শিশুহত্যা: কাঁদছেন সন্তানহারা স্বজনরা, কিন্তু রাষ্ট্র নির্বিকার
ছোট্ট মিমের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হলো গ্রামের একটা ঝোপ থেকে। শিশু ইসমাইলের বস্তাবন্দি পচা লাশ ভেসে উঠলো খালে। মাদ্রাসাছাত্র নাঈমের মরদেহ পাওয়া গেল ধানক্ষেত সংলগ্ন রাস্তা থেকে। এরা সবাই প্রথমে নিখোঁজ হয়েছিল, দুইদিন পর তাদের লাশ পাওয়া গেছে ঝোপঝাড়ে, পুকুরে।
ফুটফুটে এই শিশুগুলোকে হত্যা করা হয়েছে হয়তো একই দিনে, তবে বিভিন্ন জেলায়। কে, কীভাবে, কেন বাচ্চাগুলোকে হত্যা করে তাদের এখানে-সেখানে ফেলে রেখেছে, এর উত্তর পাওয়া যায় না। আর উত্তর পাওয়া গেলেও কোনো লাভ হয় না। কারণ এই সন্তানেরা আর মায়ের বুকে ফিরে আসে না। প্রায় সময় অপরাধী চিহ্নিত হয় না এবং অপরাধী ধরা পড়লেও বিচার হয় না।
চঞ্চল, হাসিখুশি আর টইটই করে ছুটে বেড়ানো বাচ্চাগুলো যখন হঠাৎ করে নাই হয়ে যায়, তখন সবাই প্রথমে চিন্তায় পড়ে যে কোথায় গেল তাদের সন্তান। আশপাশের সবাই মা-বাবাকে সান্তনা দেয়, হয়তো কোথাও খেলতে গেছে, চলে আসবে।
কিন্তু পরিবারের প্রাণ আর ফিরে আসে না। বেলা যায়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল থেকে রাত হয়ে যায়। কোথাও ওদের পাওয়া যায় না। তন্ন তন্ন করে খুঁজে সবাই, কোথাও নেই তারা। থাকবে কীভাবে, বাচ্চাগুলো যে মৃত মানুষ হয়ে গেছে।
শুধু মিম, ইসমাইল ও নাঈম নয়, জানুয়ারি-আগস্ট এই ৮ মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬টি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এইসময়ে মোট ২৫৪ শিশু নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। বিভিন্নকারণে এদের হত্যা করা হয়েছে। (সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র)
এইভাবে শিশু হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র কি বালিতে মুখ গুঁজে আছে? কিছুই দেখতে বা শুনতে পারছে না? নিশ্চয়ই তাই, নতুবা এত শিশু হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও রাষ্ট্রের কোনো হেলদোল নেই কেন? কেন বিচারব্যবস্থা কেঁপে উঠছে না?
একজন মা হিসেবে, আরো অসংখ্য মা-বাবার পক্ষ থেকে এই কষ্টতো মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। সন্তান হারানোর বেদনা, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর ও কষ্টদায়ক বেদনা। কোনো কিছু দিয়েই এই ভার লাঘব হওয়ার নয়।
প্রসঙ্গক্রমে একটা ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বলছি, খুব কাছের একজন মানুষ যখন মা হলো, তখনও আমি মা হয়নি। দু'দিন পর বাচ্চটি মারা গেল। সন্তান হারানোর কষ্ট চোখে দেখেছি, অনুভব করেছি। ওর পাশে বসে থেকে কেঁদেছি, সান্তনা দিয়েছি। ভেবেছিলাম আমি আমার পুরো অনুভূতি দিয়ে ওর কষ্টটা বুঝতে পারছি, ওর পাশে থাকতে পারছি।
কিন্তু না, আমার এই ধারণা পুরো ভুল প্রমাণিত হলো, এর কয়েকবছর পরে যেদিন আমি মা হলাম, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যখন, আমার সদ্যোজাত সন্তানের মুখটি প্রথম দেখলাম, ঠিক সেই মুহূর্তেই কেন জানিনা আমার সেই প্রিয় মানুষটার সন্তান হারানোর কথাটি মনে হলো।
এতদিন পরে বুঝলাম ওর কোলের শিশুটি কোল ছেড়ে হারিয়ে যাওয়ায় কতটা কষ্ট হয়েছিল। মা হওয়ার পর সমানুভূতি দিয়ে বুঝেছি, সন্তান হারানোর কষ্টটা ঠিক কী হতে পারে। আর সেদিন যেটা বুঝেছিলাম সেটা শুধু প্রিয়জনের প্রতি মায়া থেকে বুঝেছিলাম, মা হয়ে নয়। উপলব্ধি করলাম ঠিক একই অবস্থায় না পৌঁছুলে মানুষ মানুষের প্রকৃত কষ্ট বুঝতে পারে না, ধারণা করতে পারে।
এরপর থেকে কারো সন্তানের মৃত্যু, ধর্ষণ, নির্যাতন, অপহরণ ও আত্মহত্যার কথা শুনলে, হারিয়ে বা বিপথে যাওয়ার ঘটনায় খুব কষ্ট হয়। কিছুই হয়তো করতে পারিনা কিন্তু বুকটা ছিঁড়ে যেতে থাকে। এই কিছু করতে না পারার কষ্টটা মানুষকে আরো আহত করে। অনিরাপদ পরিবেশে শিশুকে পথের পাশে ভিক্ষা করতে দেখলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিজ সন্তানের মুখ।
দিনের পর দিন দেখছি শিশু-কিশোর খুন হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, আহত হচ্ছে, নিখোঁজ হচ্ছে। বিচারহীনতার কারণে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। আর এই আগুনের উপর বসে, আমরা অবুঝের মত ভেবেই চলেছি 'আমার সন্তান যেন থাকে নিরাপদে'।
শিশু খুন হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, মা-বাবা কাঁদছেন, বিচার চাইছেন, প্রতিবাদ হচ্ছে, সামাজিকমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বক্তব্য দিয়ে বিচারের আশ্বাস দিচ্ছেন, গণমাধ্যমে নিউজ হচ্ছে, ভিডিও'র ভিউ বাড়ছে: কিন্তু অপরাধী কি ধরা পড়ছে, তার বিচার কি হচ্ছে?
