খায়রুজ্জামানকে প্রত্যর্পণ হবে আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী: জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ খায়রুজ্জামানকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা যাবে না- একথা জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর।
মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমকে পাঠানো ই-মেইলে সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক 'নন-রিফাউলমেন্ট' নীতির কারণে শরণার্থীদের তাদের উৎস দেশ (জন্মভূমিতে) ফেরত পাঠানো যায় না। ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একথা উল্লেখ করা হয়।
এই নীতির কারণে কোনো শরণার্থীর জীবন বা স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলে আইনত তাকে প্রত্যর্পণ করতে পারে না ওই ব্যক্তি যে দেশে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানকার সরকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তার জবাবে সংস্থাটি বলেছে, শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক ১৯৫১ সালের কনভেশনে স্বাক্ষরকারী হোক বা না হোক; এই নীতি একটি সার্বজনীন আন্তর্জাতিক আইন, যা সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ইউএনএইচসিআর-এর রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর কার্ডধারী ৬৫ বছরের খায়রুজ্জামান ২০০৯ সাল থেকে মালয়েশিয়া রয়েছেন। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে তার আম্পাং এলাকার বাড়ি থেকে আটক করে দেশটির একটি নিরাপত্তা বাহিনী।
২০০৭ সালে খায়রুজ্জামানকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়। দুই বছর পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে বাংলাদেশে ফেরত আসার নির্দেশ দেয়। তিনি ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানান এবং তারপর থেকেই মালয়েশিয়ায় স্বেচ্ছা-নির্বাসনে রয়েছেন।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের হাতে সাবেক এ হাইকমিশনার গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে এনে ১৯৭৫ সালের জেলহত্যা মামলায় বিচারের উপায় খুঁজছে ঢাকা। অবসরপ্রাপ্ত মেজর খায়রুজ্জামান এ ঐতিহাসিক মামলার অন্যতম অভিযুক্ত।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, "আমরা খুব শিগগির তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আশা করছি। মামলাটি কীভাবে পুনর্জীবিত করা যায় বা পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত- সে বিষয়ে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়।"
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানান, 'অভিবাসন আইন ভঙ্গ করায়' খায়রুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করার কথা উল্লেখ করে গত বুধবার মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে।
"মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইনভঙ্গকারীদের গ্রেপ্তারের পর নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ডিপোর্টেশন সেন্টারে রাখা হয়। খায়রুজ্জামানকেও এমন একটি সেন্টারে রাখা হয়েছে"- উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে জেল হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশে ১৯৯৬ সাল থেকে চার বছর বিচার ছাড়াই কারাগারে ছিলেন খায়রুজ্জামান। মানবাধিকার গোষ্ঠী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাকে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম রামাচেভালভাম মালয়েশিয় গণমাধ্যমটিকে বলেছেন, বিশেষত রাজনৈতিক কারণ আছে এমন কারো ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসন আইন তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া/ ফেরত পাঠানোর ছাড়পত্র নয়।
তার মতে, ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন আইনের অধীনে বেশকিছু কঠোর বিধি প্রতিপালন আবশ্যক। শরণার্থী হওয়ায় সাবেক এ রাষ্ট্রদূতকেও তার দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না।
মালয়েশিয়ার বার কাউন্সিল মাইগ্রেন্টস, রিফিউজি অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাফেয়ার্স কমিটির কো-চেয়ার রামাচেভালভাম আরও বলেন, "কারো যদি নিজ ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে জীবন বিপন্ন হওয়া বা স্বাধীনতা হরণের হুমকি থাকে- তবে তাকে ফেরত পাঠানো সরকারের উচিত হবে না।"
খায়রুজ্জামানের স্ত্রী-পুত্র যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করেছেন তিনি। এব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মালয়েশিয়াকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে অধিকার গোষ্ঠী- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এর আগে খায়রুজ্জামানের স্ত্রী রিটা রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র খায়রুজ্জামানের গ্রিন কার্ড আবেদন মঞ্জুর করেছে, তবে মালয়েশিয়ার পুলিশ ভেরিফিকেশন না পাওয়ায় তা স্থগিত রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরও তাকে পুলিশ ভেরিফিকেশন দিতে রাজী হয়নি দেশটির প্রশাসন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া শাখার ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন বলেন, খায়রুজ্জামান বাংলাদেশে ফিরে গেলে গ্রেপ্তার হতে পারেন, নিরাপত্তা হেফাজতে তার নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
"এ অবস্থায় তাকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নিজ পরিবারের সাথে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত"- বলেই মন্তব্য করেন তিনি।