বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই, তবুও এখনও যেভাবে সেই আগের মতোই অদম্য মেসি
লিওনেল স্কালোনি যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না কোন দিকে তাকাবেন। অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের ডাগআউটে আর্জেন্টিনার কোচ তখন প্রবল আবেগাপ্লুত। মাঠের ডিজিটাল বোর্ডে মেসির নম্বর উঠেছে, তাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। মেসি যখন ধীরপায়ে তার দিকে আসছিলেন, আলজেরিয়ার বিপক্ষে দল ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকলেও স্কালোনি নিজেকে শান্ত রাখার এক ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন।
এই মুহূর্তটি চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনছিল। স্কালোনির তৎকালীন সহকারী পাবলো আইমার—যাকে মেসি ছোটবেলায় নিজের আদর্শ মানতেন—আবেগে সিটে লুটিয়ে পড়েছিলেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে মেসির সেই গোলের পর আইমার অঝোরে কেঁদেছিলেন, যে গোলটি ৪ কোটি ৬০ লাখ আর্জেন্টাইনকে এক অসহ্য মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিল।
কানসাস সিটিতে আজ রাতেও স্কালোনি নিজের আবেগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তিনি মেসিকে বুকে টেনে নিলেন, কানে কানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল, যা সামাল দিতে তিনি বারবার চোখের পলক ফেলছিলেন।
স্কালোনি বলেন, 'এটি ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন। আমরা তাকে প্রতিদিন দেখছি, তাও সে আমাদের অবাক করে দেয়। গত ২০ বছর ধরে সে-ই সেরা। সে প্রতিটি ম্যাচে এখনও জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখায়। ৩৮ বছর বয়সে সে যা করছে, সেটিকে সম্মান জানানোর জন্য আপনাকে কেবল আর্জেন্টিনার সমর্থক হতে হবে না।'
এদিকে ধারাভাষ্য কক্ষে মেসির সাবেক সতীর্থ কার্লোস তেভেজ এবং সার্জিও আগুয়েরো তাকে কুর্নিশ জানাতে শুরু করেন। দেশের হয়ে নিজের ২০০তম ম্যাচেও মেসি নতুন সব ফুটবলীয় জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার মিশন তিনি শুরু করন নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক দিয়ে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই বয়সেও সেই 'দশ নম্বর' জার্সিধারীকে আগের মতোই ক্ষুরধার দেখাচ্ছিল। প্রশংসা শুনে হেসেই মেসি বললেন, 'আমি আসলেও খুব ভালো বোধ করছি।'
১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর আজ অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন মেসি। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন তিনি।
মেসির এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও রীতিমতো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো সেদিন সব আলো আর সংবাদপত্রের শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিলেন সেই মেসিই। আজ ইরাকের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে মেসির চেয়ে ৪ গোল ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন এমবাপ্পে। সেটাকে মাত্র ২ গোলে নামিয়ে আনার পর ১৬ গোল নিয়ে জার্মানির মিরস্লাভ ক্লোসার সাথে যৌথভাবে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন তিনি।
অন্যদিকে, ইরাকের বিপক্ষে নিজেও দুটি গোল করেছেন হালের ফুটবল তারকা আর্লিং হলান্ড। উত্তর ক্যারোলাইনার গ্রিনসবোরোতে নরওয়ের অনুশীলন ক্যাম্পে ফেরার জন্য বিমানে ওঠার সময় ইনস্টাগ্রামে একটি সেলফি পোস্ট করেন তিনি। সেখানে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে হালান্ড লিখেছেন, 'মেসি তো একটা ম্যাডম্যান!'
মেসির সাবেক সতীর্থ জাভি দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, 'লিওকে দেখলে মনেই হয় না তার মাঝে কোনো পরিবর্তন এসেছে। শারীরিকভাবে সে আগের মতোই ফিট। তার পায়ের কাজ দেখুন—সেই ছোট ছোট দ্রুত পদক্ষেপ: টাস, টাস, টাস। এটা কীভাবে সম্ভব?'
স্বয়ং স্কালোনিও এর কোনো উত্তর খুঁজে পান না। আলজেরিয়া ম্যাচের পর তিনি মেসির সহজাত সাবলীলতা নিয়ে কথা বলছিলেন। স্কালোনি বলেন, 'সে যা করে তা ব্যাখ্যা করতে আমি এখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটিয়ে দিতে পারি। কিন্তু সেই পরিবেশ এবং আবহটা বুঝতে হলে আপনাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। এটি ভাষায় প্রকাশ করা আসলেও কঠিন।'
কিন্তু কীভাবে তিনি এটা করে চলেছেন—এবং বছরের পর বছর ধরে একইভাবে নিজের ছন্দ ধরে রেখেছেন?
