বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন ও মানবাধিকার আইনের সমস্যা কোথায়?
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন কার্যকর হওয়ার পর ২০১০ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করে। একটি স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সংঘটিত লঙ্ঘনের তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কমিশন বারবার তার 'ক্ষমতাহীনতা'কে সামনে এনেছে। আমার প্রশ্ন হলো—সমস্যাটি কি সত্যিই কেবল আইনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতায়, নাকি আইনে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তার যথাযথ ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ব্যর্থতাতেও?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কোনো আদালত নয়। একটি NHRI-এর মূল কাজ হলো মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা, ভুক্তভোগীর প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করা এবং মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজেও স্বীকার করে যে তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশন দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং অভিযোগের তদন্ত করতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় বুঝতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ এক নয়। ফৌজদারি আইনে একজন ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় নির্ধারণ করতে হয় এবং দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি দিতে হয়। অন্যদিকে মানবাধিকার আইনের প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করেছে কি না; রাষ্ট্রীয় সংস্থা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা বা নিরাপত্তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে কি না; এবং লঙ্ঘন ঘটলে কী ধরনের প্রতিকার প্রয়োজন। এই দুই কাঠামোকে এক করে ফেললেই বিপদ শুরু হয়।
তাহলে কমিশনের ক্ষমতা কতটুকু?
প্যারিস নীতিমালা জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যাপ্ত ক্ষমতা, বিস্তৃত ম্যান্ডেট, স্বাধীনতা ও কার্যকর তদন্তের সক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে। GANHRI-র বর্তমান ব্যাখ্যাতেও অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, রাষ্ট্রকে পরামর্শ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতাকে একটি NHRI-এর মৌলিক কার্যাবলির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালে প্রথমবার এবং ২০১৫ সালে পুনরায় বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে 'B' status দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের GANHRI-এর প্রতিবেদনে কমিশনকে 'B' মর্যাদা দেওয়ার পেছনে প্রথম যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছিল, তা ছিল কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করা। অথচ কমিশন নিজেই তার আইনি অক্ষমতাকেই বারবার বড় করে তুলে ধরেছে। আর এখানেই বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের সমস্যার একটি বড় জায়গা।
ক্ষমতা আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায়? অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যক্রম পর্যালোচনা
গত এক দশকের বেশি সময়ের কমিশনের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে আমার কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই তার বিদ্যমান অনুসন্ধানী ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি।
২০১১ সালের শফিকের অভিযোগ (অভিযোগ নম্বর ১০৩/২০১১)-এর কথাই ধরা যাক। অভিযোগ ছিল, র্যাব তাকে ধরে নিয়ে 'ক্রসফায়ারে' হত্যা করেছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য ছিল, শফিক একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী এবং র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ছিল; ফলে কমিশনের আর কিছু করার নেই। কিন্তু একজন ব্যক্তি অপরাধী ছিলেন কি না—এটি একটি ফৌজদারি প্রশ্ন। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার জীবন কীভাবে শেষ হলো এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছিল কি না—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানবাধিকার প্রশ্ন যা কমিশন এড়িয়ে গেছে অথবা র্যাবকে দায়মুক্তি দিয়ে দিয়েছে।
একই ধরনের প্রশ্ন ওঠে রাসেল (অভিযোগ নম্বর ১০৭/২০১১), আলাউদ্দিন (অভিযোগ নম্বর ৯৭/২০১০) এবং ১৬ বছরের কিশোর আবু (অভিযোগ নম্বর ১০৮/২০১১)-এর অভিযোগে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া, 'ক্রসফায়ার' এবং হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে prima facie উপাদান থাকার পরও, অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ বা অপরাধের পূর্ববর্তী ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়ে মানবাধিকার প্রশ্নটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে—এমনটাই অভিযোগ নিষ্পত্তির নথিতে প্রতীয়মান।
তাপনের ঘটনাতেও একই সমস্যা দেখা যায়। অভিযোগ ছিল, ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পাঁচ মাস পর পুলিশ জানায়, তাপনের স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে হত্যার মামলা করেছেন। পুলিশের এই বক্তব্যকে যথেষ্ট ধরে নিয়ে কমিশন অভিযোগটি নিষ্পত্তি করে। কিন্তু কেউ অপরাধী হতে পারে—এই সম্ভাবনা তাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন, গুম বা বেআইনি হত্যার শিকার হওয়ার অধিকার দেয় না।
সুমন ও নূর নবীর অভিযোগেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অথচ কোনো একটি অভিযোগেই কমিশন রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি কার্যকর show-cause প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করেছে—এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তানিয়ার অভিযোগ: প্রতিকার কি শুধু মানুষকে ফিরে পাওয়া?
