তদারকির অভাবে ঝুঁকিতে সাভারের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত: নাগরিক সংলাপে বিশেষজ্ঞরা
দুর্বল তদারকি, জনবল সংকট ও জবাবদিহিতার অভাবে সাভারের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত অব্যবস্থাপনার কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একটি নাগরিক সংলাপের বক্তারা। গত শুক্রবার এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
"বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা: বিদ্যমান সংকট ও উত্তরণের উপায়" শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে সাভারের স্থানীয় ডিজিটাল নাগরিক প্ল্যাটফর্ম 'হ্যালো সাভার'।
সংলাপে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফজলে বারী জানান, এই এলাকায় বর্তমানে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ ১৩০টির-ও বেশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১১৭টি প্রতিষ্ঠান বৈধ অনুমোদন পেয়েছে বা সম্প্রতি তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেছে। অন্যদিকে, ১৮টি প্রতিষ্ঠান কোনো রকম অনুমোদন ছাড়াই চলছে অথবা আবেদন জমা দিয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু বড় হাসপাতাল নিয়মিত ও মানসম্মত সেবা দিলেও – অনেক ছোট ছোট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা, মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মসূচি তদারকি এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কার্যালয়ে কোনো পৃথক উইং বা পর্যাপ্ত জনবল নেই। ফলে মাত্র কয়েকজন কর্মী দিয়ে এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান মনিটরিং করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডা. ফজলে বারী আরও বলেন, লাইসেন্স ছাড়া বা নবায়ন না করে চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ এখন থেকে নিয়মিত এবং ঝটিকা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব পরিদর্শনে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, নার্সিং স্টাফদের যোগ্যতা, প্যাথলজি রিপোর্ট, রিএজেন্টের মান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগী ভর্তির প্রক্রিয়া এবং ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখা হবে।
"যেসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান অত্যন্ত নিম্ন, কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক বা নার্স নেই, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা ও বন্ধ করে দেওয়া হবে," বলে সতর্ক করেন তিনি।
সংলাপে যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র করেসপনডেন্ট মাহফুজুর রহমান নিপু বলেন, ২০১৮ সালে সাভারের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে একটি বড় ধরনের ক্র্যাকডাউন বা অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্লিনিক জরিমানা বা সিলগালা করার পরও— কেবল নাম পরিবর্তন করে আবার চালু হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে শুধু আবেদন জমা দিয়েই লাইসেন্স পাওয়ার আগে কার্যক্রম শুরু করে দেয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাভারে অনিবন্ধিত অ্যানেস্থেসিয়া প্রদানকারী, দক্ষ টেকনোলজিস্ট ছাড়াই প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি, রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো এবং জোরপূর্বক সাধারণ ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে রোগী ভর্তি করানোর মতো অনৈতিক চর্চা বাড়ছে। তবে এর মধ্যেও অনেক হাসপাতাল ও চিকিৎসক অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সততার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের বিপুল চাহিদামতো সেবা দিতে না পারায় স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিস্তার ঘটেছে। তবে একই সাথে জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা—উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, "একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পক্ষে একা ১৩০টির বেশি ক্লিনিক তদারকি করা অসম্ভব। বর্তমানে যে কাজ একজন করছেন, তা সুচারুভাবে করতে অন্তত চারজন কর্মকর্তা প্রয়োজন।"
অধ্যাপক সবুর উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্রতিষেধক স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় ও বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক জনবল কাঠামো তৈরির আহ্বান জানান। তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি জনবল বাড়ানো সম্ভব না হলে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন এবং সরকারি পদক্ষেপের জন্য প্রতিবেদন তৈরি করতে প্রয়োজনে থার্ড-পার্টি বা বহিরাগত কোনো সংস্থাকে নিয়োজিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
একই সাথে তিনি ১৯৮২ সালের আইন 'দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স' অবিলম্বে যুগোপযোগী করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, আইনি সংস্কারের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের জন্য পর্যাপ্ত জনবল থাকতে হবে। শুধু অনলাইন বা ডিজিটালাইজেশন করলেই তদারকি ব্যবস্থার উন্নতি হবে না, যদি না আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও মাঠ পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী থাকে।
হাসপাতালের দালাল চক্রের বিষয়ে আলোকপাত করে আব্দুস সবুর বলেন, রোগীরা প্রায়ই চিকিৎসার বিকল্প ও ভালো চিকিৎসকদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়ায়— এই দালালদের খপ্পরে পড়েন। তাই শুধু পুলিশি অ্যাকশনের ওপর নির্ভর না করে, এই ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীদের লাইসেন্সিং এবং নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণের মাধ্যমে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের 'স্বেচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ' বা নিজস্ব জবাবদিহিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, গুটিকয়েক নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো চিকিৎসা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাভারেই যদি মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তবে ঢাকার ওপর রোগীদের চাপ এবং ভোগান্তি দুই-ই কমে আসবে।
