আরেফিন স্যার, অভিবাদন গ্রহণ করুন, আপনার স্থান আমাদের হৃদয়ে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে আমরা যে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, স্যার সম্ভবত সেই বছরই তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। স্যারের প্রথম ক্লাস আমরা পেয়েছিলাম 'ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশন বা আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ'। অত্যন্ত কঠিন মুখে, হাতে একটা স্টিক নিয়ে স্যার পড়াতে এলেন। সকাল আটটায় ক্লাস শুরু, নয়টায় শেষ।
ঠিক ঘড়ি ধরে স্যারের প্রবেশ এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সেইভাবেই নির্ধাারিত সময়ে স্যার ক্লাসে ঢুকতেন। আমরা দেরি করলেও স্যার কোনোদিন দেরি করেননি। ক্লাস শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে মিষ্টি হেসে স্যার বলতেন, 'তোমাদের কোনো প্রশ্ন আছে?' কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে স্যার বুঝিয়ে দিয়ে যথাসময় ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেন।
স্যারের শারিরীক কাঠামো ছিল লম্বা ও ঋজু। তিনি ছিলেন খুব মাপা স্বভাবের। অসম্ভব পরিমিতি বোধসম্পন্ন এই মানুষটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যা পড়াতেন, তাই দিয়েই হয়ে যেত মাইল পার। তবে স্যারকে আমরা প্রথম দিকে 'রোবট স্যার' বলে ডাকতাম। মাপা হাসি, মাপা কথার জন্য আমরা এমন একটা নাম দিয়েছিলাম। ভাবতাম স্যার হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও এরকমই ছিলেন। কিন্তু না, ক্রমশ আমরা স্যারের ক্লাসের ভক্ত হয়ে উঠলাম। স্যার যা পড়াতেন, সেই ক্লাসনোট ঠিকমতো পড়লেই পড়া হয়ে যেত। এত চমৎকার করে পড়া বোঝাতেন যে মাথায় ঢুকে যেত। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনো কারণেই স্যার ক্লাস মিস করতেন না।
সেই সময়টা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত। এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছে। মিটিং, মিছিল, গুলি, স্লোগানে ক্যাম্পাস কাঁপছে, কিন্তু স্যার ক্লাসে উপস্থিত থাকতেন। যেহেতু তখন আমাদের বিভাগ ছিল ছোট, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুব অল্প, তাই টিচারদের সাথে আমাদের ছিল গভীর সংযোগ ও হৃদ্যতা।
একসময় লক্ষ করলাম, রোবট স্যার, মানে আমাদের আরেফিন স্যারের সাথেও চমৎকার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমাদের। আমরা স্যারকে নিজেদের মানুষ বলে ভাবতে শুরু করেছিলাম। একদিন ক্লাসে স্যার পড়াচ্ছেন আর শাহরিয়ার খান, মানে কার্টুনিস্ট বেসিক আলী ক্লাসনোটের চারপাশে নানাধরনের কার্টুন এঁকেই চলেছে। পড়ানো শেষ করে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কোনো প্রশ্ন আছে কি না। শাহরিয়ার উঠে দাঁড়িয়ে বললো, স্যার এই অংশটা বুঝতে পারছি না। স্যার ওর সামনে গিয়ে বললেন, দেখি খাতা, তুমি কী বুঝতে পারছো না? শাহরিয়ার অপ্রস্তুত হলেও স্যারের হাতে খাতা তুলে দিল। স্যার খাতাটা হাতে নিয়ে মুচকি হাসিকে আরও একটু প্রসারিত করে বললেন, 'এত কার্টুন আঁকলে পড়া বুঝবে কখন।' এই কথা বলে ওখানে দাঁড়িয়েই স্যার ওকে আবার বুঝিয়ে দিলেন। অনেক পরে স্যার বলেছিলেন, 'জানো, রঞ্জনা, আমি কিন্তু প্রথম আলোতে শাহরিয়ারের বেসিক আলী পড়ি। ওকে বোলো।' এখন মনে করতে পারছি না যে শাহরিয়ারকে কথাটা জানিয়েছিলাম কি না।
স্যার ছিলেন একজন নিখুঁত ভালো মানুষ। স্যার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, এ কথা যেমন সত্যি; সেই সাথে এ-ও সত্যি, স্যার কোনোদিন ক্লাস, পরীক্ষা, নম্বর বণ্টন ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাজনীতিকে টেনে আনেননি। উনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক শিক্ষক। কোনো ছাত্রছাত্রীকে উনি ফেরাননি। কেউ কোনো দরকারে গেলে স্যার তাকে সহযোগিতা করেছেন। রাজনৈতিক আইডিওলজি দিয়ে কোনো ছাত্রছাত্রীকে বিচার করেননি, শুধু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের হলেই হলো।
