কুমিল্লায় ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করতে চলছে জিজ্ঞাসাবাদ
কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দিঘির পাড়ের একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার অভিযোগে ইকবাল হোসেনসহ চারজনের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৯৯৯-এ কল করা ইকরাম ও মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখা ইকবালকে প্রাধান্য দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি। সাথে আছেন একদল চৌকস কর্মকর্তা।
রোববার বিকেল পর্যন্ত খবরে জানা যায়, প্রথম দিন ইকরাম ও ইকবালকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছেন, সে ব্যাপারে তারা এখনো মুখ খোলেননি।
সূত্র জানায়, তারা দুজনই মাদকসেবী। টুকটাক মাদক ব্যবসার সাথে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'এটি স্পর্শকাতর। আমরা প্রতিটি বিষয়কে ধরে ধরে আগানোর চেষ্টা করছি। ঘটনার গভীরে কাদের ইন্ধন আছে, তা খুঁজে বের করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
এর আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় শনিবার বেলা ১২টার দিকে চারজনকে কুমিল্লা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়। পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। বিচারক মিথিলা জাহান নিপা তাদের সাতদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
বৃহস্পতিবার রাতে ইকবালকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার বেলা ১২টার সময় কুমিল্লা পুলিশ লাইনসে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে।
ইকরাম-ইকবাল সম্পর্কে যা জানা যায়
মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখেন ইকবাল। কুমিল্লা নগরীর ১৭নং ওয়ার্ড দ্বিতীয় মুরাদপুর লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে তিনি। নূর আলম মাছ ব্যবসা করেন।
ইকবালের মা আমেনা বেগম জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করেন। দশ বছর আগে জেলার বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করে তিনি। তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর পরে ইকবালের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তারপর ইকবাল জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আবার বিয়ে করেন। এ সংসারে তার এক ছেলে এক মেয়ে। ইকবালের স্ত্রী-সন্তান এখন কাদৈর গ্রামে থাকেন।
আমেনা বেগম আরও জানান, ইকবাল নেশাগ্রস্ত হয়ে নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করতেন। তিনি মাজারে মাজারে থাকতে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেতেন। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।
পঞ্চম শ্রেণি পাস ইকবাল দশ বছর আগে বন্ধুদের সাথে পাড়ার মারামারিতে ছুরিকাহাত হন।
ইকবালের মা আরও বলেন, ইকবালের চলাফেরার কারণে বিভিন্ন সময় চুরির অপবাদে তাকে স্থানীয়রা মারধর করত।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ইকবাল মাদক সেবনের পাশাপাশি টুকটাক মাদক ব্যবসা করতেন। মণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে আসার ঘটনায় কারও ইন্ধন থাকতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইকবালের পরিবার স্থানীয় ১৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেলের মালিকানাধীন বস্তি এলাকায় ভাড়া থাকে। তাদের নানা কাজে সহায়তা করতেন কাউন্সিলর।
পুলিশ বলছে, কাউন্সিলরের এক ভাতিজার সাথে ইকবালের ঘনিষ্ঠতা আছে। তিনিও মাদকসেবী।
ইকবাল মাঝে মাঝে রঙমিস্ত্রির কাজ করতেন। নির্মাণ কাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করতেন তিনি।
অন্যদিকে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনার দিন ৯৯৯-এ কল করেন। তিনি নগরীর কাশারিপট্টির রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে।
বিবাহিত ইকরাম উগ্র ও মাদকাসক্ত। পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন তিনি।
ঘটনার আগের রাতে ইকরাম ছোট ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সারা রাত বাইরে কাটান তিনি। পরের দিন সকালে নানুয়ার দিঘির পাড়ে গিয়ে ৯৯৯-এ কল করে মণ্ডপের খবর জানান। পুলিশ তার কল পেয়েই ঘটনাস্থলে হাজির হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে ইকবাল মসজিদে যাওয়ার দুই মিনিট পর ইকরামকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়।
একটি সূত্রে জানা যায়, ইকরামকে পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইকরাম সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর সমর্থক।
পুলিশ এসবগুলো ঘটনার হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে।
ইকরামের মা সেলিনা আক্তার বলেন, 'স্থানীয় বখাটেদের সাথে মিশে আমার ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে!'
বলে রাখা ভালো, গত ১৩ অক্টোবর নগরীর নানুয়ার দিঘির পাড়ের একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির ওপর কোরআন শরিফ রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লাসহ সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় চাঁদপুরে পাঁচজন, নোয়াখালীতে দুইজন ও কুমিল্লায় একজন মারা যান।
