চট্টগ্রামের বিমানযাত্রীদের সেবায় আসছে ওয়াটার বাস
চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দাদের কেউ যখনই বিমানবন্দরে যাবার চিন্তা করেন, সেখানে সময়মতো পৌঁছুনোর উদ্বেগে তার দম বন্ধ হয়ে যাবে। বিমানবন্দর পর্যন্ত যাবার পথটুকু পেরুতে হয় তাকে সময়মতো পৌঁছুনোর জন্য প্রার্থনা করতে করতে। নগরীর নিমতলী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছে বোর্ডিং পাসটি হাতে নিতে বিমানযাত্রীর সময় লেগে যাবে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
বিমানবন্দরে যাত্রার পথটুকু সহজ করতেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ওয়াটার বাস চালুর প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। এটি চালু হয়ে গেলে নগরীর সদরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট।
বিমানযাত্রীরা তখন মালামাল নিয়েই একেবারে উঠে যাবেন ওয়াটার বাসে। বিমানবন্দরের কাছে পতেঙ্গায় অপেক্ষমান খেয়ানৌকায় চেক-ইনের কাজটুকু হয়ে যাবে। এরপর যাত্রীদের মিনিবাসে নিয়ে যাওয়া হবে বিমানবন্দরে। এ ফাঁকে তাদের মালামাল পৌঁছে যাবে নির্দিষ্ট বিমান সংস্থার ভ্যানে।

সরেজমিন দেখতে সদরঘাটে টার্মিনালে পৌঁছুতে নজরে পড়ল একটি ঝাঁ-চকচকে দোতলা ভবন। এটিই হবে ওয়াটার বাস সার্ভিসের কাউন্টার। ভবনটির সামনে একটি পার্কিং স্পেস বানানো হয়েছে। বাইরের গেটটিও বিশাল। ‘তৈয়বিয়া কন্সট্রাকশন’ কাউন্টারটি বানিয়েছে।
সানজিদা শারমিনকে নিয়মিতই যেতে হয় চট্টগ্রামে। প্রতিবার বিমানবন্দরে যাবার সময ফ্লাইট মিসের উদ্বেগ তাঁকে ঘিরে ধরে। জানালেন, তাঁর কাছে ওয়াটার বাস সার্ভিস ‘একটা সঙ্গীতের মতো’।
কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীতে ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগটি হোঁচট খেয়েছে কেবল কর্ণফুলি নদীতে ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ না হওয়ায়। এ বছরের জুলাইতে থমকে গেছে ড্রেজিং প্রকল্প। নদীর তলদেশে প্লাস্টিক আবর্জনার পাঁচ ফুট আস্তরণ জমে থাকায় বন্ধ হয়েছে কাজটি।
নতুন বানানো টিকেট কাউন্টারের কেয়ারটেকার জানালেন, জেটির নির্মাণকাজও তাই এখন বন্ধ। জেটির সামনের অংশে ড্রেজিং না হওয়ায় জেটিতে ওয়াটার বাস ভেড়ানো সম্ভব হবে না।
ওদিকে, এসএস ট্রেডিং নামের একটি শিপবিল্ডিং কোম্পানি এরই মধ্যে চারটা ওয়াটার বাস নির্মাণ করেছে। প্রতিটি বাসের ধারণক্ষমতা ১৫০ জন যাত্রীর।

