ডোনাল্ড ট্রাম্পের কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন সমাপ্তির এক সপ্তাহ পার হয়েছে। সিংহভাগ জনরায় নিয়ে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্রেট চ্যালেঞ্জার জো বাইডেন। তার অভিষেকের এখনও দুই মাস বাকি। কিন্তু, প্রেসিডেন্ট সুলভ আচরণ করা শুরু করেছেন তিনি। নিজ দায়িত্বের গুরুভার অনুধাবন করে নেওয়া শুরু করেছেন নানা প্রস্তুতি।
যেমন; চলতি সপ্তাহেই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় এক বৈঠক করেছেন। এসব ইতিবাচক ঘটনায় বাইডেন আলোচনায় আসলেও, অনেক মার্কিনী বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা ভাবছেন। কারণ, তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি পরাজয় মেনে ক্ষমতা ছাড়তে আগ্রহী নন। ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই জনমনে চলছে নানা ধরনের কল্পনা-জল্পনা।
অপ্রত্যাশিত কাজ করে সকলকে ভড়কে দিতে ওস্তাদ ট্রাম্প। তিনি কখন কী করবেন- সেটা অনুমান করা সহজ নয়। তবে তিনি যাই করুন, ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি তাকে ওভাল অফিস ত্যাগ করতেই হবে। তারপর তার সাথে কী হবে বা হতে পারে, সেটাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য।
মামলার স্রোত:
দায়িত্বরত কোনো প্রেসিডেন্টকে আদালত সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করতে পারবেন না; ১৯৭৩ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রেক্ষিতে মার্কিন বিচার বিভাগ, এমন নীতিমালা প্রণয়ন করে। হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যাওয়া মাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাওয়া এই ছাড়পত্র হারাবেন ট্রাম্প। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের যে পাহাড় জমে আছে, তার সবগুলো তখন রূপ নেমে মামলার জোয়ারে।
নিউইয়র্ক রাজ্যে ট্রাম্পের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধী তৎপরতা এবং বাণিজ্যিক অসাধুতা- উভয় ধরনের অভিযোগে তদন্ত চলছে। একাধিক নারীর পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগও আনা হয়েছে।
ইতোমধ্যেই, এমন দুই নারীকে অর্থ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৯ সালে ট্রাম্পের আইনজীবী মাইকেল কোহেনকে কারাদণ্ড দেন আদালত। এবার ট্রাম্পকেও ওই একই অভিযোগে সাজা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ, ট্রাম্পের নির্দেশেই এমন কাজ করার কথা কোহেন স্বীকার করেছেন।
সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার আগে নিজেকে 'রাষ্ট্রপতির ক্ষমা'র আওতায় এসব মামলা ও তদন্ত থেকে মুক্তি দিতে পারেন তিনি। তবে অতীতে কোনো প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্ষমা করার চেষ্টা করেননি। এই পদক্ষেপ আইনি বিচারে বিবেচনায় টিকবে কিনা- সেটাও স্পষ্ট নয়।
পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বাইডেন চাইলে ট্রাম্পকে ক্ষমা করতে পারেন। যেমন; ১৯৭৪ সালে নিক্সনের পদত্যাগের পর তাকে ক্ষমা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড।
যেভাবেই হোক কেন্দ্রীয় আদালতে সাজা থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা মার্কিন রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আওতায় পরে। এর অর্থ হলো; পদ ছাড়া মাত্র রাজ্য পর্যায়ের আদালতে ট্রাম্পের বিচারের হুমকি দূর হবে না। এমন দশায় কী হবে, তা একমাত্র ভবিষ্যৎ বলতে পারে।
ট্রাম্পের জীবনী লেখক এবং সাংবাদিক মাইকেল ডি'অ্যান্টোনিও বলেন, ''ট্রাম্প সারাজীবন আইনি লড়াইয়ে জাদুকর হুডিনির মতোই বিস্ময়কর ছিলেন। অতীতে অনেক মামলা তিনি সামান্য পরিমাণ অর্থ দিয়েই নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হন।''
