বুড়ো সিংহ, ভগ্ন হৃদয় ম্যারাডোনা, ট্র্যাজেডি আর মূর্তির মুকুট
মরুভূমির বুকে মেসির মুকুট
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ফুটবল ইতিহাসের অনেকগুলো 'প্রথম'-এর জীবন্ত সাক্ষী—এই প্রথম কোনো রক্ষণশীল আরব দেশে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলো। প্রথমবার মধ্যপ্রাচ্যের চড়া গরমের হাত থেকে বাঁচতে জুন-জুলাইয়ের প্রথা ভেঙে নভেম্বর-ডিসেম্বরের শীতকালে খেলা হলো। পুরো টুর্নামেন্টের ৮টি স্টেডিয়ামই ছিল অত্যাধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ও কাছাকাছি দূরত্বের। তবে এই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে লিওনেল মেসির সেই বহু প্রতীক্ষিত মহাকাব্যিক সমাপ্তির জন্য।
১৮ ডিসেম্বর ২০২২, দোহার লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা আর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, যা ছিল ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা, রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। আর্জেন্টিনার মেসি আর আনহেল দি মারিয়ার দুর্দান্ত দুটি গোলে প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় লাতিন আমেরিকার দলটি। খেলা যখন প্রায় শেষের পথে এবং কাপ যখন আর্জেন্টিনার পকেটে, ঠিক তখনই ঘটে এক মহাজাগতিক ওলটপালট। ৮০ এবং ৮১ মিনিটে—মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের এক অবিশ্বাস্য ব্যবধানে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই দুই গোল করে ম্যাচ সমতায় নিয়ে এলেন। পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গেল।
খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ১০৮ মিনিটে মেসির এক ক্লোজ-রেঞ্জ গোলে আর্জেন্টিনা আবার ৩-২-এ এগিয়ে গেলে, ১১৮ মিনিটে এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং স্কোর ৩-৩ করেন। ম্যাচের ঠিক শেষ মুহূর্তে, ১২৩ মিনিটের মাথায় ফ্রান্সের কোলো মুয়ানির এক নিশ্চিত গোল আর্জেন্টিনার কিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ নিজের বাঁ পা অলৌকিকভাবে প্রসারিত করে বাঁচিয়ে দেন, যা ফুটবল ইতিহাসের সেরা সেভ।
পেনাল্টি শুট-আউটে মার্তিনেজের সেই মনস্তাত্ত্বিক বীরত্ব আর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের নিখুঁত শটের ওপর ভর করে আর্জেন্টিনা ৪-২ ব্যবধানে জিতে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্রফি ছুঁতে পারলেন না।
অন্যদিকে লিওনেল মেসি কাতারের আমিরের হাত থেকে কালো রঙের রাজকীয় ও ঐতিহ্যবাহী 'বিশ্ত' নামের পোশাকটি পরে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। এর মাধ্যমে তিনি ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘদিনের সব বিতর্কের চিরতরে অবসান ঘটিয়ে 'সর্বকালের সর্বসেরা' বা গ্রেটেস্ট অব অল টাইম সংক্ষেপে গোট হিসেবে ফুটবলের মূর্তির মুকুট মাথায় পরলেন।
এখানে গোট মানে কোনো সাধারণ ছাগল নয়, বরং কোনো একটি নির্দিষ্ট খেলায় ইতিহাসের বুকে নিজের দক্ষতা, ট্রফি এবং জনপ্রিয়তায় যিনি বাকি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন—তাঁকে বোঝাতেই এই বিশেষ তকমা দেওয়া হয়। যেমন আধুনিক ফুটবলে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে ভক্তদের মাঝে প্রতিনিয়ত লড়াই চলে—আসল 'GOAT' কে!