স্যারের স্ট্রেক হওয়ার ও স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতির খবর পাওয়ার পর থেকেই মনটা ভেঙে পড়েছিল। ওখানে দায়িত্বরত ছোট ভাইদের ফোন করে জানতে চাইতাম স্যার কেমন আছেন? কোনো আপডেট আছে কি না। ফেইসবুকে আপডেট পাচ্ছিলাম, তা-ও মনের মধ্যে আশা ছিল কোনো একটা মিরাকল ঘটে যায় কি না।
যে যার মতো করে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও ভারতে খোঁজ নিচ্ছিল, কোনো আশা পাওয়া যায় কি না। আমি আমার ডাক্তার ভারতের 'মিরাকল নিউরোসার্জন' বলে খ্যাত সাকির হোসাইনকে পাঠালাম সব রিপোর্ট। চারদিন আগেই ডাক্তার সাকির বলেছিলেন, ওনাকে মুভ করিয়ে কোনো লাভ হবে না। দেশের ও বিদেশের সব ডাক্তার একই কথা বলার পর প্রার্থনা করছিলাম ও অপেক্ষা করছিলাম।
অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষের চলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা খুব কষ্টের। গত ৪০ বছর ধরে স্যারকে সদা হাস্যোজ্জ্বল দেখেছি। সেই স্যার হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন। মানুষটা বেঁচে আছেন না মৃত, সেটাও বোঝার উপায় নেই। স্যারের সিটি স্ক্যান করে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, স্যার অস্ত্রোপচার করার অবস্থায় নেই। তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ হচ্ছে। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে যাচ্ছে। আমরা যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলাম, কিন্তু তারপরও আশা ছিল অলৌকিক কিছু যদি ঘটে! এরপর গত এক সপ্তাহ স্যার লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
বৃহস্পতিবার রাতে, ঠিক এক সপ্তাহ পর তাঁর পালস, ব্লাডপ্রেশার, রক্তের অক্সিজেন স্যাচুরেশন সবই অস্বাভাবিক রকম কমে গেছে। এরপর ছিলাম শুধু ঘোষণার অপেক্ষায়। এই বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টায় আরেফিন স্যার চলে গেলেন। আর কোনোদিন আপনার সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না। আপনি ফোন ধরে বলবেন না, 'হ্যাঁ, রঞ্জনা, বলো কেমন আছ? কিছু দরকার?' স্যারকে কোনো দরকার ছাড়াও এমনি ফোন করতাম, শুধু খোঁজখবর নেয়ার জন্য।
শেষ কথা হয়েছিল আগস্টের ১৭ তারিখে। স্যারের কন্ঠস্বর শুনে মনে হয়েছিল খুব কষ্টে আছেন, ম্রিয়মাণ লাগছিল। বললেন, 'সাবধানে থেকো তোমরা। আমার কথা ভেবো না। তোমরা ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকব।' স্যারের সাথে কথা বলে তাকে একজন ভেঙে পড়া মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। ফোনের অন্য প্রান্তে থাকা মানুষটা যে ভালো নেই, সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমি নিশ্চিত, স্যারের ঠোঁটের কোণে সেই মুচকি হাসিটা ছিল না। আমার ধারণা ৫ আগস্টের পর থেকে যা যা ঘটেছে, এর অনেককিছুই উনি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন নাই। বিশেষ করে ৩২ নম্বর ভাঙার ঘটনা। ওনার পরিবারের একজন বলেছেন, এরপর আর স্যার কোনো দাওয়াত গ্রহণ করেননি। বলেছেন দাওয়াতগুলো স্থগিত থাক, পরে হবে।
শুধু আমি একা নই, স্যারের নানান মত ও পথের ছাত্রছাত্রীরা স্যারের জন্য লিখে ফেসবুক ভাসিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের যে ভালবাসা স্যার সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন, এটাই একজন মানুষ হিসেবে স্যারের সাফল্য। স্যার তাঁর ছাত্রছাত্রীদের দুহাত ভরে দিয়েছেন, ভালবাসা ও শ্রদ্ধাও পেয়েছেন সেইভাবেই। অসংখ্য ছাত্রছাত্রী তাদের স্ট্যাটাসে স্যারের কথা লিখেছেন।
ছাত্রছাত্রীরা এভাবেই স্যারকে স্মরণ করেছেন—'গত ২৪ বছর ধরে স্যারকে দেখেছি। এমন বিনয়ী শিক্ষার্থীবান্ধব উপাচার্য শিক্ষক এই দেশে খুব বেশি আছে বলে দেখিনি। দিন-রাত সবসময় একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, হোক তিনি যেই আদর্শের। এমন কোনো মানুষ নেই যার সংকটে তিনি পাশে থাকেননি।'