২০১৫ সালে তানিয়া অভিযোগ করেছিলেন যে, র্যাব তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে এবং তিনি আর ফিরে আসেননি। কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে তারিখ দিয়েছে; কার্যকর কোনো প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। সৌভাগ্যক্রমে ২০১৬ সালে তানিয়ার স্বামী ফিরে আসেন। এরপর কমিশন তানিয়াকে ডেকে লিখিতভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে, কারণ তিনি তার স্বামীকে ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু এখানেই মানবাধিকার আইনের গভীর প্রশ্নটি থেকে যায়। একজন মানুষ ফিরে এসেছেন—এতেই কি রাষ্ট্রের দায় শেষ হয়ে যায়? যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনী কাউকে বেআইনিভাবে আটক করে থাকে, তাহলে শুধু তাকে ফেরত দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হতে পারে ঘটনার তদন্ত, দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ, ভবিষ্যতে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি।
হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু: রাষ্ট্রের দায় কোথায়?
হেফাজতে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুরুতর লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোতেও নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুরক্ষিত। তবু গত এক দশকে কমিশন ৫৩টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেও মাত্র দুটি ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছে—এমন তথ্য আমার পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
জিয়ার অভিযোগের কথাই ধরা যাক (অভিযোগ নম্বর ১৩৩/২০১১)। অভিযোগ ছিল, র্যাব তাকে ধরে নিয়ে তার হাত ভেঙে দেয়। কমিশন স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে কার্যকর জবাব না চেয়ে বরিশাল জেলা বারের সভাপতিকে চিঠি দেয়। কিন্তু বরিশাল জেলা বার তো রাষ্ট্র নয়; রাষ্ট্রের পক্ষে জবাব দেওয়ার কর্তৃপক্ষও নয়। শেষ পর্যন্ত জবাব না পাওয়ার কারণে অভিযোগটি নথিজাত করা হয়। আরও একটি ঘটনায় দুজনকে র্যাব গুলি করার পর তারা বেঁচে যান এবং হাসপাতালে ভর্তি হন; হাসপাতালেও র্যাব সদস্যরা পাহারায় ছিলেন। অভিযোগটি নিষ্পত্তির সময় কমিশন তাদের 'কুখ্যাত সন্ত্রাসী' হিসেবে উল্লেখ করে।
অভিযোগ নম্বর ০৮/২০১১ (সিরাজ), ১১৬/২০১১ (কবির), ৮৪/২০১১ (রবি), ১০৫/২০১১ (রহমত), ৯১/২০১৪ (মানসুর) এবং স্বপ্রণোদিত অভিযোগ নম্বর ৩২/২০১৭—এসব ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় হেফাজত, হেফাজতে নির্যাতন বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার prima facie উপাদান ছিল। অথচ অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ বা কার্যকর নির্দেশনার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্রেপ্তার, হেফাজত বা হাসপাতালে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেনি। অর্থাৎ, prima facie উপাদান থাকার পরও মানবাধিকার প্রশ্নটি ফৌজদারি অভিযোগের আড়ালে হারিয়ে গেছে।
খাদিজার মামলা: আদালতের হস্তক্ষেপে একটি ব্যতিক্রম
২০১৯ সালে কমিশনের একটি আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আমাকে হাইকোর্টে রিট করতে হয়। গৃহকর্মী খাদিজাকে নির্যাতনের ঘটনায় হাইকোর্ট কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা ও কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। আদালত কমিশনকে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশও দেয় এবং স্পষ্ট করে যে কমিশনের আইনগত ক্ষমতা সম্পর্কে 'কমিশনের ক্ষমতা সীমিত'—এই ধারণা সরলভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এরপর খাদিজার অভিযোগ পুনরায় শুনানি হয়। শুনানিতে কমিশনের একজন সদস্য আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন— 'আপনারা থানায় মামলা করেননি কেন?' আমি বলেছিলাম, 'রাষ্ট্র যদি একটি ফৌজদারি অভিযোগের তদন্তই না করে, তাহলে সেটিও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। একজন নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ না করা, তদন্ত না করা এবং কার্যকর প্রতিকার না দেওয়া রাষ্ট্রের নিজস্ব দায়িত্বের ব্যর্থতা।'
খাদিজার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন এটি ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে?
তনুর মামলা: ধর্ষণের বিচার নয়, রাষ্ট্রের তদন্তের দায়
সোহাগী জাহান তনুর মামলাতেও কমিশনের শুনানিতে আমরা একই বিষয় তুলে ধরেছিলাম। আমরা বলেছিলাম—'আমরা ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী মৃত্যুর বিচার করার জন্য শুনানিতে আসিনি। কারণ অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আমরা এসেছি এই কারণে যে, সরকার ধর্ষণের অভিযোগের তদন্ত বছরের পর বছর ফেলে রেখেছে—এটিই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।' কিন্তু কমিশন আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করেনি। সরকারকে—অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র সচিবকে—একটি show-cause notice-ও জারি করা হয়নি।
এখানেও একই ভুলটি হয়েছে: অপরাধের বিচার এবং রাষ্ট্রের তদন্তের দায়িত্বকে একই বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
একরামুল হক: 'ফৌজদারি মামলা করুন'—কিন্তু মানবাধিকার অভিযোগের কী হবে?
