ব্যাংক ঋণের টানাপোড়েন: বেসরকারি খাতের সংকট ও সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা
একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চাবিকাঠি হলো উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর এই বিনিয়োগের সিংহভাগ পুঁজি আসে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যাংক ঋণকে কেন্দ্র করে কাঠামোগত টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট আমাদের সামনে সামষ্টিক অর্থনীতির এক নতুন ও জটিল বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে বেসরকারি খাত হলো দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তি। অন্যদিকে সরকার তার বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে এবং বিভিন্ন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতির এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন কেবল ব্যাংক খাতের তারল্য বা টাকার স্বাভাবিক সরবরাহকেই সংকুচিত করছে না, বরং এর ক্ষতিকর ঢেউ এক খাত থেকে অন্য খাতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকের এই ঋণ দেওয়ার বর্তমান নীতি ও কাঠামোগত রূপান্তর কীভাবে পুরো অর্থনীতিকে ক্রমান্বয়ে শৃঙ্খলিত করছে, তা এখন গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। নীতিনির্ধারকদের এই মুহূর্তে বুঝতে হবে যে, ভারসাম্যহীন ঋণ বণ্টন দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ব্যাংকের টাকা যাচ্ছে কোন খাতে
অর্থনীতির স্বাভাবিক ব্যাকরণ ও সাধারণ নিয়মে ব্যাংকে জমা হওয়া আমানতের একটি বড় অংশ বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাওয়ার কথা। এই টাকা দিয়ে দেশে নতুন নতুন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ কলকারখানা গড়ে ওঠার কথা, যা মূলত সরবরাহ চেইনকে চাঙ্গা করবে এবং লাখ লাখ বেকার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র প্রদর্শন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার গতি ও প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। বাজারে চলমান মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এই নীতিমালার কারণে বাজারে টাকার সরবরাহ এমনিতেই বেশ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এর ওপর নতুন এবং বড় চাপ হিসেবে যুক্ত হয়েছে সরকারের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা।
জাতীয় সংসদে বাজেট ঘাটতি নিয়ে বক্তব্য রাখার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সামষ্টিক অর্থনীতির এই নতুন ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জের কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিতে দেখা যায়, নতুন বাজেটে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রাক্কলন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের যৌথ তথ্যে উঠে এসেছে যে, এই বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই সরকার সরাসরি তুলে নেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে।
সরকার যখন ট্রেজারি বিল ও বন্ডের উচ্চ সুদের হারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তখন ব্যাংকের হাতে থাকা ঋণযোগ্য তহবিলের একটি বড় অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলে যায়। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত মনে করে সরকারকে ঋণ দেওয়া শতভাগ নিরাপদ বিনিয়োগ, যেখানে খেলাপি হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোও বেসরকারি খাতে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। ব্যাংকিং খাতের এই কাঠামোগত পরিবর্তন সরাসরি আঘাত করছে দেশের বেসরকারি শিল্প খাতকে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে।
'ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট' এবং কোণঠাসা উদ্যোক্তারা
