ধারণ ক্ষমতার চারগুণ ৬৪০ যাত্রী নিয়ে কাবুল থেকে আকাশে উড়ল মার্কিন বিমান

সাধারণ সময়ের চেয়ে চারগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে মার্কিন বিমান বাহিনীর সি-১৭ জেটটি গত রোববার কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির উদ্দেশ্যে কাবুলের হামিদ কারজাই বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে। তালেবান বাহিনী রাজধানী কাবুলে প্রবেশের পর উদ্বিগ্ন আফগান জনগণ এবং কর্মরত মার্কিনীরা কাবুলের বিমানবন্দরে এসে ভিড় করতে থাকে আফগানিস্তান ত্যাগের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রে দুটি ফ্লাইটের মধ্যে সি-১৭'র এই ফ্লাইটে করে ৬৪০ জন কাবুল ত্যাগ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেটটি একলাখ একাত্তর হাজার পাউন্ড মালামাল বহন করতে সক্ষম, কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ১৫০ জনেরও কম সৈন্য বহন করার উপযোগী।
যদিও প্রথমে ধারণা করা হয়েছিলো যাত্রীর সংখ্যা ৮০০, তবে পরবর্তীতে সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়। সোমবার সি-১৭ এর আরও একটি বিমান আফগান এবং আমেরিকানদের নিয়ে কাবুল ত্যাগ করেছে। এসময় দেশ ছাড়তে চাওয়া শত শত আফগান মরিয়ে হয়ে রানওয়েতে ছুটে চলা বিমানের সঙ্গে দৌড়াতে থাকে। আকাশে উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনে ঝুলে থাকা তিনজন আফগান নাগরিকের নিচে পড়ে মৃত্যু হয়; দুইজন মারা যায় মার্কিন বাহিনীর গুলিতে এবং আরও তিনজনের বিমানের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয় সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে।
সোমবার সকাল পর্যন্তও মার্কিন বিমানবাহিনী নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি কত জনকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং কতজনকে সরিয়ে নেওয়া এখনও বাকি। তবে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় দেড় ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ ছিল।
এরপর আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত যানবাহনে করে তালেবানরা বিমানবন্দরের গেটে অবস্থান নিয়েছে বলেও জানা গেছে।
আফগানিস্তানের এই উদ্ধার অভিযানটি ১৯৭৫ সালের সায়গন পতনের চিত্র মনে করিয়ে দেয়, যখন উত্তর ভিয়েতনামের ভিয়েত কং-দের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয় হয়েছিলো।
এদিকে সোমবার সকালে এক সাক্ষাৎকারে, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তার নাগরিকদের সরিয়ে আনবে এবং শরণার্থীদের মধ্যে দোভাষী এবং অনুবাদকরাও থাকবে, যারা আমেরিকার সঙ্গে কাজ করেছিলো।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আফগান বাহিনীকে দোষারোপ করে বলেন, "যখন দরকার ছিলো, তখন তারা যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০ বছর পর সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়েই নেওয়া হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অনুসরণ করেছেন।"
আরও পড়ুন- বিমান থেকে পড়ে অন্তত ৩ জনের মৃত্যু, পাখা আঁকড়েই কাবুল ছাড়তে মরিয়া মানুষ
মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়তে চাইছে আফগানরা, হুড়োহুড়িতে নিহত অন্তত ৫
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাসের তিন হাজার বেসামরিক কর্মীকে সরিয়ে নিয়ে আসার কথা বলা হলেও এটা এখনো নিশ্চিত নয় যে, তারা সবাই আফগানিস্থান ত্যাগ করতে পেরেছে কিনা।
বাইডেন প্রশাসন আমেরিকান এবং আফগানদের সঠিক পরিসংখ্যাণের ব্যাপারে অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যাচ্ছে; অথচ তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা প্রয়োজন।
এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে এতদিন বিভিন্নভাবে কর্মযুক্ত ছিলো এমন প্রায় ত্রিশ হাজার আফগান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পেশাল ইমিগ্রেশন ভিসার আবেদন করছে। এবং তাদেরকে অভিবাসীর মর্যাদা দিয়ে টেক্সাসের উইসকনসিনের ফোর্ট ম্যাকয় এবং ফোর্ট ব্লিসে প্রাথমিকভাবে আশ্রয় দেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে মার্কিন বিমান বাহিনীর পরবর্তী ফ্লাইট কাবুল থেকে কবে এবং কখন উড্ডয়ন করবে, কারা ফ্লাইটে থাকবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছুই জানানো হয়নি।
এই মুহূর্তে ছয় হাজার মার্কিন সেনা কাবুল বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।
তালেবানদের থেকে বাঁচতে হাজার হাজার উদ্বিগ্ন আফগান জনগণ দেশ ছাড়ার আশায় বিমানবন্দরে ছুটে এসেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রোববার জানিয়েছে, কয়েকজনকে পাসপোর্ট এবং টিকিট ছাড়াই বিমানে উঠতে দেওয়া হয়েছে। তবে কারা এই ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করছিল তা স্পষ্ট নয়।
বিমানবন্দরের একদিকে মার্কিন বিমানবাহিনীর ফ্লাইট চালু হয়েছে এবং অন্যদিকে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরণের বাণিজ্যিক ফ্লাইট।
দেশ ছাড়তে একজন দোভাষী রোববার বিকেলে তার স্ত্রী এবং ছয় সন্তানের সঙ্গে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তাকে প্রথমে বলা হয়েছিল তারা ফিনল্যান্ডের একটি ফ্লাইটে উঠবে; কিন্তু পরবর্তীতে তা বাতিল করে দেওয়া হয়।
"তারা আমাদের বলেছে যে আমরা কোথাও যাব; কিন্তু কোথায় এবং কখন, তা কেউ জানে না"- তিনি বলেন।
- সূত্র- ডেইলি মেইল