শব্দটির পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস: আমেরিকার কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী নিজেকে বলতেন 'The Greatest'। পরে তাঁর স্ত্রী লনি আলী ১৯৯০-এর দশকে স্বামীর লাইসেন্স ও সম্পত্তি দেখভালের জন্য 'G.O.A.T. Inc.' নামে একটি কোম্পানি গঠন করেন। সেখান থেকেই মূলত এই সংক্ষিপ্ত রূপ বা অ্যাক্রোনিমটির উৎপত্তি।
পরে ২০০০ সালের দিকে আমেরিকান হিপ-হপ শিল্পী এলএল কুল জে তাঁর একটি অ্যালবামের নাম 'G.O.A.T' রাখার পর এটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পপুলারিটি পায় এবং খেলাধুলার জগতে নিয়মিত ব্যবহার শুরু হয়।
ক্যামেরুনের বুড়ো সিংহ আর ভাঙা হৃদয়ের ম্যারাডোনা
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ ছিল অতিমাত্রায় নেতিবাচক, ডিফেন্সিভ এবং বোরিং ফুটবলের জন্য কুখ্যাত। সেবারের প্রতি ম্যাচে গোলের গড় ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বনিম্ন। লাল কার্ড আর ফাউলের ছড়াছড়ির এই অন্ধকার আসরেও আফ্রিকার আলো হয়ে ছড়ালেন ৩৮ বছরের এক বুড়ো স্ট্রাইকার—ক্যামেরুনের রজার মিলা।
রজার মিলা তত দিনে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে ভারত মহাসাগরের এক শান্ত দ্বীপে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ফোন করে তাঁকে জাতীয় স্বার্থে দলে ফেরার অনুরোধ জানালে তিনি না করতে পারেননি। মিলা এই টুর্নামেন্টে মূল একাদশে খেলেননি, তিনি সুপার-সাব হিসেবে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে একের পর এক দুর্দান্ত গোল করতে লাগলেন। গোল করার পর কর্নার পতাকার কাছে ছুটে গিয়ে কোমর দুলিয়ে তাঁর সেই ঐতিহ্যবাহী 'মাকোসা' নাচ পুরো দুনিয়ার দর্শকদের মন কেড়ে নিয়েছিল।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে এই কীর্তি গড়েছিলেন ক্যামেরুনের কিংবদন্তি ফুটবলার রজার মিলা। রোমানিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর করা জোড়া গোল এবং কলম্বিয়ার গোলকিপার রেনে হিগুইতার কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোল করার দৃশ্যগুলো ছিল দেখার মতো। রজার মিলার এমন জাদুকরি পারফরম্যান্সে ভর করেই ক্যামেরুন প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ে।
অন্যদিকে ফাইনালে আবার মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা আর পশ্চিম জার্মানি। ইতালির নেপলস স্টেডিয়ামে যখন ফাইনাল ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল, তখন গ্যালারিতে থাকা ইতালির দর্শকেরা ম্যারাডোনাকে সমস্বরে দুয়ো দিচ্ছিলেন। এর কারণ ছিল, সেমিফাইনালে এই নেপলসের মাঠেই ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা স্বাগতিক ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছিল। ম্যারাডোনা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ইতালিয়ান দর্শকদের উদ্দেশ্যে কটু কথা বলছিলেন।
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা রক্ষণাত্মক খেললেও ম্যাচের ৮৫ মিনিটে জার্মানি এক অত্যন্ত বিতর্কিত পেনাল্টি পায়। রুডি ফোলারকে বক্সের ভেতর ফাউল করার অপরাধে মেক্সিকান রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তবে আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের নিখুঁত স্পট-কিকে জার্মানি ১-০ গোলে জিতে আগের বিশ্বকাপের মধুর প্রতিশোধ নেয়। ম্যাচ শেষে রানার্সআপ মেডেল গলায় নিয়ে ম্যারাডোনার সেই শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদার দৃশ্য এবং ট্রফি ছুঁতে না পারার বেদনা আজও ফুটবল ভক্তদের বুকে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
এসকোবারের লাশ আর বাজ্জিওর আকাশছোঁয়া কান্না
ফুটবলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় করার এক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফিফা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে গেল সকারবিমুখ দেশ আমেরিকায়। স্টেডিয়ামগুলো ছিল আমেরিকার বিখ্যাত এনএফএল খেলার ময়দান। আকৃতিতে বিশাল এবং আধুনিক। কিন্তু এই রঙিন, রোদঝলমলে বিশ্বকাপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ানক সামাজিক ও মানবিক ট্র্যাজেডি।
গ্রুপপর্বের ম্যাচে স্বাগতিক আমেরিকার মুখোমুখি হয়েছিল অন্ধকার মাদক মাফিয়াদের দেশ কলম্বিয়া, যারা সেই সময় ফুটবল দুনিয়ার অন্যতম ফেবারিট ছিল। ম্যাচের একপর্যায়ে আমেরিকার একটি সাধারণ ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার স্লাইড করেন এবং বলটি দুর্ভাগ্যবশত নিজেদের জালেই ঢুকে যায়, আত্মঘাতী গোল। কলম্বিয়া ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
সেই সময় কলম্বিয়াতে চলছে কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেল বা মাদক মাফিয়াদের রাজত্ব। এই আত্মঘাতী গোলের সুবাদে মাফিয়ারা আন্তর্জাতিক জুয়া বাজারে কোটি কোটি টাকা হেরেছিল। বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার মাত্র ১০ দিন পর, মেদেলিন শহরের এক নাইটক্লাবের বাইরে এসকোবারকে ঘিরে ধরে মাফিয়ারা। ঘাতক হুমবার্তো কাস্ত্রো এসকোবারকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ছয়টি গুলি করে এবং প্রতিটি গুলির পর দক্ষিণ আমেরিকার টিভিকমেন্টেটরের মতো করে বিকট চিৎকারে বলছিল—'গোল!' মাত্র ২৭ বছর বয়সে এক অনিচ্ছাকৃত আত্মঘাতী গোলের মাশুল এসকোবারকে নিজের তাজা জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল।
এই ট্র্যাজেডির পর ফাইনালের মঞ্চে মুখোমুখি হলো লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল আর ইউরোপের ইতালি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের তীব্র লড়াই শেষেও ম্যাচ গোলশূন্য থাকায় বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার ফাইনালের ফয়সালা হতে চলল পেনাল্টি শুট-আউটের লটারিতে। ইতালির শেষ এবং ভাগ্যনির্ধারক পেনাল্টি শটটি নিতে এলেন তাদের পোস্টার বয় 'ডিভাইন পনিটেল'খ্যাত রবার্তো বাজ্জিও। পুরো টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বের প্রতিটা ম্যাচে গোল করে ইতালিকে একাই কাঁধে করে ফাইনালে তুলেছিলেন এই বাজ্জিও। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, বাজ্জিওর এই একটি পেনাল্টি শটের ওপরই তখন ঝুলছিল ইতালির ভাগ্য। তিনি যদি গোল করতে না পারেন, তবেই মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে ব্রাজিল।
বাজ্জিও শট নিলেন, কিন্তু তাঁর ডান পায়ের সেই শটটি গোলপোস্টের অনেক ওপর দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশে হারিয়ে গেল। ব্রাজিলের গোলকিপার ক্লাউডিও তাফারেল হাঁটু গেড়ে বসে আকাশের দিকে হাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন, আর বাজ্জিও কোমর বাঁকিয়ে, মাথা নিচু করে মাঠের সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে অনন্তকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর সেই নিঃসঙ্গ পিঠের ছবি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও ট্রফির এত কাছে গিয়েও পরাজয়, বিদায়ের প্রতীক। ব্রাজিল দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে।
রোনালদোর রহস্যময় অসুখ আর জিদানের মাথা
