ভয়ঙ্কর করোনাই মিশরীকে চিকিৎসক হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে
করোনার কঠিন পরিস্থিতিতে সংকল্প করেছিলেন মানুষের সেবা করতে চিকিৎসক হবেন। করোনায় চারপাশে যেভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এই কঠিন পরিস্থিতিই তাকে আলোড়িত করে প্রবলভাবে। স্বপ্নময়ী এই শিক্ষার্থীর পুরো নাম মিশরী মুনুমন। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থী তিনি।
কারো স্বপ্ন ও সঙ্কল্প যদি দৃঢ় হয় তাহলে স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত আসবেই। মিশরীর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। তার পরিশ্রমও তাই বৃথা যায়নি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ৪ হাজার ৩৫০ জন ভর্তিচ্ছুক নির্বাচিতের মধ্যে সবাইকে টপকে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন মিশরী মুনুমন। ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় পেয়েছেন ৮৭ দশমিক ২৫।
মিশরীর প্রস্তুতির জন্য শুধু বই মুখস্ত করে গেছে এরকম নয়। বই পড়া তার অভ্যাস, 'ভালো বই পেলেই পড়ি। তবে ভর্তি পরীক্ষার আগে সাধারণ জ্ঞান ও চলতি ঘটনার বইগুলো পড়েছি,' উচ্ছ্বসিত মিশরীর কথা।
অধ্যাবসায় আর সংকল্পই মুনমুনের সাফল্যের চাবি-কাঠি, অর্থ বিত্ত নয়। মেধাবী মনুমুনের বাবা মো. আবদুল কাইয়ুম স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডে চাকরি করেন। মা মুসলিমা খাতুন গৃহিণী। তিন বোনের মধ্যে মিশরী মুনমুন সবার ছোট। বড় বোন পেশায় চিকিৎসক, মেজ বোন স্নাতকে পড়েন। মুনমুন পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি ও সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। বাসস্থান পাবনা জেলা শহরের রাধানগর নারায়ণপুর মহল্লায়।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল বাবার স্বল্প আয়ে আর্থিক দৈন্য থাকলেও লেখাপড়ায় কখনও অমনোযোগী ছিলেন না মুনমুন।
পড়াশোনার কথা বলতে গিয়ে মিশরী জানায়, "ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে অসহায় চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করব। আজ সেই স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা আমাকে সাফল্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের স্নেহ ও সঠিক দিকনির্দেশনা আমাকে প্রতিনিয়ত সাহস যুগিয়েছে।"
মফস্বল শহরে থেকেও এত ভালো ফলাফল করা কিভাবে সম্ভব হল? এমন প্রশ্নের উত্তরে মিশরীর চটপট উত্তর, "মফস্বল হোক আর শহর, লক্ষ্যস্থির করে সঠিক পরিকল্পনায় পড়াশোনা করলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব।"
মিশরীর মা মুসলিমা বেগম মেয়ের সাফল্যে উদ্বেল, তিনি বলেন, 'এরকম আনন্দ আমার জীবনে কোনদিন আসেনি। এতো খুশি লাগছে যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।'
মা মুসলিমা বেগম আরও জানান, মিশরী ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। খুব বেশি সময় না পড়লেও যতোটুকু পড়তো ততোটুকু মনোযোগ দিয়েই পড়তো। যার ফলে ক্লাসে বরাবরই ভালো ফলাফল ছিল তার। অষ্টম শ্রেণি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছে।
মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমার সন্তান ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় নিবেদিত প্রাণ হবে, চিকিৎসা সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করবে।
মুনমুনের সাফল্যে গর্বিত বাবা মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, "হাজারো কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছি। মুনমুন সারাদেশে প্রথম হবে স্বপ্নেও ভাবি নাই। এক সময় আশেপাশের মানুষের কথায় মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে হতাশায়, চিন্তায় দিন কাটত। আজ আমার মেয়ে মেডিকেলে দেশসেরা হয়েছে এটা যে কি গর্বের।"
প্রতিবেশী পাবনা জেলা স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম মোস্তফা মিশরীকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, "মিশরী ছোট থেকেই মেধাবী ছিল। আমি তার শিক্ষক হিসেবে গর্ববোধ করি। মুনমুনের জয় পুরো পাবনাবাসীর।"
পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদার বলেন, "আমরা খুবই গর্বিত ওর এই সাফল্যে। মিশরী আমাদের কলেজের মুখ উজ্জ্বল করেছে।"
রোববার (৪ এপ্রিল) সন্ধায় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর মেডিকেলের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৪৮ হাজার ৯৭৫ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার ৩৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন মিশরী মুনমুন। তার রোল নম্বর ২৫০০২৩৮। তিনি পাবনা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ভর্তি পরীক্ষার ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৮৭.২৫ নম্বর।
