শিমু হত্যা: গুম করতে সারাদিন গাড়িতেই লাশ নিয়ে ঘোরেন দুই অভিযুক্ত
অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুকে হত্যার পর সন্দেহ ও গ্রেপ্তার এড়াতে অভিনেত্রীর মুঠোফোনটি গ্রীন রোড এলাকার বাইরের নিয়ে বন্ধ করে দেন। পরে মোহাম্মদপুর বসিলা ব্রিজ পার হয়ে হযরতপুর, আলিপুর ব্রিজের পরে বামপাশে ঝোপের ভিতর লাশ ফেলে দেয় স্বামী শাখাওয়াত আলীম ও তার বন্ধু ফরহাদ। লাশ ফেলে দেয়ার পর হযরতপুর-আলিপুর ব্রিজের নিচে অভিনেত্রীর ব্যবহৃত মুঠোফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ফেলে দেন ফরহাদ।
ভালবেসেই বিয়ে করেছিলেন এই দম্পতি, বিয়ের পরই অভিনয়ে আসেন রাইমা ইসলাম শিমু। তবে প্রথম সন্তান হবার পর থেকে স্ত্রীর শোবিজ অঙ্গনে কাজ করাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারেননি শাখাওয়াত। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকেই অভিনয় ছেড়ে দিতে চাপ দেন শাখাওয়াত, এ নিয়ে মনোমালিন্যও ছিল দুজনের। প্রায়ই ঝগড়া হতো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। সবশেষ একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আইটি বিভাগের এক কর্মীর সাথে অভিনেত্রী রাইমার 'সর্ম্পক' নিয়ে সন্দেহ করছিলেন শাখাওয়াত।
ঘটনার দিন ১৬ জানুয়ারি স্ত্রীর মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো নিয়ে ওইদিন হাতাহাতি থেকে যখন ঝগড়া করছিলেন, তখন ওই বাসায় উপস্থিত ছিলেন বন্ধু এস এম ওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদ। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে টাকা চাইতে বন্ধু শাখাওয়াতের বাসায় যান ফরহাদ। তার উপস্থিতিতেই ওই দম্পতির ঝগড়া শুরু হয়। বন্ধুর ডাকে একপর্যায়ে শিমুর গলা টিপে ধরেন ফরহাদ। এরপর শিমু মাটিতে পড়ে গেলে গলায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শাখাওয়াত। একপর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন, শিমু মারা গেছেন।
গত ২০ জানুয়ারি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এম সাইফুল ইসলামের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন শিমুর স্বামী শাখাওয়াত। অপর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মিশকাত শুকরানার কাছে জবানবন্দি দেন ফরহাদ। এই হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন দুজনই।
কি ঘটেছিল সেদিন
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শাখাওয়াত বলেন, ১৬ জানুয়ারি সকালে ফরহাদ তার গ্রিন রোডের বাসায় আসেন। শিমু দরজা খুলে দেন। ড্রয়িংরুমে ফরহাদকে বসতে বলে তাকে (শাখাওয়াত) ডেকে দেন শিমু।
শিমু এ সময় মুঠোফোনে কিছু একটা করছিলেন। শাখাওয়াত হঠাৎ বলেন, 'তুমি (শিমু) আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারতে, আমরা চা খাব কি না। জিজ্ঞেস না করে তুমি মোবাইলে কী করছ?'একপর্যায়ে শিমুর হাত থেকে মুঠোফোন কেড়ে নেন শাখাওয়াত। এ থেকেই ঝগড়ার শুরু। কথা-কাটাকাটি থেকে একপর্যায়ে দুজনে ধস্তাধস্তি হয়। চিৎকার শুনে ফরহাদ তাদের শোবার ঘরে ঢোকেন। এ সময় শিমুর গলা চেপে ধরেন শাখাওয়াত। ফলে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন শিমু। অকথ্য ভাষায় একে অন্যকে গালাগালি করতে থাকেন তারা। এরপর শিমুর গলা টিপে ধরতে ফরহাদকে ডাকেন শাখাওয়াত। ফরহাদ শিমুর গলা টিপে ধরেন। ধস্তাধস্তিতে শিমু মাটিতে পড়ে যান। ফরহাদ আদালতের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, শিমু মাটিতে পড়ে গেলে শাখাওয়াত তার গলার ওপর পা দিয়ে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ পর তারা আঁচ করেন, শিমু মারা গেছেন।