১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করে এক বর্ণাঢ্য উৎসবের মাধ্যমে কাপ জিতল ফ্রান্স। এই টুর্নামেন্টের মূল আকর্ষণ ছিলেন ব্রাজিলের মাত্র ২৩ বছর বয়সী 'ফেনোমেনন'খ্যাত স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও, যিনি নিজের অতিমানবীয় গতি আর ড্রিবলিং দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে ৪ গোল আর ৩ অ্যাসিস্ট করে ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু ১২ জুলাই, ফাইনাল ম্যাচের দিন দুপুরে প্যারিসের হোটেল রুমে ঘটল এক রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর ঘটনা।
ফাইনাল খেলা শুরু হওয়ার মাত্র চার ঘণ্টা আগে হোটেল রুমে রোনালদো হঠাৎ খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান এবং তাঁর মুখ দিয়ে লালা বের হতে থাকে। তাঁর রুমমেট ও সতীর্থ রবার্তো কার্লোস ভয়ে চিৎকার করে ডাক্তার ডাকেন। রোনালদোকে তড়িঘড়ি করে প্যারিসের এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় নিউরোলজিক্যাল টেস্টের জন্য।
এদিকে স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের কাছে প্রথমে যে অফিশিয়াল টিম শিট প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে রোনালদোর নাম ছিল না, যা দেখে পুরো বিশ্ব মিডিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ম্যাচ শুরু হওয়ার মাত্র ৪৫ মিনিট আগে রোনালদো হাসপাতাল থেকে সরাসরি স্টেডিয়ামে এসে কোচ মারিও জাগালোকে সাফ জানিয়ে দেন, 'আমি ফাইনাল খেলব, আমাকে যদি মূল একাদশে না রাখা হয়, তবে আমি জোর করে মাঠে নেমে যাব।'
কোচ জাগালো স্পনসরদের চাপ এবং রোনালদোর জেদের কাছে নতিস্বীকার করে বাধ্য হয়ে তাঁকে মাঠে নামালেন। কিন্তু মাঠে রোনালদো ছিলেন স্রেফ এক ছায়া, জাদুমুক্ত এক সাধারণ খেলোয়াড়। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি কেবল ধুঁকছিলেন এবং ফরাসি ডিফেন্ডারদের কাছে বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন।
পাশাপাশি ফ্রান্সের আলজেরীয় বংশোদ্ভূত কিংবদন্তি মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদান প্রথমার্ধেই কর্নার থেকে আসা দুটি দুর্দান্ত ও নিখুঁত হেডের মাধ্যমে গোল করে ব্রাজিলকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন। শেষ মুহূর্তে এমানুয়েল পেতিত আরেকটি গোল করলে ফ্রান্স ৩-০ ব্যবধানে এক ঐতিহাসিক জয় নিয়ে প্রথমবার বিশ্বসেরা হয়। রোনালদোর সেই দুপুরের রহস্যময় খিঁচুনি এবং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়া আজও ফুটবল ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্য।
রোনালদোর পুনর্জন্ম আর অদ্ভুত চুল
এশিয়ার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলো ২০০২ সালে, যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানে। ১৯৯৮ সালের প্যারিস ফাইনালের সেই দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে রোনালদো নাজারিওর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ ছিল এই টুর্নামেন্ট। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে রোনালদোর হাঁটুতে দুটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং তিনি প্রায় দুই বছর ফুটবলের বাইরে ছিলেন। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর ক্যারিয়ার চিরতরে শেষ।
কিন্তু রোনালদো এই বিশ্বকাপে এক অদ্ভুত ও কিম্ভুতকিমাকার হেয়ারকাট নিয়ে হাজির হলেন—পুরো মাথা ন্যাড়া, শুধু কপালের ওপর সামান্য একটু চুল ত্রিভুজ বা অর্ধচন্দ্রাকৃতিতে রাখা। সারা বিশ্বের মানুষ তাঁর এই চুলের স্টাইল দেখে হাসাহাসি শুরু করে। টুর্নামেন্ট শেষে রোনালদো হেসে বলেছিলেন, 'আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এই বাজে হেয়ারকাটটা করেছিলাম, যাতে বিশ্ব মিডিয়া আমার পায়ের চোট বা হাঁটু নিয়ে সারাক্ষণ প্রশ্ন না করে আমার চুল নিয়ে মাথা ঘামায়!'