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মেসির জন্য এটি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ—যা একটি অনন্য রেকর্ড। এই বিশ্বকাপে তার অংশগ্রহণ যেমন প্রত্যাশিত ছিল, তেমনি ছিল সংশয়ও। তিনি আগে থেকে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি, বরং সবাইকে এক ধরণের দোটানায় রেখেছিলেন। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগের আন্তর্জাতিক বিরতিতেও (মার্চ মাসে) স্কালোনি দাবি করেছিলেন, মেসির পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।
সে সময় স্কালোনি বলেছিলেন, 'ওকে দলে রাখার জন্য আমি সব ধরণের চেষ্টা করব। ফুটবলের স্বার্থেই ওর থাকা প্রয়োজন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক আমি নই। এটি নির্ভর করছে ওর নিজের ইচ্ছা, মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক ফিটনেসের ওপর।'
মেসির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য অ্যাথলেটিককে জানিয়েছে, এই বিশ্বকাপে খেলাটা মেসির কাছে মোটেও নিশ্চিত কোনো বিষয় ছিল না। ২০২২ সালের ফাইনালের আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'এই ফাইনাল খেলে আমার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করতে পেরে আমি গর্বিত। আমি যা অনুভব করছি তা রোমাঞ্চকর। রবিবারই হবে বিশ্বকাপে আমার শেষ ম্যাচ।'
লুসাইল স্টেডিয়ামে ট্রফি তোলার আগে কাতারের আমির যখন মেসিকে 'বিশত' (আরবীয় রাজকীয় পোশাক) পরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন মেসি নিজেও ভেবেছিলেন এটাই শেষ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর বিশ্বকাপকে অনেক দূরের পথ মনে হয়েছিল।
সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও, এবারের বিশ্বকাপ যত কাছে আসছিল, মেসি অনুভব করেছিলেন যে তাকে নিজের কাছেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি এখনও আর্জেন্টিনার জন্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।
তার চারপাশের মানুষজন এই সংশয়ে অবাক হতেন। তাদের মতে, মেসি কেবল খেলার জন্য যোগ্যই নন, বরং তিনি এখনও আর্জেন্টিনার এবং এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়। জাভি বলেন, '২০২২ সালে জেতার পর অন্য যে কেউ অবসর নিয়ে নিত। কিন্তু মেসি জন্মগতভাবেই এক লড়াকু যোদ্ধা।'
মেসির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কেবল সুনামের জোরে নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে দলে ডাক পাওয়া। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে যখন তিনি ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, তখন মনে হয়েছিল তিনি মূলত আসন্ন বিশ্বকাপের জন্য আমেরিকার বাজারের পরিবেশটা আগেভাগেই বুঝে নিচ্ছেন। তাত্ত্বিকভাবে, এমএলএস-এ খেলা মেসিকে আমেরিকার বিশেষ কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে অনেকে আবার ভেবেছিলেন, এমএলএস-এর ধকল তাকে ক্লান্ত করে দিতে পারে।
এমএলএস-এর মান নিয়ে যে যার ভিন্ন মত থাকতে পারে, তবে অতীতে দেখা গেছে এই লিগ অনেক বয়স্ক তারকার ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছে। উদাহরণ হিসেবে লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সিতে স্টিভেন জেরার্ডের সময়ের কথা বলা যায়। জেরার্ড ২০১৫ সালে বলেছিলেন, 'কৃত্রিম ঘাস (টার্ফ), উচ্চতা এবং আর্দ্রতার সাথে মানিয়ে নেওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।'
ঠিক এক বছর আগে, যখন ক্লাব বিশ্বকাপ শুরু হয়, তখন ইন্টার মায়ামিতে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেসি কি তার বন্ধু আনহেল ডি মারিয়ার মতো শৈশবের ক্লাবে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন?
