স্মরণ: অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক। বিকেলে পরিচালনা পর্ষদের সভা উপাচার্যের সভা কক্ষে। সকলে অপেক্ষা করছেন। আমি উপাচার্য প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিককে সকলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তাঁর কক্ষে গেলাম। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই এক ভর্তিচ্ছু তরুণ শিক্ষার্থী ঢুকে বললেন তাঁর কিছু কথা আছে।
ধীর-স্থির উপাচার্যকে শিক্ষার্থী বললেন: 'আমার বাবা অত্যন্ত গরীব, গ্রামে থাকেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ইচ্ছুক।' উত্তর: 'হ্যাঁ, আবেদন করো, ভর্তি পরীক্ষা দাও, উত্তীর্ণ হলে অবশ্যই ভর্তি হবে।' শিক্ষার্থী: 'যদি উত্তীর্ণ না হই?' উত্তর: 'তাহলে তো কিছু করার থাকবে না।' শিক্ষার্থী: 'স্যার, যেভাবেই হোক, আমাকে আপনি ভর্তি করে দিবেন।'
উপাচার্যের চোখে মুখে কোনো বিরক্তির ছাপ নেই এবং শিক্ষার্থীকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করে ফেলে আসেন নি। বুঝিয়ে বিদায় করে তবেই সভায় এসে সভাপতিত্ব করলেন। উল্লেখ্য, উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে কাউকেই তাঁর কক্ষে প্রবেশের জন্য অনুমতি নিতে হতো না। 'ভালো থেক', এটিই ছিল উপাচার্যের শেষ দুটি বাক্য। 'ভালো থেক' এবং 'ভালো থাকবেন' একাধিকবার এই শব্দ দুটো দিয়ে শুভ কামনা জানিয়ে সকলের সাথে তিনি কথা শেষ করতেন। এক্ষেত্রেও ব্যত্যয় ঘটেনি।
মৃত্যুর পর তাঁর বিভাগের একজন প্রাক্তন ছাত্র কোনো এক টিভি চ্যানেলে সম্ভবত এমনটাই বলেছিলেন, 'গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, আরেফিন সিদ্দিক স্যার দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁর শারীরিক অভিব্যক্তি থেকেও গণযোগাযোগের ভাষা শেখা যেত।' তাঁর সহকর্মী হিসেবে আমিও এটি প্রত্যক্ষ করেছি।
জনশ্রুতি আছে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ নাকি অধিকমাত্রায় অতিথিপরায়ণ হন। কিন্তু সেটি ভুল প্রমাণ করেছেন নরসিংদী থেকে আসা প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক। উপাচার্য হিসেবে একাজে তাঁর সহকারীর অভাব ছিল না, কিন্তু দায়িত্ব শেষ হবার পর যতবার তাঁর বাসায় গেছি, নিজ হাতে ট্রেতে নাস্তা এনে পরিবেশন করেছেন আমাকে সর্বশেষ আপ্যায়ন করেছেন ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪। আমার প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের প্রাক্তন ডিন ও উপ-উপাচার্য, অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাদাত আলীর স্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ এ। ২০ ডিসেম্বর ভাবীর জানাজায় প্রফেসর সিদ্দিক, প্রফেসর গুলশান আরা লতিফা ও আমি উপস্থিত ছিলাম। ২৯ ডিসেম্বর আরেফিন স্যার ফোন করে বললেন, 'সাহাদাত সাহেবের নিশ্চয়ই মন খারাপ, চলুন দেখা করে আসি।' পরদিন এ কারণেই ওনার ধানমন্ডির বাসায় যাই। জুতা খুলে মোজা পায়ে ড্রইং রুমে বসলাম। উনি বললেন, ঠাণ্ডার ভিতর জুতা খুললেন কেন? বলেই এক জোড়া স্যান্ডেল নিজেই এনে দিলেন, এবং আমার বাধা সত্ত্বেও পরতে বাধ্য করলেন। এরপর নিজ হাতে নাস্তা নিয়ে এলেন পুরোটা শেষ করেই উঠতে হলো।
ভাবী চলে যাওয়ার পর সাহাদাত স্যার সত্যিই ভেঙ্গে পড়েছিলেন। আরেফিন স্যারের সাথে আলাপচারিতার শেষ দিকে হেসে বললেন, 'আরেফিন সাহেব, আজ অনেকদিন পর মনে হলো আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে বসে চা খাচ্ছি, আর গল্প করছি।' সাহাদাত স্যারকে সতেজ করে গাড়িতে ফিরতে ফিরতে অনেক আলাপ হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের অনেক সুখ্যাতি করলেন। যদ্দুর মনে পড়ে বললেন, 'আমি যখন উপাচার্য, প্রফেসর নিয়াজ তখন বিভাগের চেয়ারম্যান। সবসময় পজিটিভ মানুষ মনে হয়েছে।' প্রফেসর নিয়াজ আহমেদ খানও আরেফিন স্যারের মৃত্যুর পর তাঁর নিজের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আমি প্রফেসর খানের ভিতর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পেয়েছি। বর্তমান উপচার্যের তাঁর সতীর্থের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে মূল্যবোধের ঘাটতি নেই। যে মূল্যবোধের কথা আরেফিন স্যার তাঁর প্রায় সকল বক্তৃতায় উচ্চারণ করেছেন।