'এক জীবনেতো কম মানুষ দেখলাম না। উপাচার্য বলেন, শিক্ষক বলেন, মানুষ বলেন, অভিভাবক বলেন এই যুগে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন অন্তঃপ্রাণ শিক্ষক বিরল! সত্যি বলতে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো জীবন ছিলো না। বলতে গেলে পুরো জীবনটা অন্যের জন্য কাটিয়েছেন। যে কেউ যে কোনো সংকট নিয়ে গেলে তিনি শুনতেন। সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।'
'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইবারের সাবেক উপাচার্য যিনি প্রায় পাঁচ দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন, অধ্যাপনা করেছেন আজকে তাঁর জানাজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না হওয়া অন্যায় এক ধরনের ফ্যাসিজম। যে কারণেই হোক যাদের কারণেই হোক এই যে স্যারকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হলো না, তাতে স্যারের কিছু যায় আসে না। কারণ স্যার সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই ঘটনায় কেউ ছোট হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছোট হয়েছে। যাদের কারণে, যাদের ব্যর্থতায়, যাদের বাধায়, যাদের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভূমিকায় এই খারাপ উদাহরণ তৈরি হলো আল্লাহ তাদের বোধ দিক!'
'এই দেশে এমন মানুষ পাওয়া বিরল যিনি বলতে পারবেন আরেফিন স্যার কারো সাথে কোনোদিন খারাপ আচরণ করেছেন। আমি তো বলব শুধুমাত্র অমায়িক ব্যবহারের কারণে আরেফিন স্যার জান্নাতবাসী হবেন।'
'আমাদের প্রিয় আরেফিন স্যারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এমন শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষককে হারানো খুবই কষ্টের। দল-মত নির্বিশেষে বহু শিক্ষার্থীর বিপদে-আপদে বিনা প্রশ্নে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। রাজনীতি করেছেন, কিন্তু কোনোদিন ক্লাস মিস করেননি, এক মিনিট দেরিতে আসেননি। ভয় পেতাম কিন্তু ক্লাস মিস করতাম না আপনার ব্যক্তিত্ব আর পড়ানোর স্টাইলের কারণে। সাদাসিধা কিন্তু প্রবল আভিজাত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। স্যার আপনিই আমাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা যে আপনার ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। স্যার দোয়া করি আল্লাহ আপনাকে সবসময় শান্তিতে রাখুন।'
'গ্রীণরোডে অভিজাত এলাকায় স্যারদের বিশাল পৈতৃক বাড়ি। যে সময়ের কথা বলছি সে সময় এটি ছিল ছায়াঘেরা গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ। স্যারের ঘর থেকে বের হয়েই স্যারের বাসার কম্পাউন্ডের ভিতরের একটি দৃশ্য আমাকে হতবাক করে তুলে। ততক্ষণে বেশ রোদ উঠেছে। আর স্যারের বাসার ভেতর কম হলেও বিশ থেকে ত্রিশজন ভিক্ষুক নিশ্চিন্তে বসে আছেন। কেউ কল থেকে পানি নিচ্ছেন। কেউ গাছে ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কেউ খাচ্ছেন। তাদের মধ্যে কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো চোখ নেই। আমি হতভম্ব। স্যার আমাকে বাসার গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে বললেন এটা উনার মায়ের নির্দেশ। ভিক্ষুকদের জন্য এ বাসার দরজা সবসময় খোলা।'
আরেফিন স্যারের ছাত্র নন, এমন মানুষও লিখেছেন: 'ছাত্রবান্ধব আর ছাত্রপ্রিয় শিক্ষক হওয়া ভীষণ কঠিন। আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অনন্য সেজন্য।' ছাত্রী লিখেছেন, স্যারের মতো মানুষ খুব কম আছেন। যারা এ নিয়ে বাধা দিচ্ছে তারা জানে না নিরেপেক্ষ শব্দের অর্থ।
স্যারের আরেক ছাত্র লিখেছেন, এর আগেও অনেকবার আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্যার তাঁর গন্তব্যে চলে গেছেন। কোনো সেমিনার বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শেষে স্যারকে সি-অফ করেছি। কিন্তু, গতরাত ২টার দিকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল থেকে শববাহী গাড়িতে স্যারের বিদায় ছিল চোখের জলে, হৃদয়ের কান্নায়। আমাদের সকলকে শূন্য করে শেষবারের মতো স্যার তাঁর বাসায় গেলেন। আমরা তাঁর শিক্ষার্থীরা আবারও বুঝলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার এত এত বছর পর; আমার জন্য যেটা ৩০ বছর, আমাদের কতটা জুড়ে ছিলেন এবং আছেন আরেফিন স্যার।