অর্থনীতির পরিভাষায় এই বিশেষ পরিস্থিতিকে বলা হয় 'ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট'। সহজ কথায়, ঋণ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সরকারের পাশে দেশের বেসরকারি খাত যখন পুঁজি না পেয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন তাকে এই নামে ডাকা হয়। সরকারের এই একচেটিয়া টাকা তুলে নেওয়ার নীতি বাজারে একটি কৃত্রিম তারল্য সংকট বা টাকার তীব্র টানাটানি তৈরি করবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়বে ঋণের সুদের হারের ওপর। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা ধারের খরচ বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস অনেক বেড়ে যাবে, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যেকোনো বেসরকারি কিংবা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। উৎপাদন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় শিল্পগ্রুপগুলোও তাদের নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে আসবে। ইতিমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিদিনের ব্যবসা পরিচালনা বা চলমান মূলধন জোগাড় করতেই এখন হিমশিম খাচ্ছে। ফলস্বরূপ, ব্যাংকিং খাতের এই তারল্য সংকটের কারণে সরাসরি দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে। এটি এক সেক্টরের ভুল পলিসির কারণে অন্য সেক্টর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি প্রত্যক্ষ ও বাস্তব উদাহরণ।
বেসরকারি খাতের ঋণের চক্রাকার সুফল
ঋণ ব্যবহারের গুণগত মান এবং অর্থনৈতিক সুফলের দিক থেকে বেসরকারি খাতের একটি নিজস্ব ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, তখন তার সামনে প্রধান লক্ষ্য থাকে বাজারে টিকে থাকা এবং মুনাফা অর্জন করা। এই মুনাফা অর্জনের তীব্র তাগিদ থেকেই তিনি ঋণের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ, দক্ষ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাধ্য হন। এখানে একটি চমৎকার চক্রাকার প্রক্রিয়া বা রিসাইকেলিং তৈরি হয় যা পুরো অর্থনীতিকে সচল রাখে।
উদ্যোক্তা বা কৃষক তার ঋণ পরিশোধের স্বার্থেই দিনরাত পরিশ্রম করে উৎপাদন বৃদ্ধি করেন এবং ব্যবসা বড় করার চেষ্টা করেন। যত বেশি উৎপাদন হবে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ তত বাড়বে এবং বাজারমূল্য স্বাভাবিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ব্যবসা সফল হলে তিনি ব্যাংকে ঋণের টাকা নির্দিষ্ট মুনাফাসহ সময়মতো ফেরত দেন। ব্যাংক যখন এই টাকা ফেরত পায়, তখন ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল আবার চাঙ্গা হয় এবং ব্যাংক পরবর্তীতে অন্য কোনো নতুন উদ্যোক্তাকে আবার ঋণ দিতে পারে। এভাবে টাকাটা ব্যাংকের মধ্যেই ক্রমাগত ঘুরতে থাকে এবং নতুন মূলধন তৈরি করে। শুধু তাই নয়, ব্যবসা যত বড় হয়, সরকারের খাতায় কর বা ট্যাক্সের পরিমাণও তত বাড়ে। একজন সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোক্তা যখনই ঋণ পান, তা সরাসরি দেশের জিডিপিতে গতি আনে। তাই বলা যায়, ব্যক্তি খাতের বিকাশই মূলত রাষ্ট্রের আসল এবং টেকসই বিকাশ।
সরকারি বিনিয়োগে আশানুরূপ ফল না আসার কারণ
অপরদিকে, সরকার যখন ব্যাংক কিংবা বন্ডের মাধ্যমে বাজার বা জনগণের কাছ থেকে ঋণ নেয়, তখন সেই টাকার একটি বড় অংশই অনুৎপাদনশীল কিংবা লোকসানি খাতে চলে যায়। বেসরকারি খাতের মতো সরকারের সামনে সরাসরি মুনাফা অর্জন করার কোনো বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা বা তীব্র প্রতিযোগিতা থাকে না। ফলে ঋণের টাকা অনেক সময় এমন সব খাতে ব্যয় হয় যা অর্থনীতিকে গতিশীল করার পরিবর্তে উল্টো ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
সরকার প্রায়ই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সেবা খাতের লোকসান মেটায় বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় পরিশোধে ব্যবহার করে থাকে। রাষ্ট্রীয় রেল খাতের কথাই ধরা যাক, যা একটি জনকল্যাণমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদে অলাভজনক খাত হিসেবে পরিচিত। এই খাতের প্রতিদিনের ব্যয় মেটাতে বা ঘাটতি পূরণে যখন ব্যাংক ঋণের টাকা ব্যবহার করা হয়, তখন সেই বিনিয়োগ থেকে কোনো বাণিজ্যিক রিটার্ন আসে না। এটি বছরের পর বছর কেবল সরকারি ভর্তুকির পেছনেই হারিয়ে যায়। একইভাবে সরকারি হাসপাতাল বা অন্যান্য সামাজিক সেবা খাতের পরিচালনা ও কর্মচারীদের বেতন মেটাতে ঋণের টাকা খরচ হয়। যদিও এগুলো সামাজিক উন্নয়নের জন্য জরুরি, কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির বাণিজ্যিক সমীকরণে এগুলো থেকে সরাসরি কোনো নতুন মুনাফা বা ক্যাশ ফ্লো তৈরি হয় না।