চুল নিয়ে চালবাজির এই মনস্তাত্ত্বিক তৎপরতা দারুণ কাজ করেছিল। রোনালদো কোনো মানসিক চাপ ছাড়াই পুরো টুর্নামেন্টে একাই ৮ গোল করলেন। ইয়োকোহামার ফাইনালে জার্মানির অপরাজেয় গোলকিপার অলিভার কানকে (যিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল পেয়েছিলেন) দুটি দর্শনীয় গোল দিয়ে ব্রাজিলকে ২-০ গোলে জয়ী করেন রোনালদো। ব্রাজিল তাদের ইতিহাসের পঞ্চম (পেন্টা) শিরোপা ঘরে তোলে। অন্যদিকে এই টুর্নামেন্টে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া রেফারিদের কিছু অত্যন্ত বিতর্কিত ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের সুবিধা নিয়ে পরাশক্তি ইতালি ও স্পেনকে নকআউট পর্বে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।
জিদানের শেষ লাল কার্ড
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা, তারকাবহুল এবং রোমাঞ্চকর এক টুর্নামেন্ট। জিনেদিন জিদান টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ঘোষণা করেছিলেন, এই বিশ্বকাপের পরই তিনি চিরদিনের জন্য বুটজোড়া তুলে রাখবেন, ফলে প্রতিটি ম্যাচ ছিল জিদানের এক একটি বিদায়ী উৎসব। নকআউট পর্বে স্পেনের বিরুদ্ধে গোল এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের রোনালদিনহো ও কাকাদের একাই মাঝমাঠে নাচিয়েছিলেন জিদান।
বার্লিনের ফাইনালে মুখোমুখি হলো ফ্রান্স আর ইতালি। ম্যাচের প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে পেনাল্টি উপহার দেন জিদান। তবে সাধারণ কোনো শট নয়, চতুর 'প্যানেঙ্কা চিপে' গোলকিপারকে পুরোপুরি বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান তিনি। তার এই জাদুকরি গোলেই এগিয়ে যায় ফ্রান্স। ১৯৭৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের আন্তোনিন প্যানেঙ্কা প্রথম এই ঐতিহাসিক শটটি নিয়েছিলেন, আর তার নামেই এর নামকরণ হয়। অবশ্য জিদানের গোলে সেই লিড বেশি সময় টেকেনি, কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে ইতালিকে সমতায় ফেরান তাদের ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি।
নির্ধারিত সময়ে খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১১০ মিনিটের মাথায় ঘটল সেই ঐতিহাসিক কাণ্ড। যা নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। বল যখন মাঠের অন্য প্রান্তে, ইতালির বক্সে মাতেরাজ্জি জিদানের জার্সি টেনে ধরে কিছু একটা কটু কথা বললেন। জিদান প্রথমে হেসে এগিয়ে গেলেও হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা তাঁর শক্ত মাথা দিয়ে মাতেরাজ্জির বুকে এক প্রচণ্ড ঢুস বা গুতা অর্থাৎ হেডবাট মারলেন। মাতেরাজ্জি মাঠে যেন কোনো নাটকের অভিনেতা, এমনভাবে আছাড় খেয়ে পড়লেন।
প্রধান রেফারি ঘটনাটি সরাসরি না দেখলেও ফোর্থ অফিশিয়াল ও লাইনসম্যানের চোখে বিষয়টি ধরা পড়ায় রেফারি হোরাসিও এলিজোন্দো জিদানকে সরাসরি লাল কার্ড দেখালেন। জিদান যখন মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে যাচ্ছিলেন, তাঁর পাশেই রাখা ছিল চকচকে সোনার আসল বিশ্বকাপ ট্রফিটি। ট্রফির গা ঘেঁষে জিদানের নিঃসঙ্গভাবে হেঁটে যাওয়ার সেই ক্লোজ-আপ শটটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক, নাটকীয় এবং দুঃখজনক বিদায়ের দৃশ্য। ইতালি পরবর্তী সময়ে পেনাল্টি শুট-আউটে ফ্রান্সকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
টিকিটাকা, বুভুজেলা আর ৭-১-এর মিনেইরাজো
২০১০ সালে বিশ্বকাপ প্রথমবার পা রাখল আফ্রিকার কৃষ্ণভূমিতে, দক্ষিণ আফ্রিকায়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দর্শকদের কানের পর্দা ফাটানোর জন্য তৈরি ছিল প্লাস্টিকের তৈরি এক বিশেষ আফ্রিকান বাঁশি—'বুভুজেলা', স্টেডিয়াম জুড়ে যার ভোঁ-ভোঁ আওয়াজে খেলোয়াড়দের মাঠে কথা বলাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এই বিশ্বকাপে স্পেনের 'টিকিটাকা' বা ছোট ছোট নিখুঁত পাস ও পজিশন ধরে রাখার ফুটবল কৌশল পুরো দুনিয়া জয় করল।