নিহত, আহত ও নিখোঁজ শিশুগুলো কারো কারো না সন্তান। এরা আমাদের যে কারো সন্তান হতে পারতো। সন্তানের কোনো ক্ষতি হলে আমাদের সবাইকে ভুক্তভোগী মা-বাবার মতোই কাঁদতে হবে। বিচারের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে আর কর্তৃপক্ষের আশ্বাস শুনতে হবে।
অনেককিছুর পরেও মা-বাবা তাদের সন্তানদের ফিরে পান না। যাদের জন্য তারা সন্তান হারিয়েছেন বা হারাবেন, তাদের কোনো বিচার হয়না। সন্তান হত্যার দায়ে অপরাধীকে শাস্তি পেতে দেখেন না, অধিকাংশ মা-বাবা। কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য, কিন্তু এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে আমাদের সামনে।
সারাদেশের মানুষ সন্তান হারানোর শংকা বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বুঝতে পারছেন না কীভাবে সন্তানের চারপাশে চক্রব্যুহ তৈরি করে দেবেন। রাষ্ট্র কি বুঝতে পারছে, একটি শিশুকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা মানে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া নয়; এর অর্থ রাষ্ট্র ও সমাজের সুরক্ষা কাঠামোর কোথাও একটি গুরুতর ঘাটতি থেকে যাওয়া।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো ঐচ্ছিক সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি শিশুর মৌলিক অধিকার। যে সমাজ শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারে না, সে সমাজের উন্নয়ন ও মানবিকতা বলে আর কিছু থাকে না।
বিশেষ করে শিশু যখন নিজ বাড়িতে, পরিচিত পরিবেশে কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছেও নিরাপদ থাকে না, তখন প্রশ্ন ওঠে—শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে?
শিশু হত্যার ঘটনাগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—অধিকাংশ অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। অনেক ঘটনায় শিশুর পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
এই বাস্তবতা শিশু সুরক্ষা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। অভিভাবকরা সাধারণত শিশুদের অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু যখন পরিচিত পরিবেশেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়, তখন শুধু অপরিচিত ব্যক্তির বিষয়ে সতর্কতা যথেষ্ট নয়।
শিশু হত্যার কিছু ঘটনায় পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ কিংবা অভিভাবকদের মধ্যে বিরোধের ঘটনা উঠে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুকে 'প্রতিশোধের মাধ্যম' হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কখনো কখনো শিশুর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
মানুষ কেন ফুটফুটে একটি ছোট্ট প্রাণকে হত্যা করে? শিশু হত্যার মতো অপরাধ কি শুধু ব্যক্তির রাগ, ক্ষোভ কিংবা মানসিক সমস্যার ফল? না, তা নয়। এই অপরাধের পেছনে ব্যক্তিগত আচরণ, সামাজিক পরিবেশ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অপরাধ সংঘটনের সুযোগ ও সর্বোপরি বিচারহীনতা দায়ী।
সমাজে সহিংস আচরণ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের পর জবাবদিহি কোথায়? শিশু হত্যার ঘটনা ঘটার পর পরিবার ও সমাজ দ্রুত বিচার দাবি করে।
কিন্তু মামলা দায়ের, তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা থাকায়, ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করেন। অথচ ভুক্তভোগী পরিবার যেন সন্তান হারানোর বিচার পান, এটা নিশ্চিত করার পুরো দায়িত্বই রাষ্ট্রের।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১৯৫ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মাত্র ৫৯টি মামলা দায়ের হয়েছে বলে আইন সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে। তবে মামলা না হওয়ার প্রতিটি ঘটনাকে সরাসরি বিচারহীনতা বলা না গেলেও, বিচারের প্রশ্নে যে গতি জড়তা আছে, তাতো স্বীকার করতেই হবে। এত কমসংখ্যক মামলা দায়েরের হার, তদন্ত ও জবাবদিহির সংস্কৃতি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শিশু সুরক্ষায় পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব আছে। এই নির্বিচার শিশু হত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন বিচার, বিচারের রায় বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ।
মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় কি পারে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে শিশু হত্যার ঘটনাগুলোকে একত্রিত করে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে? সেখানে শিশুর বয়স, লিঙ্গ, ঘটনার স্থান, হত্যার ধরন, অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্ক, মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি এবং বিচারিক ফলাফল সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের পদক্ষেপের মতোই গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শিশু হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