শিক্ষক হিসেবে জ্ঞানের আলো তিনি ছড়িয়েছেন, তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। স্যারের রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল, অ্যাকটিভিজিমও ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি তাঁর কোনো শিক্ষার্থীকে দূরে ঠেলে দেননি। শোকের মিছিলে আজ তাই সব মত-পথের শিক্ষার্থী। এটাই আরেফিন স্যারের লিগ্যাসি যে নিজে রাজনৈতিক এলিমেন্ট হওয়ার পরও তিনি সব মতের শিক্ষার্থীর ভালোবাসার মানুষ, অবশ্যই শ্রদ্ধারও।"
আরেফিন স্যারের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ওনার মেয়ের বিয়েতে। আমি ছেলেপক্ষ ছিলাম। আমার ছোটবেলার বন্ধু দীপ্তির ছেলের সাথে স্যারের মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। আমি স্যারকে গিয়ে বলেছিলাম, স্যার এবার তো আপনি আমার বেয়াই হয়ে গেলেন। স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, কী আর করা, তোমরাও তো সবাই বড় হয়ে গেছ। স্যারের ছোট ভাই তুহিনের বিয়ে হয়েছিল আমাদের ক্লাসমেট রুবার সাথে। আমরা প্রথম প্রথম রুবার কাছেই 'রোবট স্যার' সম্পর্কে জানতে চাইতাম। স্যার কি বাসাতেও এভাবে স্টিক হাতে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন?
ব্যক্তিগতভাবে বহুবার আমরা গল্প করার জন্য বা কাজ নিয়ে স্যারের বাসায়, উপাচার্যের অফিসে গিয়েছি। স্যার কখনো না করেননি। বরং মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের অনেকের অভিভাবক ছিলেন আরেফিন স্যার। আমার বায়োডাটায় স্থায়ী রেফারেন্স হিসেবে স্যারের নাম দেয়া ছিল। চাকরিজীবনে যখন কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলাম, তখন স্যার নানাভাবে সাহস জুগিয়েছেন আমাদের। স্যারের বাসায় সবসময় ভালো নাস্তা দেয়া হতো আমাদের। কোনোরকম লজ্জা না করেই পটপট করে আমরা তা সাবড়ে ফেলতাম।
উপাচার্য হওয়ার পর অফিসের কত প্রয়োজনে যে স্যারের কাছে গিয়েছি। অনেক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে নিয়ে এসেছি প্রিয় শিক্ষককে। একবার মলচত্বরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বিরাট গানের আয়োজন করেছিল। সাবিনা ইয়াসমিন ছিলেন মূল গায়িকা। ভিসির অফিস থেকে দারুণভাবে সহযোগিতা পেয়েছিলাম শুধু স্যারের কারণে। খুবই সফল প্রোগাম হয়েছিল।
ভিসি হিসেবে স্যারকে নিয়ে নানান সমালোচনা থাকতেই পারে। প্রশাসক হওয়ার কিছু রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই আমাদের দেশে কোনো প্রশাসকই সমালোচনার বাইরে থাকতে পারেন না। কিন্তু আরেফিন স্যারের মূল ক্ষেত্র শিক্ষাদান ও মানুষ গড়া—এখানে স্যারকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, থাকার কারণও নেই। স্যার দুর্নীতি করেননি, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কোনো ভাগ করেননি। স্যার সবসময় বলতেন, ভালো ফলাফল অবশ্যই করতে হবে, তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভালো মানুষ হওয়া। যেখানেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেছি, স্যার তাঁর হাসিমাখা মুখে আমাদের সদর দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যেতেন।
স্যার, আমাদের ভালবাসা ও প্রার্থনা সবসময় আপনার সাথেই থাকবে। আপনি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমরা সৌভাগ্যবান যে আপনার মতো শিক্ষক ও অভিভাবক পেয়েছিলাম। স্যারের সেই সেন্ট্রাল রোডের বাসা, টিচার্স ক্লাব, উপাচার্য কার্যালয়, উপাচার্য বাংলো, টিএসসিসহ নানা জায়গায় স্যারকে পেয়েছি। সবসময় স্যার ছিলেন আমাদের কাছের মানুষ। শিক্ষার্থীবান্ধব এমন শিক্ষক, এমন অভিভাবক, এমন উপাচার্য পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার।
- শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