ডি মারিয়া যখন বেনফিকা ছেড়ে শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে যোগ দেন, তখন মেসির মনেও তেমন ভাবনার উদয় হয়েছিল। তিনি কি তার নিজের শহর রোজারিওর ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলবেন? সম্মান জানিয়ে গত বছরের জুনে তার ৩৮তম জন্মদিনে নিউয়েলস একটি গ্যালারি স্ট্যান্ডের নামকরণও করেছিল তার নামে।
মেসি অবশ্য বরাবরের মতোই সবাইকে অপেক্ষায় রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ইন্টার মায়ামির সাথে নতুন করে তিন বছরের চুক্তি সই করেন। ক্লাবের নতুন নিজস্ব স্টেডিয়াম মিয়ামি ফ্রিডম পার্ক যখন নির্মাণাধীন ছিল, তখনই সেই সাইটের মাঝখানে বসেই তিনি চুক্তিতে সই করেছিলেন।
গত এপ্রিলে যখন স্টেডিয়ামটি উন্মুক্ত করা হয়, ইন্টার মায়ামির নতুন ঘরের মাঠে প্রথম গোলটি কে পাবেন—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মেসি ছিলেন তার সেরা ফর্মে। গত বছরের শেষে তিনি এমএলএস কাপ জেতেন এবং এমভিপি ও গোল্ডেন বুট জয় করেন। এমনকি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তিনি দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা (৮ গোল) হন। নিজের মনের ভেতর মেসি সম্ভবত সেই উত্তরটি খুঁজে পেয়েছিলেন যা তিনি খুঁজছিলেন—তিনি এখনও ফুরিয়ে যাননি।
মেসির সতীর্থরা তার এই পারফরম্যান্সে মোটেও অবাক হননি। রদ্রিগো ডি পল গত গ্রীষ্মে মেসির পথ অনুসরণ করেই ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর যে ডি পল মাঠে মেসির 'বডিগার্ড' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলটির যোগানদাতা ছিলেন তিনিই। ডি পল জানান, 'গত দুই-তিন মাস ধরে ক্লাবের অনুশীলনের বাইরেও আমাদের আলাদা একটি ট্রেনিং প্ল্যান ছিল। আমরা নিজেদের সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত পরিশ্রম করছি যাতে শারীরিকভাবে সেরা অবস্থায় থাকতে পারি। আমরা ট্রেইনারের সাথে দিনে দুই বেলা কঠোর অনুশীলন করেছি।'
ডি পল এই প্রস্তুতির ওপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মেসি তাতে রাজি হননি। মেসি কৌতুক করে বলতেন, 'আরে থামো তো, কেন আমাকে সারাক্ষণ ক্যামেরায় বন্দি করছ?' ডি পল হেসে জবাব দিতেন, 'আরে মিয়া, এটা মুক্তি পেলে আমরা তো কিছু টাকা কামাতে পারব!' ডি পলের ধারণা ভুল ছিল না, ভক্তরা নিশ্চিতভাবেই এমন দৃশ্য দেখার জন্য মুখিয়ে থাকত।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ডায়েট বা ঘুমের রুটিন নিয়ে অনেক চর্চা হলেও মেসির জীবনযাত্রা সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে। এক দশক আগে মেসি তার খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। মাঠে হঠাৎ বমি হওয়ার সমস্যা দূর করতে তিনি উত্তর ইতালির বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জিউলিয়ানো পোজারের শরণাপন্ন হন। মেসি আট বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'আমি বহু বছর ধরে খুব আজেবাজে খাবার খেয়েছি—চকলেট, কোমল পানীয় এবং আরও অনেক কিছু। এ কারণেই মাঠের ভেতর আমার বমি হতো। এখন আমি নিজের অনেক যত্ন নিই। এখন আমার খাদ্যতালিকায় থাকে মাছ, মাংস আর সালাদ। সবকিছুই এখন গোছানো।'
ইন্টার মায়ামিতে ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসির শরীরকে চনমনে রাখতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখা হয়নি। আর্জেন্টিনার ফিজিও ওয়াল্টার ইনসাউরালদে তার সাথেই মিয়ামিতে কাজ করেন। ফোর্ট লডারডেলের অনুশীলন কেন্দ্রটি প্রতি বছর আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সেখানে মেসি নিয়মিত স্প্রিন্ট ড্রিল এবং শক্তির ব্যায়াম করেছেন। গত মে মাসে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ধারাভাষ্যকার মন্তব্য করেছিলেন, 'গত এক মাসে মেসির খেলার গতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।'