একটা সময় এসেছিল যখন 'আরেফিন সিদ্দিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' শব্দ দু'টি সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। এই খ্যাতি তাঁর পক্ষে গিয়েছিল কী না জানিনা, তবে তিনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকে। মূল্যায়ন করার সক্ষমতা সকলের সমান নয়। নির্মোহ, নির্লোভ এই মানুষটিকে মন খারাপ করতে কখনো দেখিনি। একবার শুনলাম, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হয়ে যাচ্ছেন। অবশেষে তাঁকে এ পদে দেয়া হলো না। এ ঘটনার অনেকদিন পর আমি একদিন বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। উত্তরে হেসে বললেন, 'দেশ চালাতে গেলে সরকার প্রধানকে কতো কিছু ভাবতে হয়। সে অর্থে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।'
উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সকলের অভিভাবক। প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিকউপাচার্যের দায়িত্ব পালন করতে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। আমি তখন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান। আমাদের ১ম বর্ষের ছাত্রী আফিয়া জাহান চৈতি একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তির পরদিন ১৮ মে ২০১৭ এ মৃত্যুবরণ করেন। শিক্ষার্থী উপদেষ্টা প্রফেসর আলেয়া বেগমকে সঙ্গে করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে উপচার্যকে জানালাম। তিনি জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। আফিয়ার সহপাঠী ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই হাসপাতালে অপেক্ষা করছিল। তখনও ওর মৃত্যুর খবর কাউকে জানানো হয়নি। আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হলাম যে আফিয়া আর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে দ্বিধাবোধ করছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক উপাচার্যকে মৃত্যুর খবর জানালাম। দুপুরের পর জানলাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
শুরু হলো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ। সাথে সাথে সমগ্র বাংলাদেশের ডাক্তাররা এক হয়ে আন্দোলনে গেলেন; শাহবাগে মানব বন্ধন করলেন। আমার অতি নিকট আত্মীয় ডাক্তাররাও মুহূর্তেই অপরিচিত হয়ে গেলেন। এমনকি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী যাঁদের সন্তানরা ডাক্তার, তাঁরাও বিপক্ষে চলে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমাকে বললেন উপাচার্যকে অনুরোধ করতে যেন মামলা তুলে নেওয়া হয়। বললাম, আপনিও চলুন।
উপাচার্যের বাসায় গিয়ে প্রক্টর বললেন তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন এবং মামলা তুলে নিতে অনুরোধ করলেন। উপাচার্যের উত্তর: 'আমার ছাত্রীকে ফেরত দাও, আমি মামলা তুলে নেব। ওরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিবারকে 'ক্ষতিপূরণ' দেবে না, আমরা মামলা তুলে নিতে চাই না।'
আমি গবেষণার জন্য হিমালয় পর্বতে অনেকদিন কাজ করেছি। সেখানে থেকে দূরের এভারেস্টকে দেখেছি; ওই প্রথম অতি নিকট থেকে এভারেস্ট পর্বত দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের ভেতর। এক পর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ 'ক্ষতিপূরণ' দিতে রাজি হলো; কিন্তু চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো তাদেরকে নানান হুমকি দিতে থাকায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছিল। অবশেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অফিয়ার পরিবারকে 'ক্ষতিপূরণ' দিতে সম্মত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলা তুলে নেয়।