এই চমক তিনি আগামীতে আর দেখাতে পারবেন না, বলে মনে করেন অধিকাংশ আইনজ্ঞ।
দেনার পাহাড়:
নিজ পদমর্যাদার কারণে তিনি আইনি সুরক্ষা যেমন পান, ঠিক তেমনি পান আর্থিক নিরাপত্তা। ঠিক একারণেই পরাজয়ের লক্ষ্মণ দেখা দেওয়া মাত্র ট্রাম্প ভোট গণনা বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছেন, এমন অভিযোগ অনেকের।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক টিমোথি সিন্ডার দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনকে জানান, 'প্রেসিডেন্ট অফিসের বদৌলতেই তিনি গরিবি দশা আর জেল থেকে দূরে থাকতে পারছেন।'
গত সেপ্টেম্বরে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, জার্মান ব্যাংক ডয়েচের কাছে ট্রাম্পের মোট ৪০ কোটি ডলার দেনা রয়েছে। আগামী চার বছরের মধ্যে দেনা শোধ না করতে পারলে তাকে ঋণখেলাপির তালিকাভুক্ত করবে আর্থিকখাতের ইউরোপীয় জায়ান্টটি।
নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ডয়েচের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে গেলে আরও সহজে ঋণ আদায়ে তৎপর হতে পারবে পাওনাদার প্রতিষ্ঠানটি। তাছাড়া, এই ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টার ছিলেন ট্রাম্প নিজেই। তাই ব্যাংকটি তার স্থায়ী সম্পত্তি অধিগ্রহণের চেষ্টা করতে পারে।
এছাড়া, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ট্রাম্পের ব্যবসায় লোকসান হয় ১৪০ কোটি ডলার। তারপরও নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার কর রেয়াত নিয়েছিলেন। এনিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তা প্রমাণিত হলে ট্রাম্পকে সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে হবে।
পারিবারিক ব্যবসা:
সর্বমোট ৫০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক মার্কিন রাষ্ট্রপতি। এর মধ্যে রয়েছে; হোটেল, গলফ ক্লাব ও রিসোর্ট। প্রেসিডেন্ট থাকার সময় প্রায়শই নিজের ব্যবসা ও সম্পদকে জাহির করতেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের ছেলেরা ব্যবসার পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেও, এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষপদ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান থাকার এই দ্বৈত ভূমিকা শুরু থেকেই ডেমোক্রেটদের সমালোচনার মুখে পড়ে। একে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের উপরে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার সাংঘর্ষিক অবস্থান বলে নিন্দা জানান বিরোধী নেতারা।
চীনের ঘাড়ে মহামারি, অর্থনৈতিক দৈন্যতা এবং বাণিজ্যিক অসাধুতার অভিযোগ চাপালেও আমিরাতে গলফ কোর্স তৈরিতে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকেই ১০ লক্ষাধিক ডলারের উপর ঠিকাদারি দিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ চলাকালেই তিনি এমন কাজ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর নিজ ব্যবসায় আরও সময় দিতে পারবেন ট্রাম্প। তবে ফোর্বস ম্যাগাজিনের অনুমান করোনা মহামারিতে ট্রাম্পের আবাসন ও পর্যটন ব্যবসা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাই মোট সম্পদের মূল্যায়ন ২১০ কোটি ডলার থেকে নেমে এসেছে শতকোটি ডলারে। অবশ্য এ মূল্যায়ন চলতি বছরের মার্চ নাগাদ সময়ের। তারপর আরও দরপতনের ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যবসার ডুবন্ত তরী সামলাতে সামলাতেই ট্রাম্পের অবসরকালের সিংহভাগ সময় কাটতে পারে।
- সূত্র: ডয়েচে ভেলে