এরপর শিমুর হাত ধরেন শাখাওয়াত। ফরহাদকেও হাতের নাড়ি ধরতে বলেন তিনি। নাকের নিচে হাত দিয়ে বুঝতে পারেন, শিমুর শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ। এরপর থেকেই শুরু হয় লাশ লুকানোর চেষ্টা।
লাশ নিয়ে গাড়িতে সারাদিন
স্বীকারোক্তিতে শাখাওয়াত বলেছেন, মারা গেছেন নিশ্চিত হওয়ার পর শিমুর লাশ চটের বস্তায় ভরেন তিনি ও ফরহাদ। শাখাওয়াত নিজেই একটি প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে বস্তা সেলাই করেন। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরই বাসায় গৃহকর্মী আসেন। তাকে শাখাওয়াত বলেন, 'আপনি চলে যান। শিমু বাজারে গেছে। আধাঘণ্টা পর আসেন।'
সিঁড়ি দিয়ে শিমুর লাশভর্তি বস্তা নামানোর সময় হঠাৎ এই দুই বন্ধু মনে হয়, সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। সেটি বিচ্ছিন্ন করে আবার তারা নামতে শুরু করেন। এ সময় ভবনের নিচে দায়িত্বপালন করছিলেন দু'জন নিরাপত্তারক্ষী। তাদের একজন জামাল। শাখাওয়াত তাকে ডেকে ইলেকট্রিশিয়ান খুঁজতে বলেন। আর অপর নিরাপত্তারক্ষী আরিফকে সিগারেট কিনতে পাঠান তিনি। কিছুক্ষণ পর জামাল ওপরে উঠে এলে আরেক রক্ষী আরিফকে খুঁজে আনতে বলেন শাখাওয়াত।
কৌশলে দুজনকে সরিয়ে দিয়ে শিমুর মরদেহ গাড়িতে তোলেন দুই বন্ধু। ফরহাদ বলেন, এরপর শাখাওয়াত তাকে শিমুর মুঠোফোন নিয়ে গ্রিন রোডে মুঠোফোনের যে টাওয়ার, তার সীমার বাইরে গিয়ে বন্ধ করে আসতে বলেন। যেন মনে হয়, শিমু বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। সেই কথামতো ফরহাদ আজিমপুর গিয়ে মুঠোফোন বন্ধ করে আবারও গ্রিন রোডে আসেন।
লাশ গুম করতে প্রথমে দুই বন্ধু মিরপুরের দিকে যান। কিন্তু মিরপুরের নানা জায়গা ঘুরে কোথাও তারা লাশটি ফেলতে পারেননি। দুপুরের পর বাসায় ফিরে আসেন, ঘরে না ঢুকে অপেক্ষা করতে থাকেন নিচেই। তখনো শিমুর মরদেহ গাড়িতে। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শাখাওয়াতকে তার মেয়ে ফোন করে। সে জানায়, মায়ের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে শিমুর বোনও ফোন করেন। তিনিও জানান, শিমুর ফোন বন্ধ।
পরে ধানমন্ডির ভেতর দিয়ে মোহাম্মদপুরের বছিলা হয়ে নির্জন জায়গা দেখে দুই বন্ধু শিমুর মরদেহ ফেলে দেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফরহাদ বলেন, লাশ ফেলে ঢাকায় ফেরার পথে প্রথমে শিমুর ভ্যানিটি ব্যাগ ছুড়ে ফেলেন তারা। আরও পরে মুঠোফোন পানিতে ফেলেন।
প্লাস্টিকের সুতা থেকে রহস্যের উদঘাটন
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরাণীগঞ্জ সার্কেল) শাহাব উদ্দীন কবির টিবিএসকে বলেন, অপরাধী যতই আলামত-তথ্য গোপনের চেষ্টা করুক কোন না কোন ক্লু সে রেখে যাবেই। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ হত্যা-রহস্য উদঘাটন করেছে প্লাস্টিকের একটি সুতার সূত্র ধরে।
তিনি বলেছেন, মৃতদেহ শনাক্তের পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করার পাশাপাশি অভিনেত্রী শিমুর বাসায় গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে।
মৃতদেহ গুম করতে দুটো বস্তা যে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল, সেই সুতারই একটি বান্ডিল শিমুর স্বামীর গাড়িতে পাওয়া যায়। গাড়িটি ধোয়া ছিল এবং দুর্গন্ধ দূর করতে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়েছিল বলেও তারা দেখতে পান।
