ভারতবর্ষের আয়া সমাজ: যাদেরকে দাসের মতো খাটাত ব্রিটিশরা, নিয়ে যেত ব্রিটেনেও
১৮৪৯ সালে মাদ্রাজ থেকে সুদূর ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ক্যারোলিন পেরেইরা। তখনকার দিনে জাহাজে করে ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে সময় লাগত ছয় মাসেরও বেশি। শত শত সাদা চামড়ার লোকের সঙ্গে জাহাজে চড়া ক্যারোলিনের যাত্রার বর্ণনা পাওয়া যায় পুরনো এক চিঠি থেকে-
পানি উঠে আসছে। মনে হচ্ছে জাহাজ ডুবে যাবে। কিন্তু আমার মনিব আমাকে আদেশ দিয়েছে কার্পেট শুকাতে। আমি বললাম, 'স্যার, আমি পারব না। আমার জীবন এখন বিপন্ন'... মনিবের জন্য অনেক কিছু করতে হয় আমার। পাঁচ বাচ্চার দেখভাল, পত্নীর পোশাক ঠিক করে দেওয়া… আমার নিজেরও দুই বাচ্চা আছে- এদের একজনকে ঘুম পাড়িয়ে আরেকজনকে গোসল করাতে হয়, আবার ডিনারের সময় একজনকে কোলে রাখতে হয়। এই ঘটনার পর থেকেই মনিব আমার উপর ক্ষুব্ধ। 'যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা,' বলেন তিনি। আমার মনিব সম্ভবত আমাকে শত্রু বানিয়ে ফেলবেন।
ক্যারোলিন ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী ড. জেমস দারউডের আয়া। এই চিঠির কয়েকদিন পরই ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন ক্যারোলিন। পুরনো নথি থেকে জানা যায়, মামলার রায়ে ক্যারোলিনকে দেশে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।
সাদা চামড়ার ব্রিটিশ শিশুদের দেখভাল সবসময় আয়ারাই করতেন। উচ্চবিত্ত মেমসাহেবরা সন্তানের দায়িত্ব নিতেন না। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব শিশুদের লালন-পালন ও বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন আয়ারাই। আর মেমসাহেবদের কাছে এই আয়ারা ছিলেন অস্পৃশ্য।
১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খোলার আগে ব্রিটেনে এই আয়াদের চাহিদাও ছিল অনেক। কিন্তু চাহিদা ও কর্মগুণ সত্ত্বেও তাদের মানুষ হিসেবে ন্যূনতম মূল্যও দিতেন না ব্রিটিশ মনিবরা।
ভারতবর্ষে থাকা ব্রিটিশদের বাড়িতে বাড়িতে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করেছেন লাখ লাখ আয়া। কোম্পানির দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার বেলায় এসব আয়াদের সাথে করে নিয়েও গেছেন অনেক। তবে এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ছিল ধর্ম। সমুদ্র পাড়ি দিলে জাত চলে যাবে, এই ঝুঁকি নিয়েই জাহাজে চড়েছেন তারা।
শুধু জাত যাওয়ার ঝুঁকি না, ছিল জীবন যাওয়ার ঝুঁকিও। জাহাজে পানি উঠে গেলে বা জাহাজের ভার বেশি হয়ে গেলে এরকম আয়াদের সমুদ্রে ছুড়ে মারার নজিরও আছে।
আর এসব আয়ারা দেশে নিজের পরিবার ছেড়ে ও জাতচ্যুত হয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতেন অর্থের প্রলোভন ও মনিবের প্রতি আনুগত্য থেকে।
ভ্রমণের জন্য পেরেইরাকে দিতে হয়েছিল ৩০০ রূপি, যা সে যুগে একজন মহিলা কেরানির ৭৫ সপ্তাহের মজুরির সমান (আজকের দিনের হিসেবে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা)। দেশে ফেরত আসার খরচ মনিবের পক্ষ থেকে দেওয়ার কথা থাকলেও পেরেইরার ক্ষেত্রে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় দারউড পরিবার।
টাকা চাইলে দারউডের স্ত্রী বলে বসেন, অন্য একজন মনিবের খোঁজ করতে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে অন্য মনিব খোঁজে পাওয়াটাও তেমন কঠিন ছিল না। ভারতবর্ষ ও চীন থেকে যাওয়া আয়াদের নিয়ে ব্যবসা চালু ছিল ইংল্যান্ডে। টমাস কুকের ট্র্যাভেল অ্যাজেন্সি থেকে শুরু করে আয়াদের হোস্টেল, অনেক জায়গা থেকেই আয়া নিয়োগ দিতেন সাদা চামড়ার ব্রিটিশ মনিবরা।
উনিশ শতকে ব্রিটেনে কী পরিমাণ আয়া 'রপ্তানি' হয়েছে, তার কোনো হিসাব পাওয়া যায় না এখন। তবে ১৮৯০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত জাহাজের যাত্রী তালিকা দেখে এই সময়কালের বিলেতগামী আয়াদের শনাক্ত করা যায়।
এই সময়কালে বছরে ২০ জন করে আয়া পাড়ি দিয়েছেন ব্রিটেনে। সর্বোচ্চ আয়া রপ্তানি হয়েছে ১৯২১ সালে, ৫১ জন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্বদেশগামী ব্রিটিশদের সঙ্গ দিতেই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল এতজন আয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, অর্থাৎ ৪০-এর দশকে আয়া নেওয়া বন্ধ থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটিশরাই চলে যায় উপমহাদেশ ছেড়ে। ৫০-এর দশকে মাত্র তিনজন আয়া ভারত ছাড়েন।
ব্রিটেনে যাওয়া অধিকাংশ আয়া আবার ফিরেও এসেছেন ভারতে। কিন্তু যেই ৬০ বছরের সময়কালের রেকর্ড আছে, এই সময়ে ভারত থেকে ব্রিটেনে পাড়ি দিয়েছেন ৯৮৪ জন আয়া, আর এর বিপরীতে ব্রিটেন থেকে ভারত অভিমুখে রওনা দিয়েছেন মাত্র ৩০৮ জন আয়া। যার মানে, অনেক আয়াই থেকে গেছেন, বা তাদের থেকে যেতে হয়েছে।
ধারণা করা হয়, থেকে যাওয়া আয়ারা এই পরিচারিকার পেশাতেই থেকে গেছেন আজীবন। অথবা স্থানীয়ভাবে এরকম অন্যান্য পেশায় যোগ দিয়েছেন।
সূত্র: হিস্ট্রি টুডে।