তবে মেসির কাছে সবকিছুই স্রেফ ফুটবল। গত বসন্তে ইন্টার মায়ামির কোচ গুইলারমো হোয়োস 'সুপার লিগা' নামে ক্লাবের ভেতরে একটি টুর্নামেন্ট চালু করেন। পুরো স্কোয়াডকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে এই প্রতিযোগিতা হতো। টুর্নামেন্ট শেষে দেখা যায়, মেসির দল কেবল চ্যাম্পিয়নই হয়নি, তার পরিসংখ্যান ছিল মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। পুরো টুর্নামেন্টে মেসি একাই ৮০টিরও বেশি গোল করেন, যেখানে অন্য কোনো খেলোয়াড় ৩০টির বেশি গোল করতে পারেননি। মেসি কিন্তু নিজের দলে সব তারকাদের টেনে নেননি। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হেসে বলছিলেন, 'বিষয়টি ছিল আসলেও অবিশ্বাস্য।'
বিশ্বকাপের বিরতিতে যাওয়ার আগে মেসির এই ফর্ম ইন্টার মায়ামির মূল ম্যাচেও বজায় ছিল। শেষ পাঁচ ম্যাচে তিনি ১২টি গোলে (৫ গোল ও ৭ অ্যাসিস্ট) অবদান রাখেন। পুরো মৌসুমের এই কঠোর পরিশ্রমের ফল তিনি হাতেনাতে পাচ্ছিলেন। তাই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ার পর তাকে এতটাই চিন্তিত দেখাচ্ছিল।
মেসিকে যারা চেনেন, তারা লক্ষ্য করেছেন যে চোট পাওয়ার পর তিনি বেঞ্চে না বসে সরাসরি টানেল দিয়ে ভেতরে চলে যান। চোটের সময়টা আসলেও খুব খারাপ ছিল। বিশ্বকাপের ঠিক আগে নেইমার এবং লামিন ইয়ামালও চোটে পড়েছিলেন। সবাই ভাবছিল—মেসিকে কি আর দেখা যাবে? ফিরলেও কি তিনি নিজের শতভাগ দিতে পারবেন?
সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মেসি বিশ্বকাপে যোগ দেন। নিজের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ওপর তার পূর্ণ আস্থা ছিল। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে গ্যালারিতে থাকা ৯০ হাজার দর্শকের সামনে যখন তিনি শেষ ২০ মিনিটে মাঠে নামলেন, মুহূর্তেই খেলার মোড় বদলে গেল। মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি লাউতারো মার্টিনেজকে লক্ষ্য করে এমন এক পাস দিলেন যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে চিরে ফেলে। গোলরক্ষক লাউতারোকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা এবং মেসি তা থেকে গোল করেন।
আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে একটি ম্যাচই খেলেছে, কিন্তু মেসি মাঠের পরিস্থিতিকে সেই 'সুপার লিগা'র মতোই সহজ বানিয়ে ফেলেছেন। সমসাময়িক রোনালদোর মতো মেসি তাঁর দলের জন্য বোঝা নন, বরং আস্থার প্রতীক। কোচ স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এখন একটি পরিবারের মতো। কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জেতার পর মেসি যার সাথে দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গন করেছিলেন, অনেকে তাকে মেসির মা ভেবে ভুল করেছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন দলের প্রধান রাঁধুনি আন্তোনিয়া ফারিয়াস।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা লিয়েন্ড্রো পিটারসেন জানান, আধুনিক ফুটবলে তারা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, '১৩ বছর বয়স থেকে শুরু করে একজন সিনিয়র খেলোয়াড় পর্যন্ত আমরা সবার ইতিহাস ট্র্যাক করতে পারি। কে কত মিনিট খেলছে, কার কী চোট ছিল, কার খাদ্যাভ্যাস কেমন—সব তথ্য আমাদের কাছে থাকে। মেসির ক্ষেত্রেও আমরা এই ডাটা ব্যবহার করেছি। বয়সের ভার এবং চোট কাটিয়ে এক সপ্তাহ অনুশীলন না করেও তিনি প্রথম ম্যাচেই যে অসাধারণ ফুটবল খেলেছেন, তা আমাদের অবাক করেছে।'
আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর মেসির সতীর্থরা বলছিলেন, পিচ্চি মানুষটার তেজ দেখেছ! সে কতটা মরিয়া খেলার জন্য!' স্কালোনি বলেন, 'সবাই তাকে ঈশ্বর হিসেবে দেখে, আবার পাড়ার সাধারণ বন্ধুর মতোও মনে করে।'
২০৩০ বিশ্বকাপ হবে স্পেন, পর্তুগাল এবং মরক্কোতে। তবে টুর্নামেন্টের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনার এস্তাদিও মনুমেন্টালে। মেসি যদি এই ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, তবে কে বলতে পারে চার বছর পর তিনি সেখানে থাকবেন না!
চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এক ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন, 'নিশ্চিতভাবেই এটিই লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।'
অথচ দেখুন, মেসি এখনও আছেন। আগের মতোই উজ্জ্বল এবং অবিশ্বাস্য ফর্মে।
অনুবাদ: তাসবিবুল গনি নিলয়