শুরুতে ওয়াটার বাস সার্ভিসে বিমানবন্দরমুখী যাত্রীদের বহন করবে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর। তারপর থেকে আধ ঘণ্টা পরপরই ওয়াটার বাসের সেবা পাবেন যাত্রীরা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তথ্যগুলো জানালেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
তিনি বললেন, ‘‘সব কিছু তৈরি। জেটি ও কাউন্টার নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে। ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে ড্রেজিংয়ের উপর। ড্রেজিং শেষ করা গেলে দ্রুত চালু করা যাবে এ সার্ভিস।’’
চট্টগ্রাম নগরীর নিমতলী হয়ে বিমানবন্দরে যাবার পথ একটিই। তাই এ মুহূর্তে এ পথের যানজট কমানো খুব কঠিন। ওমর ফারুক জানালেন, বে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া অব্দি এ পথের ট্রাক, কভার্ড ভ্যান আর লরিবহরের চাপ কমানো যাবে না।
সমস্যার সমাধানের চিন্তা থেকেই সরকার বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ওয়াটার বাস প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন।
নগরীর ষোলশহরের টু নো গেট এলাকার বাসিন্দা এম আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা হল। তিনি বললেন, “বিমানবন্দরগামী রাস্তাগুলোতে গাড়িবহরের চাপ প্রচুর। আবার বছরজুড়ে চলা নির্মাণকাজও যানজট বাড়ায়। ওয়াটার বাস সেবা চালু হলে খুব অল্প সময়েই বিমানবন্দরে যেতে পারব আমরা।”
তাহলে ড্রেজিং কেন হচ্ছে না সেখানে?
২০১১ সালে প্রথম ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এন্ড ড্রেজিং করপোরেশন (এমএমডিটি) ২২৯ কোটি ৫৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকায় ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ শুরু করে। কিন্তু ২০১৩ সালে প্রকল্পের মাঝপথে ওরা কাজ ছেড়ে দেয়। এ কাজের জন্য ওরা ১৬৬ কোটি টাকা নিয়েছিল।
কর্ণফুলীতে ৫ বছর ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ থাকার পর, ২০১৮ সালে ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে আবারও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রেজিংয়ের প্রকল্প হাতে নেয়। এবার নতুন নামে। ‘চট্টগ্রাম থেকে বাকলিয়া চর ড্রেজিং প্রকল্প’। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নৌ-কল্যাণ সংস্থাকে ২৪২ কোটি টাকার এ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রকল্প অনুযায়ী কর্ণফুলীর সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত ড্রেজিংএর কাজ ডিপিএম পদ্ধতিতে হবার কথা।

নৌ-কল্যাণ সংস্থা পরে সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেয় ই-ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে। প্রধান ড্রেজিংয়ের অংশ হিসেবে ঠিকাদারি এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল কর্ণফুলীর তলদেশ থেকে ৪২ লাখ কিউবিক ফুট মাটি সরানো। এ লক্ষ্যে তারা ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর কাজ শুরু করে।
কিন্তু পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের কারণে ড্রেজারের পাখা আটকে যাওয়ায় তারা ২০১৯ সালের জুলাই মাসে কাজ বন্ধ করে দেয়। যদিও চার বছরের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল তাদের।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য ইঞ্জিনিয়ারিং কমোডর খন্দকার আকতার হোসেন বললেন, “এসব পলিথিন তোলার জন্য গ্র্যাব-ড্রেজার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে।”
ঠিকাদারি ওই প্রতিষ্ঠানটির কাছে যেসব ড্রেজার আছে তা দিয়ে সেগুলো তুলে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি বাংলাদেশেও নেই এসব পলিথিন তোলার মতো ড্রেজার।

খন্দকার আকতারের কাছে জানা গেল, বিদেশ থেকে গ্র্যাব-ড্রেজার আনতে কমপক্ষে তিন মাস লাগবে। ড্রেজার হাতে পাওয়ার পরে নদীর তলদেশ থেকে পলিথিনের এ স্তর তুলে নিতে সময় লাগবে আরও দু’মাস। তারপর শুরু করা যাবে মুল ড্রেজিংয়ের কাজ।
ই-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম ড্রেজিং বন্ধ করার বিষয়ে জানালেন, ‘‘কর্ণফুলীর তলদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পুরু স্তর জমে গেছে। আমরা তাই কাজ বন্ধ করেছি। একটা চীনা কোম্পানিকেও এর সাথে অন্তর্ভূক্ত করে কাজটা করতে পারিনি। বিষয়টা আমরা বন্দর ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’’
তবে গ্র্যাব-ড্রেজার আনলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন না। ফলে কর্ণফুলীতে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু নিয়ে দোদুল্যমানতা থেকেই যাচ্ছে।
