পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ: যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঐতিহাসিক জয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। টানা ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে 'গেরুয়া ঝড়' বইতে শুরু করেছে। শেষ খবর পাওয়া বিজেপি পর্যন্ত রাজ্যের ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে এগিয়ে থেকে নিরঙ্কুশ জয়ের পথে রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে সব রেকর্ড ভেঙে এবার ৯২.৯৩ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঢাকার জন্য এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সমীকরণ সামনে নিয়ে এসেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভিবাসনের (অনুপ্রবেশ) মতো বিষয়গুলোতে বিজেপির বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখন এক ধরণের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিজেপির এই জয়ের ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কথা বলেছে পাঁচজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে।
'কলকাতায় বিজেপির শাসন তিস্তা বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তা করতে পারে'
আমেনা মহসিন
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে যে—ঢাকা সবসময় দিল্লির সঙ্গে আলোচনা করে, কলকাতার সঙ্গে নয়। পশ্চিমবঙ্গে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঐতিহাসিক হলেও, আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক যোগাযোগ আগের মতোই কেন্দ্রের সঙ্গেই থাকবে।
যেহেতু বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রে এবং রাজ্যে একই দল (বিজেপি) ক্ষমতায় এবং তারা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তাই নতুন সরকার গঠনের সময় তারা এই কৌশলগত স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রাখবে বলেই মনে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে আসছিল, কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণেই তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি আটকে আছে। এখন যেহেতু সেই রাজনৈতিক বাধা দৃশ্যত অপসারিত হয়েছে, তাই বাংলাদেশের জন্য এটি দেখার বড় বিষয় হবে যে তারা আসলেও এই চুক্তি নিয়ে কতটুকু এগিয়ে যায়।
এটি মূলত প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের নতুন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির একটি লিটমাস টেস্ট হবে। তবে, এই নতুন পরিস্থিতিতে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট নিয়ে বাড়তি সংবেদনশীল হতে হবে।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বিজেপি নেতৃত্বকে এটি নিশ্চিত করতে হবে—এমন কোনো উসকানিমূলক বা নেতিবাচক বক্তব্য না আসে, যা আমাদের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। তাদের বুঝতে হবে যে, এ ধরণের উসকানিমূলক বক্তব্য দ্বিপাক্ষিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ভারত সম্ভবত অতীত অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছ: বাংলাদেশের জনগণই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে এখানে কারা ক্ষমতায় থাকবে আর কারা থাকবে না। আমাদের দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে তারা অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না বলেই আশা করা যায়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায়টি হওয়া উচিত বাস্তববাদিতা এবং একে অপরের জনগণের আবেগ ও অনুভূতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।
'ঢাকা-কলকাতা সম্পর্ক হবে ঢাকা-দিল্লি কাঠামোর একটি অংশমাত্র'
এম হুমায়ুন কবির
সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এর ফলে যেমন কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে, তেমনি আঞ্চলিক চাপও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভারতের সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক মূলত নয়াদিল্লির মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এর অর্থ হলো, ঢাকা-কলকাতা সম্পর্কের গতিপথ মূলত ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি অংশ হিসেবেই নির্ধারিত হবে।
যেহেতু বিজেপি এখন কেন্দ্রে এবং রাজ্যে উভয় পর্যায়েই ক্ষমতায় রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। নয়াদিল্লি যদি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এই নির্বাচনের স্থানীয় প্রভাব যতটা আশঙ্কা করা হচ্ছে ততটা উদ্বেগজনক নাও হতে পারে।
তবে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বা মুসলিম-বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা থেকে একটি বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া এবং আগে থেকে আলোচিত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (এনআরসি) কার্যকর করার যে পরিকল্পনা তাদের ছিল, তা নতুন করে সামনে আসতে পারে।
যদি এ ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গতি পায়, তবে তা 'পুশ-ইন'-এর (জোরপূর্বক অভিবাসন) মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে। এছাড়া, সীমান্তের ওপারে মানুষের যাতায়াতের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আসতে পারে। আমাদের এটিও মাথায় রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখন কার্যত দুটি প্রধান সীমান্তে—আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখোমুখি। এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি ভয়ের জন্ম দেয়, আমাদের সীমান্তে প্রথাগত ও কূটনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।