মাঝেমধ্যে আলাপ হতো ছুটির দিন ক্যাম্পাসে 'বহিরাগত' প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হোক। একদিন ওনার মতামত জানতে চাইলাম। 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো সকলের। এখানে প্রত্যেকের আসার অধিকার আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে না তো কোথায় আসবে? তাছাড়া এটি তো সরকারি রাস্তা। আমরা কীভাবে বন্ধ করি। সবচাইতে বড় কথা শিশু, কিশোর ও যুবকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে এসে স্বপ্ন দেখবে,' তিনি বললেন।
প্রায়ই বলতেন, 'দিন দিন আমাদের মানিয়ে নেওয়ার অনুভূতি কমে যাচ্ছে।' নতুন বিভাগগুলিকে পুরাতন বিভাগ যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে চাইত না, তখন দুঃখ করে বলতে শুনেছি আরেফিন স্যারকে। কার্জন হল এলাকায় গবেষণাগার ব্যতীত ব্যক্তিগত বা ওই জাতীয় কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে শুনলে বলতেন, আপনাদের ভবনগুলির ছাদ কত উঁচু, ওখানে কেন এসি চলবে?
প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক সামাজিক পরিবেশ নিয়ে যেমন ভাবতেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়েও তাঁর ভাবনার অন্ত ছিল না। আমরা ওয়াইল্ডটিমের পক্ষ থেকে ২০১২ সালে 'সুন্দরবন মায়ের মতন' স্লোগান নিয়ে পুরো খুলনা বিভাগে বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য খুলনা শহর থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদযাত্রা করে এসে ক্যাম্পাসে সারাদিন ও মধ্যরাত পর্যন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। আরেফিন স্যার এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করতে আমাদের সাথে খুলনায় মিলিত হন।
সুন্দরবন আমাদেরকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করে এবং জীবন বাঁচায়। প্রায় চার লক্ষ মানুষ সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভর করে। বাঘ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক প্রহরী। তাই বাঘ না বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে না। আর সুন্দরবন না থাকলে আমাদের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলও টিকে থাকবে না। এ স্লোগানের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় সম্পৃক্ত করা গেছে। এরপর ২০১৬ সালে আমরা জাতীয় পর্যায়ে বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি 'টাইগার ক্যারাভান' সহ নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক সেই উদ্যোগের সাথেও সম্পৃক্ত হয়ে আমাদেরকে উৎসাহিত করেছিলেন।
আমার একমাত্র কন্যা শাহরিনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সেন্টার অব এক্সিলেন্স' এর একটি কক্ষ ও অডিটোরিয়াম বুকিং দিয়েছিলাম। পরিচালকের অফিস ভুলবশত একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের জন্য একই দিনে বুকিং দিয়ে রেখেছিল আমি বুকিং দেবার পরে। জানতে পেরে হতাশ হয়ে আরেফিন স্যারের কাছে গেলাম। উনি মিষ্টি হেসে বললেন, 'দুশ্চিন্তা করছেন কেন, আমার বাসায় এবং বাগানে আয়োজন করে ফেলতে পারি।'
অনেক খুশি হয়েছি; সাথে সাথে বিব্রতও হয়েছি এটা বুঝে তিনি 'সেন্টার অব এক্সিলেন্স' এর 'ঝামেলা' মিটিয়ে দিলেন। আমার দুই নাতি, তানজিফ ও তওফিকের বয়স এখন যথাক্রমে ১২ এবং ৮। আজও স্যারের ওই প্রস্তাবটি কানে বাজে। মনে হয় এমনটাই তো হওয়া দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকের আন্তরিক অবস্থান।