২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্ত। ঘানার একটি নিশ্চিত হেড যখন উরুগুয়ের জাল ছুঁতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গোললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে গোলকিপারের মতো দুই হাত দিয়ে বলটি আটকে দেন উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ। রেফারি সাথে সাথে তাকে লাল কার্ড দেখান এবং ঘানাকে পেনাল্টি দেন। পুরো বিশ্বের চোখে সুয়ারেজ তখন এক চরম 'ভিলেন', যার কারণে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে ঘানার সেমিফাইনালে যাওয়ার স্বপ্ন এক লহমায় স্তব্ধ হতে বসেছিল।
কিন্তু ফুটবল বিধাতা যেন অন্য এক নাটকের জন্ম দিতে চেয়েছিলেন। ঘানার তারকা আসামোয়াহ যখন পেনাল্টি শটটি ক্রসবারে মেরে মিস করলেন, তখন ড্রেসিংরুমের টানেলে দাঁড়িয়ে থাকা সুয়ারেজ কান্নার বদলে উল্লাসে ফেটে পড়েন। সুয়ারেজের ওই লাল কার্ডই মূলত উরুগুয়েকে নিশ্চিত পরাজয় থেকে বাঁচিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে উরুগুয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়, আর ঘানাকে কাঁদিয়ে সুয়ারেজ ভিলেন থেকে রাতারাতি উরুগুয়ের জাতীয় বীরে পরিণত হন।
যদিও ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে অতিরিক্ত সময়ের ১১৬ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার এক জাদুকরি গোলে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফিরল ফুটবলের আধ্যাত্মিক দেশ ব্রাজিলে। ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো ১৯৫০ সালের সেই মারাকানাজোর ঐতিহাসিক ক্ষত উপশম হবে। কিন্তু সেমিফাইনালে বেলো হরাইজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে জার্মানির মুখোমুখি হয়ে ব্রাজিল যা দেখল, তা মারাকানাজোর চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ংকর ও লজ্জাজনক। নেইমারহীন ও ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভাহীন ব্রাজিলকে জার্মানরা ম্যাচের প্রথম ২৯ মিনিটের মধ্যেই এক অবিশ্বাস্য তাণ্ডবে ৫ গোল দিয়ে বসল! গ্যালারিতে ব্রাজিলের বুড়ো থেকে শিশু—সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত জার্মানি জিতল ৭-১ ব্যবধানে, যা ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে 'মিনেইরাজো' বা মিনেইরাওয়ের ট্র্যাজেডি নামে চিরদিনের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছে। জার্মান স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসা ব্রাজিলের মাটিতেই পেলের সামনে রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের মালিক হন। ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের ১১৩ মিনিটে মারিও গোটশের এক দর্শনীয় গোলে হারিয়ে জার্মানি চতুর্থবার কাপ জেতে।
২০১৮ সালে রাশিয়ার মাটিতে বিশ্ব ফুটবল দেখল এক নতুন ও গতিময় ফ্রান্সের রাজকীয় উত্থান। মাত্র ১৯ বছর বয়সী কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের চিতা বাঘের মতো গতি আর ড্রিবলিং দিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ধ্বংস করেন। ১৯৫৮ সালের পেলের পর দ্বিতীয় টিনএজার বা কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার কীর্তি গড়লেন। ফাইনালে লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল রূপকথার অভিযানকে থামিয়ে দেয় ফ্রান্স। ৪-২ ব্যবধানে জিতে তারা ঘরে তোলে ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।