ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কি কেঁদেছিলেন? একটি বিতর্কের পেছনে উড়ল লাখ লাখ ডলার
এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কোনো একটি ম্যাচে কাঁদবেন কি না—এই সাধারণ এক প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে বাজি ধরা হয়েছিল লাখ লাখ ডলার। আর সেই কান্নার উত্তর খুঁজতে গিয়ে এখন রীতিমতো গবেষণায় মেতেছেন বাজিকররা।
ভবিষ্যদ্বাণী করার প্ল্যাটফর্ম 'পলিমার্কেট'-এ এই অদ্ভুত বাজিটি ধরা হয়। এই প্ল্যাটফর্মে এর আগেও মার্কিন সরকার ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব স্বীকার করবে কি না, রাশিয়ায় কোনো অভ্যুত্থান হবে কি না, এমনকি পৃথিবী চ্যাপ্টা কি না—এমন সব বিচিত্র বিষয়ে মানুষ বাজি ধরেছে। এবার নজর ছিল রোনালদোর চোখের পানির দিকে।
পর্তুগিজ মহাতারকার ক্যারিয়ারের ইতিহাস ঘেঁটে বাজিকররা কান্নার প্রমাণ খুঁজছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর ডুকরে কাঁদার দৃশ্য যেমন ছিল, তেমনি এ বছর সৌদিতে লিগ জেতার পর তাঁর আনন্দের অশ্রুও রেকর্ডে ছিল। ফলে এই সপ্তাহে বাজি ধরার হার ৭০ শতাংশই ছিল কান্নার পক্ষে।
ম্যাচ ও অমীমাংসিত বিতর্ক
সোমবারের ম্যাচটি ছিল ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর জন্য সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে পর্তুগালের বিদায়ের পর ফক্স স্পোর্টসের ধারাভাষ্যকার মন্তব্য করেন, "রোনালদোকে এখানে খুব আবেগপ্রবণ দেখা যাচ্ছে।" তাকে মুখ মুছে মাঠ ছাড়তে দেখা যায়। কিন্তু তিনি কি আসলেই কেঁদেছিলেন? এই নিয়েই শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পলিমার্কেটের ডিসকর্ড চ্যানেলে ব্যবহারকারীরা রোনালদোর মুখের জুম করা ছবি ডাউনলোড করে পরীক্ষা শুরু করেন। কেউ তাঁর নাকের ও চোখের কোণে তীরের চিহ্ন দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ওগুলো চোখের জল। বাজিকরদের এক পক্ষ দাবি করে, "ওগুলো স্রেফ ঘাম আর চিকচিক করা চামড়া, তিনি কাঁদেননি।"
অন্যপক্ষ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বিবিসি ও ইএসপিএন-এর সংবাদ শিরোনাম তুলে ধরেন। বিবিসির শিরোনাম ছিল, "রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সমাপ্তি অশ্রুসিক্ত...।" ইএসপিএন লিখেছিল, "রোনালদো চোখ থেকে জল মুছছিলেন।" বাজিকরদের দাবি, "যে জল নেই, তা মোছা যায় না।"
পলিমার্কেটের চূড়ান্ত রায়
পলিমার্কেট বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনার পর শেষ পর্যন্ত রায় দেয়—হ্যাঁ, রোনালদো কেঁদেছিলেন। তারা জানায়, গ্যালারি ও ভিডিও ফুটেজে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ম্যাচ শেষে রোনালদোর মুখে দৃশ্যমান চোখের জল ছিল। এই রায়ের পর মুহূর্তের মধ্যেই লাখ লাখ ডলার এক হাত থেকে অন্য হাতে চলে যায়।
তবে পলিমার্কেট ঠিক কোন প্রমাণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবহারকারীরা মন্তব্য করেছেন, "প্রমাণ কোথায়?" কেউ কেউ ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির পরিসংখ্যানের অধ্যাপক রন ইউরকো এই পুরো প্রক্রিয়াকে 'ওয়াইল্ড ওয়েস্ট' বা নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, "তারা কোনো প্রমাণ না দিয়ে রায় দিচ্ছে, যা স্বচ্ছতার অভাবকে প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষের এমন জায়গায় বাজি ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত।"
বিশেষজ্ঞের মত
কান্না নিয়ে গবেষণার জন্য বিশ্বখ্যাত নেদারল্যান্ডসের টিলবার্গ ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অ্যাড ভিঙ্গারহোটস এই ফুটেজটি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, রোনালদো কান্নার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ছিলেন এবং তা চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন।
ড. ভিঙ্গারহোটস বলেন, "যদি কান্নার মাপকাঠি হিসেবে কেবল তরল চোখের জল বের হওয়াকে ধরা হয়, তবে সিদ্ধান্ত হবে—তিনি কাঁদেননি। কিন্তু আবেগীয়ভাবে সংজ্ঞা দিলে, এটি নিশ্চিতভাবেই কান্না এবং তা দমনের এক লড়াই ছিল।"
বাজি যখন অর্থের লড়াই
সাধারণত খেলার বাজি হয় জয়-হার বা গোল নিয়ে। কিন্তু বর্তমানের প্রেডিকশন মার্কেটগুলো এমন সব বিষয়ে বাজি ধরার সুযোগ দিচ্ছে যা আগে ভাবাও যেত না। যেমন—২০২৬ সালের মধ্যে যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমন ঘটবে কি না, তা নিয়েও পলিমার্কেটে বাজি চলছে।
এর আগে সুপার বোলে র্যাপার কার্ডি বি 'পারফর্ম' করবেন কি না তা নিয়ে ৫ মিলিয়ন ডলারের বাজি হয়েছিল। তিনি কেবল গানের তালে নেচেছিলেন কিন্তু গান গাননি। 'পারফরম্যান্স' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নিয়ে সে সময় দুই বাজিকর প্ল্যাটফর্ম ভিন্ন ভিন্ন রায় দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাজারগুলো যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই এই ধরনের অস্পষ্ট পরিস্থিতি এবং বাজিকরদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে। কারণ এখানে অর্থের অংক বিশাল, আর প্রমাণের ভিত্তি কেবল স্রেফ দৃষ্টিভঙ্গি।