একদিন দুপুরের পর উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিকের ফোন: বললেন, 'আপনাকে অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব দিচ্ছি।' বললাম, 'স্যার আমি কখনও হলের হাউজ টিউটরের দায়িত্বও পালন করিনি।' যা হবার তাই হলো। কিছুক্ষণের ভেতরে হাতে চিঠি পৌছে গেল। দায়িত্ব নিলাম; কিন্তু প্রতিদিন নিজের বহু কিছুর সাথে যুদ্ধ করছিলাম।
এরমাঝে একদিন হল অফিসে কাজ করছি। শুনলাম ছাত্ররা 'সজ্জিত' হচ্ছে কার্জন হলে যাবে। কেন? শহীদুল্লাহ হলের ছাত্ররা অমর একুশে হলের ছাত্রদের মেরেছে। সাথে সাথে বেরিয়ে হলের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিলাম। ছাত্রদের আবদার গেইট খুলে দিতেই হবে, নইলে তারা পারলে দেয়াল টপকে চলে যাবে। আমি বলেছি 'যেতে হলে আমার 'ওপর' দিয়ে যেতে হবে।'
যাহোক, কিছুতেই প্রাধ্যক্ষ জীবন ভালো লাগছিল না। মাস দুয়েকের ভিতর উপাচার্যকে বললাম, 'আমার শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অনুগ্রহ করে অব্যাহতি দিন।' তিনি বললেন, 'এটিও একটি অ্যাকাডেমিক কাজ, আনোয়ার সাহেব।' কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ডের হলগুলিকে কলেজ বলা হয়। আমি কেমব্রিজে থাকতে দেখতাম শিক্ষার্থীরা কলেজের নামেই বিশেষভাবে পরিচিত হতেন।
প্রাধ্যক্ষ হবার প্রথম দিন থেকেই আমি শিক্ষার্থী ও হলের যত্ন নেয়া শুরু করেছিলাম; মাননীয় উপাচার্যের ছোট্ট বাক্যটি আমার প্রয়াসকে বহুলাংশে উজ্জীবিত করল। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর আমি প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করি। মাঝে তিন বছর একই সাথে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে। আমার বিভাগ ও আমার অমর একুশে হল এ দুটো আমার বর্ধিত পরিবার হয়ে গেল। কতটুকু দিতে পেরেছি জানিনা, পেয়েছি অনেক বেশি। এখনও আমার সেরাদের সেরা শিক্ষার্থীরা আমাকে তাদের প্রয়োজনে ও উদ্যাপনে স্মরণ করে।
প্রাধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সহকর্মীদের সহযোগিতায় সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। নির্বাচনের ফলাফল পাঠিয়ে সারারাত দুঃশ্চিন্তায় কাটিয়েছি এই ভেবে যে কোনো ভুল করিনি তো! পরদিন সকালে প্রথম আলো হাতে পেতেই স্ত্রীকে দেখালাম যেখানে লেখা ছিল, অমর একুশে হল ও শামসুন নাহার হলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। আপনারা আমার অমর একুশে হলে আসবেন। দেখবেন আমার ছেলেরা, প্রাধ্যক্ষ মহোদয়, আবাসিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা সকলে মিলে হলটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করার কাজটি অব্যাহত রেখেছেন।
আমার প্রাধ্যক্ষ জীবন যেদিন শেষ হলো শিক্ষার্থীরা অনেক বড় সংবর্ধনার আয়োজন করল। আমার স্ত্রীসহ এক অসাধারণ সন্ধ্যা কাটালাম ওদের সাথে। ওদের সাথে ওই সন্ধ্যায় একসাথে খেলাম। আরেফিন স্যারকে মিস করছিলাম। তাই অনুষ্ঠান শেষে ওনাকে জানাতে গেলাম যে ঐদিন আমার প্রাধ্যক্ষ জীবন শেষ হয়েছে।
তখন তিনি আমাদের প্রাক্তন উপাচার্য। তাই ওনার জানার সুযোগ ছিল না আমার দায়িত্ব কবে শেষ হচ্ছে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আমাকে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ায়। বললেন, 'আপনার ছেলেরা আপনাকে নিশ্চয়ই মনে রাখবে।' ওনার কথায় যে কয়েকটি শব্দ প্রায়শই ব্যবহার করতেন 'নিশ্চয়ই' তার একটি। শুনতে ভালো লাগত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেবার পর জানতে পারলাম পদাধিকার বলে আমাকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে অনুষ্ঠিত ঘোষণা মঞ্চ কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করতে হবে। মাস তিনেকের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাস আসতেই উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক মহোদয় সিনেট ভবনে শিক্ষা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে যথাযথ মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণের সভা ডাকলেন।
