভব, যখন প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা যাবে।
পাঁচ বছর আগের মামলা এখনো তদন্ত শেষ হয়নি এমন হতাশাজনক কথা যেন কাউকে শুনতে না হয়। একটি দেশ কতটা গণতান্ত্রিক, তা নিরূপিত হয় সেই দেশে ভিন্নমত গ্রাহ্য করা হয় কি না, তার ওপর। ভিন্নমত নির্মূল কোনো সভ্যতা হতে পারে না।
এ দেশের সকল ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য। এ দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি যুদ্ধ করে অর্জন করা। সেই মাটির অধিকার আমাদের সকলের। কেবল ধর্মের কারণে সেই অধিকারবোধ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে এই ঐক্যের বোধ জাগ্রত রাখতে হবে। উন্নয়নের প্রকৃত সোপান সেখানেই।
-
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
