করোনায় আরেকটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার সন্ধান
হাসপাতালগুলোর কোভিড-১৯ ওয়ার্ড থেকে সুখবর আসা আজকাল বিরল বিষয়। বিশ্ব জুড়ে লাগাতার বাড়ছে করোনার সংক্রমণে হাসপাতালে ভর্তি হবার হার।
তবে বৃহস্পতিবার ঘোষিত দুটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল রোগী এবং হাসপাতাল উভয়ের জন্যই পূর্বাভাস বয়ে এনেছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের।
টোসিলিজুমাব এবং সারিলুমাব নামে পরিচিত এই দুটি ওষুধ বর্তমানে আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের প্রদাহ কমাতে ব্যবহার করা হয়। অধি-প্রদাহের ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অতিরিক্ত বেড়ে যায়, এর ফলে ধীরে ধীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে এবং এটাই হতে পারে কোভিড-১৯ নির্মূল করার একটি উপায়।
কোভিড-১৯-এর জন্য উপযুক্ত অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধের খোঁজ ইতোমধ্যে ডেক্সেটাসোনে শুরু হয়ে গেছে। এটি মূলত একটি সস্তা স্টেরয়েড, যা শরীরজুড়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দমিয়ে রাখে। এর বিপরীতে, টসিলিজুমাব এবং সরিলুমব হচ্ছে অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। এগুলো এন্টিবডি দিয়ে তৈরি, যা ইন্টারলিউকিন-৬-এর প্রভাবকে অবরুদ্ধ করে। এ এমন এক প্রোটিন, যা প্রতিরোধের প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে এবং কোভিড -১৯-এর রোগীদের চিকিৎসায় এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
টোকিলিজুমাব এবং সরিলুমাবের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের প্রয়োজনে ৮০০ জন কোভিড -১৯ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের সবার পরিস্থিতি ছিল নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটগুলিতে (আইসিইউ) হস্তান্তর হবার মতো গুরুতর। ট্রায়ালটি মোট ৬ দেশে হলেও এর বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী ছিলেন ব্রিটেনের অধিবাসী। কারণ, ব্রিটেনে কোভিড-১৯-এর ওষুধ ট্রায়ালের ক্ষেত্রে একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং এখানে করোনা রোগীদের এক চতুর্থাংশকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
৮০০ রোগীর অর্ধেক স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্টে পেয়েছে ওই দুটি ওষুধের যেকোনো একটি এবং বাকি অর্ধেক পেয়েছে প্রচলিত চিকিৎসা (ডেক্সটেহাসন-সহ) থেকে।
ট্রায়ালটিতে প্রচলিত চিকিৎসা পাওয়া গ্রুপের প্রায় ৩৬ শতাংশ রোগী মারা যান, যা চিকিৎসায় টোসিলিজুমাব বা সারিলুমাব গ্রহণ করা গ্রুপের রোগীদের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি।
অন্য কথায়, টোসিলিজুমাব বা সারিলুমাবের প্রয়োগ মৃত্যুহার কমিয়ে দিয়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এই ওষুধে চিকিৎসা পাওয়া রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যান এবং সাত থেকে দশ দিন আগে ছাড়পত্র পান হাসপাতাল থেকে। হাসপাতালে অবস্থান করা রোগীর পরিমাণ কমে গেলে অনেক আইসিইউ শয্যা খালি হয়ে যায়, যা ব্রিটেন ও আমেরিকার মতো দেশের জন্য এই মুহূর্তে অনেক আনন্দের সংবাদ; বিশেষ করে দেশ দুটোতে যখন অনেক হাসপাতাল ধুকছে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় শয্যা শূন্যতায়।
এই দুটি ওষুধ সমানভাবে কাজ করে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও টোসিলিজুমাবের ক্ষেত্রে ট্রায়ালের ফলাফল ছিল অগ্রগণ্য। যেহেতু এটি আগে থেকেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি ওষুধ, তাই ট্রায়ালে নতুন চিকিৎসা বিভাগে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগকেই দেওয়া হয়েছিল এটি।
তবে এই ওষুধ মোটেও সুলভ নয়; তাই এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগালের বাইরে থাকতে পারে। ব্রিটেনে ইন্ট্রাভেনাস চিকিৎসার খরচ ৭৫০ থেকে ১,০০০ পাউন্ড (প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৪০০ মার্কিন ডলার)।
প্রতিদিন দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) আইসিইউতে রোগীপ্রতি ব্যয় হয় প্রায় ২ হাজার পাউন্ড। সাধারণত যেসব রোগী আইসিইউতে কম দিন থাকেন, তারা পরে দ্রুত সুস্থ হয়ে যান এবং পরবর্তীকালে অন্য রোগীদের তুলনায় তাদের কম পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
এনএইচএস দ্রুতই আইসিইউতে থাকা ১৯ রোগীদের জন্য টোসিলিজুমাব ব্যবহার শুরু করবে। হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যে এই ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
সরবরাহ বাড়ানোর জন্য দেশটির সরকার এই ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা রোচের সঙ্গে কাজ করছে।
আপাতত, ব্রিটেন টোসিলিজুমাব ও সারিলুমাব ওষুধ দুটি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে।
যখন ক্রমাগত বড় হচ্ছে করোনায় মৃত্যুর মিছিল, তখন এই ট্রায়ালের ফলাফল আশার আলো নিয়ে এসেছে রোগী, ক্লান্ত স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে লকডাউনে গৃহবন্দি লাখ লাখ মানুষের জন্য।
- সূত্র: ইকোনোমিস্ট