ঘোষণা মঞ্চের এজেন্ডা আসার সাথে সাথে একজন সহকর্মী দায়িত্বটি অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষের পরিবর্তে বাংলার একজন অধ্যাপককে দেয়া যায় কিনা এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। আজও জানিনা, কেন? কিন্তু মাইক্রোফোনে হঠাৎ বলে ফেললাম, 'মাননীয় উপাচার্য, অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষও বাংলায় কথা বলেন।'
আমার মনে আছে পুরো সিনেটহল কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরব হয়ে গেল। নীরবতা ভেঙ্গে উপাচার্য মহোদয় পরের এজেন্ডায় গেলেন এবং আমি পাঁচ বছর ঘোষণা মঞ্চ কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছি। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের হিমশীতল নীরবতা ভাঙ্গার উত্তেজনা এখনও আমাকে শিহরিত করে, আমি আবেগতাড়িত হই। ঘড়িতে রাত বারোটা বাজার পর কোন কণ্ঠটি উচ্চারিত হবে, কোন সুর ও সংগীত বাজানো হবে, কীভাবে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে এর প্রায় সবকিছুই উপাচার্য মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে পরিচালিত হতো।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি সবসময় ভোরে আসতেন শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁকে এবং তাঁর সহকর্মীদের যথারীতি স্বাগত জানাতেন। আমি সেবার প্রথমবার ঘোষণা মঞ্চের দায়িত্বে আছি। ঘোষণা করলাম, 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহান শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মূল বেদির দিকে এগিয়ে আসছেন।'
আরেফিন স্যার মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে সরে আসলেন ষোঘণা মঞ্চের সামনের দিকে এবং আমাকে বললেন, 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নয়। বলুন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি।' শুধরে নিয়ে আবার ষোষণা করলাম। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও স্মরণ করি আমার শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষক, প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিককে।
ধানমণ্ডি ঈদগাহ মসজিদে জানাজা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রফেসর এ কে আজাদ চৌধুরী তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক সম্পর্কে যা কিছু আমাকে বলেছিলেন তার প্রায় সবটুকুই অনুরণিত হয়েছে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের ৯ এপ্রিল ২০২৫ এর স্মরণ সভার বক্তব্যে। প্রফেসর খানকে আমি একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই জানি এবং তিনি সেদিন যথার্থই বলেছেন: 'অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, মানবিক মূল্যবোধ ও চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে তিনি অনেক মানুষের মন জয় করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে তিনি বহু মানুষের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে গেছেন।'
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদও চমৎকার বলেছেন। এটিই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য। আমাদের স্মরণে, অনুসরণে, উদ্যাপনে ও প্রার্থনায় প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক থাকবেন, এ প্রত্যাশা তো করতেই পারি।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রধান নির্বাহী, ওয়াইল্ডটিম
