‘যেকোনো ফরম্যাটে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়’: অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর শান্ত
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের ঐতিহাসিক জয়কে 'যেকোনো ফরম্যাটে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়' বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশ বিশ্বসেরা দলের মাটিতেই তাদের সব বিভাগে পর্যুদস্ত করেছে। এই জয়ের মাধ্যমে দুই ম্যাচের সিরিজে নিয়েছে ১-০ ব্যবধানের লিড।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় টেস্ট। এই ম্যাচে তারা নয় উইকেটে গুঁড়িয়ে দিয়েছে পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়া দলকে—যে দলটি আবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছে।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শান্ত বলেন, 'যেকোনো ফরম্যাটে এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও দারুণ কিছু করে দেখাব।
'নিজেকে নিয়ে এবং ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তা নিয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত ও গর্বিত। আমরা প্রচুর পরিশ্রম করেছি।'
পেস বোলারদের আলাদা করেই প্রশংসায় ভাসালেন শান্ত। প্রথম ইনিংসে অজিদের দশটি উইকেটই তুলে নিয়েছিলেন তারা, অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে গিয়েছিল মাত্র ১৯৮ রানে।
এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের ৫ উইকেট স্বাগতিকদের ২৮৪ রানে আটকে দেয়। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রানের।
পেসারদের প্রশংসা করতে গিয়ে শান্ত বলেন, 'টেস্ট ফরম্যাটে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এটাই [পেসারদের উত্থান]। পাঁচ-ছয় বছর আগেও পেস বোলাররা সাধারণত টেস্ট খেলতে চাইত না, কারণ তখন আমরা যথেষ্ট টেস্ট খেলতাম না। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে আমরা প্রচুর টেস্ট ম্যাচ খেলছি, ছেলেরাও এই ফরম্যাটিকে এখন খুব গুরুত্ব দিচ্ছে।
'ওরা এখন খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়—কারণ ওরা বিশ্বমানের হতে চায়। ওদের মানসিকতা এখন এমনই। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো সিনিয়ররা ওদের আরও বেশি টেস্ট খেলতে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে। এই জায়গাগুলোতেই তাদের চিন্তাভাবনা এবং মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে।'
বাংলাদেশের এই স্মরণীয় জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন ওপেনার তানজিদ হাসান। প্রথম ইনিংসে তার ১০১ রানের ইনিংসের সুবাদে বাংলাদেশ ৪২৬ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে, পেয়ে যায় ২২৮ রানের এক বিশাল লিড। ২৫ বছর বয়সি তানজিদের ক্যারিয়ারের এটি মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট।
তানজিদ প্রসঙ্গে শান্ত বলেন, 'ও দারুণ। ওর সাদা বলের খেলা লক্ষ করলে দেখবেন, সবসময় আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে ও। কিন্তু এই টেস্ট ম্যাচে ও দারুণ পরিণত রূপ দেখিয়েছে। ভীষণ শান্ত ছিল, খেলেছে বলের ধরন বুঝে। আমরা সবাই জানি টেস্ট খেলার সামর্থ্য ওর আছে। টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে আমরা এমন কাউকেই চাই যে দলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ম্যাচে ও ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছে।'
প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটসহ পুরো ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন পেশার হাসান মাহমুদ। তিনিবলেন, 'ম্যাচের আগে প্রতিদিন, প্রতিটি অনুশীলন সেশনেই আমরা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি। আমাদের পুরো মনোযোগ ছিল একটাই—যা-ই ঘটুক না কেন, নিজেদের কাজের প্রক্রিয়ার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে না। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমাদের টানা পাঁচ দিন লড়তে হবে, তাহলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ধরা দেবে।
'আমাদের বোলাররা দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে। ওরা ধৈর্য ধরে নিজেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে, নিখুঁত লাইন-লেংথে বল করে গেছে। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ফলাফল আসবেই।'
চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন মেহেদী হাসান মিরাজ, তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম পাঁচ উইকেট। তৃতীয় দিন শেষ বিকেলেই স্টিভেন স্মিথের মহামূল্যবান উইকেট তুলে নিয়েছিলেন তিনি। এরপর ঝুলিতে পোরেন আরও চারটি। অজিদের কফিনে শেষ পেরেকও ঠোকেন মিরাজ।
মিরাজ বলেন, 'দল হিসেবে এটা ছিল আমাদের অসাধারণ পারফরম্যান্স। যেভাবে খেলেছি, তাতেই আমাদের মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সবদিক থেকেই আমরা নিখুঁত ছিলাম। প্রস্তুতি ম্যাচ হারার পরও নিজেদের ওপর আমাদের আস্থা ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, এখানকার কন্ডিশনে এটা আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। দীর্ঘ সময় (২৩ বছর) পর আমরা এখানে খেলতে এসেছি। ওরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বমানের দল, ওদের স্কোয়াডে চমৎকার সব খেলোয়াড় আছে। এমন একটা দলকে যদি হারাতে পারি, সেটা আমাদের দেশ ও ক্রিকেটের জন্য অসাধারণ হবে।'
টেস্ট ক্রিকেটে স্বপ্নের বছর পার করছে বাংলাদেশ। এ বছর খেলা চার ম্যাচের তিনটিতেই এসেছে জয়। প্রতিটি জয়ই এসেছে দলের অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক শান্তর নেতৃত্বে।
অধিনায়ককে নিয়ে মিরাজ বলেন, 'ও খুব ভালো ক্যাপ্টেন। সঠিক সময়ে খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দেশে সবাই ভীষণ খুশি।'