একরামুল হকের কথিত 'ক্রসফায়ার' নিয়েও কমিশনে শুনানি হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র সচিব কমিশনের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। আমি লন্ডন থেকে অনলাইনে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলাম। আমি যুক্তি দিলাম— 'রাষ্ট্রের হেফাজতে নেওয়ার পর একজন মানুষকে জীবিত অবস্থায় তার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে গুলি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। সেই কথোপকথনের পর গুলির শব্দ ও গোঙানির যে অডিও, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের হেফাজতে 'ক্রসফায়ার'-এর অভিযোগের ক্ষেত্রে অন্তত prima facie evidence রয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রের হেফাজতে নেওয়া বা ক্রসফায়ারের অভিযোগটি অস্বীকারও করেননি।' এরপর কমিশনের চেয়ারম্যান স্বরাষ্ট্র সচিবকে বললেন: 'আপনারা একটি ফৌজদারি মামলা করেন। তাহলে আমরা অভিযোগটি নথিজাত করে দিতে পারি।'
আমি তখন যুক্তি দিয়েছিলাম- "ফৌজদারি মামলায় কোনো ব্যক্তির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হবে। কিন্তু একটি ফৌজদারি মামলার অজুহাতে রাষ্ট্র তার নিজস্ব মানবাধিকারগত দায় এড়াতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় এবং ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের দায়—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।" তারপরও কমিশন আবার শুনানির জন্য একটি তারিখ দিয়ে বিষয়টি মুলতবি রাখে। পরবর্তীতে আর কোনো কমিশন আমাকে নোটিশ দেয়নি এবং শুনানিও আর হয়নি। নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা তদন্তের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিষয়টি দীর্ঘদিন পড়ে রয়েছে। রাজীব কর রজুর অভিযোগেও একই পরিস্থিতি। কমিশন ফৌজদারি আইনের অজুহাত দেখিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নটি পাশ কাটিয়ে গেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফৌজদারি অপরাধ: দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি কাঠামো
মানবাধিকার কাঠামো এবং ফৌজদারি বিচার কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। আইন আলাদা, উদ্দেশ্য আলাদা, প্রমাণের প্রশ্ন আলাদা, প্রক্রিয়া আলাদা এবং প্রতিকারও আলাদা। ফৌজদারি আইনের উদ্দেশ্য হলো কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় নির্ধারণ করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তি দেওয়া। সেখানে beyond reasonable doubt মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মানবাধিকার আইনের প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করেছে কি না; রাষ্ট্রীয় সংস্থা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করেছে কি না; এবং রাষ্ট্রের কোনো কাজ বা ব্যর্থতার কারণে অধিকার লঙ্ঘিত হলে কী ধরনের প্রতিকার প্রয়োজন। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য কোনো ব্যক্তিকে ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা এবং রাষ্ট্রকে একজন নাগরিকের জীবন রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা—এক বিষয় নয়। একটির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায় প্রমাণ করতে হয়; অন্যটির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও মানবাধিকারগত দায় নির্ধারণ করতে হয়। আর এখানেই prima facie evidence-এর গুরুত্ব। মানবাধিকার কমিশনের কাজ কোনো ব্যক্তিকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। বরং প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য উপাদান পাওয়া গেলে কমিশনের উচিত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, তদন্ত করা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিকার ও সুপারিশের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ কমিশনের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যেও অভিযোগ তদন্ত, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া এবং তদন্তের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
মূল সমস্যা কোথায়?
আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের সমস্যাটি শুধু আইনের সীমাবদ্ধতা নয়; কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মানবাধিকার আইন সম্পর্কে ধারণা, আইনি দক্ষতা এবং বিদ্যমান ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতাও একটি বড় সমস্যা। আর সবচেয়ে বড় ভুল হলো—ফৌজদারি বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত মানবাধিকার প্রশ্ন অপেক্ষা করবে—এই ধারণা। যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকে, তার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র তার ওপর নির্যাতন করতে পারে। কেউ সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত হলেও রাষ্ট্রীয় হেফাজতে তার জীবন ও মর্যাদার অধিকার থাকে। কেউ ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও রাষ্ট্রের তদন্ত করার দায়িত্ব থাকে। কেউ অপরাধী হলেও তাকে বেআইনিভাবে হত্যা করা বৈধ হয়ে যায় না। অতএব, মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রশ্নটি হওয়া উচিত- "অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে কি না?" তা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—"রাষ্ট্র তার আইনগত ও মানবাধিকারগত দায়িত্ব পালন করেছে কি না?" এই পার্থক্যটি যতদিন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আইনজীবী এবং বিচারব্যবস্থা যথাযথভাবে বুঝতে ও প্রয়োগ করতে না পারবে, ততদিন রাষ্ট্রের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো ফৌজদারি মামলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকবে।
মানবাধিকার কমিশন আইনের বর্তমান বিল এবং এর অন্তর্নিহিত সমস্যা
২০২৫ সালে ইউনূস সরকার মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে, যেখানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। একটি NHRI-কে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া আন্তর্জাতিক পরিসরে কতটা নজিরবিহীন এবং এর ফলে কমিশনের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার সঙ্গে কী ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে—তা গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে মিরাজ শেখের গুমের ঘটনা ধরা যেতে পারে। মইনুল ইসলাম কমিশন যদি বর্তমানে প্রস্তাবিত ক্ষমতাসম্পন্ন অবস্থায় কার্যকর থাকত, তাহলে তারা কী করত? কমিশন সম্ভবত ঘটনাস্থলে গিয়ে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্ত করত। কিন্তু সেই তদন্তের পর কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতো?
ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনার জন্য আলামত সংগ্রহ, জব্দ এবং সংরক্ষণের একটি নির্দিষ্ট আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। বিশেষ করে ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো প্রয়োজন। প্রস্তাবিত কমিশনের কি সেই সক্ষমতা, অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে? কমিশন আলামত জব্দ করার পর সেই আলামত কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করবে? জব্দ করা আলামত যদি কোনো ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, তাহলে কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং কোন আইনগত প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন হবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কমিশন যদি কোনো ব্যক্তি, এমনকি কোস্ট গার্ড বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে গ্রেপ্তার করে, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে কীভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে? কমিশন কর্তৃক গ্রেপ্তার করা ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত কীভাবে প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় হস্তান্তর বা সংযুক্ত হবে? কমিশন কি চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট প্রস্তুত করবে? যদি করে, তাহলে সেই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট কোন আইনি কাঠামোর অধীনে এবং কোন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত হবে? একইভাবে, একটি GR মামলার সঙ্গে কমিশনের সম্পর্ক কী হবে?
সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন কমিশনের quasi-judicial ক্ষমতার সঙ্গে এই ফৌজদারি তদন্তের ক্ষমতাকে একত্রে বিবেচনা করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে দুই পক্ষের শুনানি গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে শুনানির ক্ষেত্রে কমিশন দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। কিন্তু যদি কমিশন ইতোমধ্যে ফৌজদারি তদন্ত করে থাকে, আলামত জব্দ করে থাকে এবং কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে থাকে, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে সেই একই কমিশন কীভাবে দেওয়ানি আদালতের ন্যায় দুই পক্ষের শুনানি গ্রহণ করবে? আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো—এই শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব কে করবে? যদি কমিশনের উদ্দেশ্য হয় রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায় নির্ধারণ করা, তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষে কে শুনানিতে অংশগ্রহণ করবে? এবং কমিশন কোন পক্ষের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় প্রমাণ করবে? প্রস্তাবিত বিলে পূর্ববর্তী আইনের মতো 'সরকার' শব্দটির ব্যবহারও যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা দেবে যখন কমিশনের কোনো গ্রেপ্তার বা আলামত জব্দের আদেশ হাইকোর্ট বিভাগে চ্যালেঞ্জ করা হবে। এ ধরনের আদেশের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ হওয়ার এবং আদালত কর্তৃক stay দেওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। বিশেষ করে কমিশন যখন একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থা এবং quasi-judicial কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে, তখন তার আদেশের বৈধতা, এখতিয়ার এবং প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দ্বৈততা শেষ পর্যন্ত কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতাকেই দুর্বল করতে পারে। কমিশন যত বেশি পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা বা প্রশাসনিক enforcement agency-এর মতো কাজ করবে, তত বেশি তার আদেশ প্রচলিত ফৌজদারি ও সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর সম্ভাবনা থাকবে। এর ফলে যে NHRI-কে রাষ্ট্রের মানবাধিকার দায়বদ্ধতা নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কথা, সেটি ক্রমশ সরকারের একটি প্রশাসনিক তদন্তকারী সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
অতএব, মানবাধিকার কমিশনকে আরও 'শক্তিশালী' করার নামে তাকে একটি ফৌজদারি তদন্তকারী সংস্থায় রূপান্তর করা Paris Principles-এর মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই বর্তমান সংস্কার বিতর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া উচিত।