এমনকি সাধারণ মানুষের যাতায়াত, যা সাম্প্রতিক সময়ে এমনিতেই কমেছে, তা আরও সংকুচিত হতে পারে। পরিশেষে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামগ্রিক পরিবেশই ঠিক করে দেবে এই নির্বাচনের ফলাফল আমাদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে। প্রতিবেশীদের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঢাকাকে এখন অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
'আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে চাপ আরও বাড়বে'
আলতাফ পারভেজ
গবেষক, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস
বিজেপির এই জয়ের প্রভাব বিভিন্নভাবে অনুভূত হবে। তারা যখন পার্লামেন্টে যাবে, তখন সবাই এক ধরণের চাপের মুখে পড়বে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।
এই পরিস্থিতি কেবল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা আসামেও জয়ী হয়েছে। এর অর্থ হলো, দুই দিক থেকেই এখন একই ধরণের রাজনৈতিক সমীকরণ ও গতিধারা তৈরি হচ্ছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তজুড়ে চাপ আরও বাড়বে বলে মনে হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-বিরোধী অপপ্রচারও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তদুপরি, সেখানে দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান বাংলাদেশেও একই ধরণের দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের সংকেত দেয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতারই অংশ।
'বিজেপির জয় ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার পথ খুলে দেবে'
আসিফ শাহান
অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনে করি না যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশের ওপর বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর কারণ হলো, ভারতের কেন্দ্রে আগে থেকেই বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে।
মূল সমীকরণটি সব সময় ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেই ছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমার কাছে মনে হয়, এটি নতুনভাবে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরিতে এক ধরণের উৎসাহ জোগাতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতোমধ্যে তাদের যে অবস্থান তৈরি করেছিল, তা আদতে বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। সেই অর্থে, বিজেপির জয় ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার দ্বার উন্মোচন করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে পরিস্থিতির আরও উন্নতিও হতে পারে।
জাতীয় রাজনৈতিক পর্যায়ে আমি বিষয়টি এভাবেই দেখছি। তবে সামাজিক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে—বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগের ধরণ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে।
বিজেপি সেখানে ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। এই প্রভাবটি নীতিগত পর্যায়ের চেয়ে সামাজিক পর্যায়ে বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; অন্যদিকে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সম্ভবত স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে।
'পশ্চিমবঙ্গের উসকানিকে স্থানীয় সাম্প্রদায়িক শক্তি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে'
ফিরোজ আহমেদ
গবেষক ও লেখক
বিজেপি নেতারা নিয়মিত যে ধরণের ভাষা ব্যবহার করেন, তা এতটাই উগ্র যে বাংলাদেশের কোনো জাতীয় নেতার পক্ষে এমন মন্তব্য করা প্রায় অসম্ভব। তবে তাদের এই বয়ানের একটি সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে, কারণ এখানকার স্থানীয় সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এসব উসকানিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
অতীতের বাবরি মসজিদ ঘটনার পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা আমরা দেখেছি। এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনেও যে ধরণের উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে—যেখানে বাংলাদেশিদের 'বহিরাগত' হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে—তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের আশঙ্কা হলো, সরকার যদি সময়মতো দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তবে এই পরিস্থিতি দেশে অস্থিরতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
এর চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং অভিন্ন নদীর পানির অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন সংকট। এমনকি সীমান্তে গুলি চালানো এবং হত্যার ঘটনাও বাড়তে পারে, কারণ ক্ষমতা সুসংহত করতে এই প্রশাসন যেকোনো ধরণের কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারে।
তা সত্ত্বেও আমার ধারণা, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে খুব শান্তিতে শাসন পরিচালনা করতে পারবে না। পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অবিচল থাকতে হবে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।