এর বাইরে আমাদের দেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও অদক্ষতার কারণে এক বছরের প্রকল্প তিন বা চার বছরে গিয়ে ঠেকে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। ঋণের টাকা যখন উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে প্রকল্প বিলম্ব ও অদক্ষতায় নষ্ট হয়, তখন বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লেও উৎপাদন বাড়ে না। ফলে এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি বাজারে কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।
এক খাতের সংকট যেভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে পুরো অর্থনীতিকে
ব্যাংক খাতের এই ঋণ বণ্টনের বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা পুরো অর্থনীতিকে একধরনের নেতিবাচক প্রভাবের জালে আটকে ফেলছে, যা একটি অন্তহীন ক্ষতিকর চক্রের মতো কাজ করে। প্রথমত, বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ না পেয়ে কাঁচামাল আমদানি বা উৎপাদন বাড়াতে পারছে না এবং ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমবে, যা জিনিসের দাম বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। দ্বিতীয়ত, শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ না হওয়া মানে দেশে নতুন কোনো কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া। উল্টো অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদের হারের কারণে খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে, যা যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ ক্ষতিকর প্রভাবটি পড়ছে সরকারের রাজস্ব খাতে। বেসরকারি খাতের ব্যবসা সংকুচিত হলে সরকারের কর বা রাজস্ব আদায় কমে যায়। রাজস্ব কমলে সরকারের বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ে এবং সরকার আবারও ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকের দিকে হাত বাড়ায়। এটি অর্থনীতিকে একটি অন্তহীন ক্ষতিকর চক্রের মধ্যে ফেলে দেয়।
সংকট কাটানোর নীতিগত সমাধান
বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে:
- ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা কমানো: বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর থেকে ঋণের নির্ভরতা কমাতে হবে। আর এর একমাত্র উপায় হলো কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। করের আওতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় জোরদার করতে হবে, যাতে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কম হয়।
- উন্নয়ন প্রকল্পের কঠোর অডিট: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় ও সুফলের বিশ্লেষণ অত্যন্ত কঠোরভাবে করতে করতে হবে। যেসব প্রকল্প দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে এবং জিডিপিতে অবদান রাখবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
- বেসরকারি খাতের জন্য কোটা নির্ধারণ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া, যাতে তারা একটি সুনির্দিষ্ট ও বড় পরিমাণ তহবিল উৎপাদনশীল বেসরকারি খাত, কৃষি খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কোটা হিসেবে বরাদ্দ রাখে।
- ব্যাংক খাতে সুশাসন: ব্যাংকিং খাতের ভেতরে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করতে হবে এবং ব্যাংকের নিজস্ব সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকে তারল্য বা টাকার প্রবাহ না ফিরলে সরকার বা বেসরকারি খাত কেউই সুস্থ ঋণ পাবে না।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগেরই প্রয়োজন রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারি বিনিয়োগ যেমন দরকার, ঠিক তেমনি সেই অবকাঠামো ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বেসরকারি খাতের। কিন্তু একটি খাতকে শুকিয়ে অন্য খাতকে চাঙ্গা করার নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আত্মঘাতী। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের এই সময়ে এসে আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, ব্যাংক কোনো অফুরন্ত ভাণ্ডার নয়। ব্যাংক ঋণের সুষম বণ্টন এবং সরকারি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সামষ্টিক অর্থনীতির এই টানাপোড়েন আগামী দিনে আরও প্রকট রূপ ধারণ করবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই অর্থনীতির স্বার্থে এখন সঠিক, দূরদর্শী ও সমন্বিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া অতি আবশ্যক।
লেখক: আশুরা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
- নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
