কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০-৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ৮৭০ কোটি টাকার প্রকল্প পিডিবির
কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটে বর্তমানে হারানো ২০–৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ৮৬৯.৯৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস হিসেবে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট হলেও কাঠামোগত বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ক্ষতি, পুরোনো ভিত্তি এবং সেকেলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে বর্তমানে প্রতিটি ইউনিট থেকে মাত্র ৩৫–৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৬৫৬.৯৮ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ, ২০০.৫৮ কোটি টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২.৪০ কোটি টাকা বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাবণা দেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাইকা থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
প্রকল্পে জাইকার উচ্চ সুদের ঋণ
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, আগামী অক্টোবর থেকে জাইকার ঋণের সুদের হার হবে ৩.৫৫ শতাংশ। এর সঙ্গে ০.২০ শতাংশ 'ফ্রন্ট-এন্ড ফি' দিতে হবে। এই সুদের হার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীর দেওয়া ঋণের সুদের হারের তুলনায় বেশি।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই বছর আগেও জাপানের ঋণের সুদের হার ১ শতাংশের নিচে ছিল। তবে এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস পরপর এই সুদের হার সংশোধন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে।
জাপান একটি চুক্তির মাধ্যমে পুরো প্রকল্পের অর্থায়ন না করে কয়েকটি কিস্তিতে অর্থায়ন করে। ফলে প্রতিটি ঋণচুক্তির সময়কার প্রযোজ্য সুদের হারই ওই চুক্তিতে কার্যকর হয়। এতে ভবিষ্যতে ঋণের সুদের হার আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে এবং জাইকা এ প্রকল্পে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকেও অর্থায়ন নেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
পুরোনো দুই ইউনিটে বাড়ছে কারিগরি সমস্যা
কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। ইউনিট দুটি ১৯৮৮ সালে স্থাপন করা হয় এবং প্রায় ৩৭ বছর ধরে চালু রয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ইউনিট দুটি যথাক্রমে ১ লাখ ৬৬ হাজার ও ১ লাখ ৫০ হাজার ঘণ্টার বেশি পরিচালিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউনিট দুটি সম্মিলিতভাবে ১২ হাজার ৫০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে উভয় ইউনিটেই গুরুতর কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশে ফাটল এবং 'রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ' ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
৫ নম্বর ইউনিটে ১০টি রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর ৪ নম্বর ইউনিটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয়টি। পুরোনো ভিত্তির কারণে স্টেটরেও বিকৃতি দেখা দিয়েছে এবং অসম চৌম্বকীয় বল তৈরি হয়েছে।
ইউনিট দুটির নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা সেকেলে হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করাও কঠিন হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বাড়ছে এবং কার্যকারিতা কমছে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে বারবার ওয়েল্ডিং করার ফলে কাঠামোগুলো আরও দুর্বল হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পিডিপিপিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তোশিবা করপোরেশনের জেনারেটর এবং হিটাচি লিমিটেডের টারবাইনগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বেশ কয়েক দফা বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে।
রোটরের স্পোকে প্রথম চুলের মতো সূক্ষ্ম ফাটল শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। পরে ২০০৬–০৭ সালে তোশিবা সেগুলো মেরামত করে। মূল সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকের (ওইএম) সুপারিশ করা রক্ষণাবেক্ষণের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পর ২০১০–১১ সালে ইউনিট দুটিতে বড় ধরনের ওভারহল করা হয়।
তবে এরপরও কারিগরি সমস্যার সমাধান হয়নি। ২০১৭ সালে ৪ নম্বর ইউনিট চালু থাকা অবস্থায় একটি রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ ভেঙে যায়। এতে স্টেটরের উইন্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শর্ট সার্কিট হয়। পরে ৫ নম্বর ইউনিটেও একই ধরনের ফাটল শনাক্ত করা হয়।
এরপর তোশিবা পুরোপুরি সংস্কারের সুপারিশ করে। তবে আর্থিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এর পরিবর্তে ইউনিট দুটিকে সচল রাখতে কয়েল পরিবর্তন এবং ফাটল ধরা অংশে ওয়েল্ডিংসহ আংশিক মেরামতের কাজ করা হয়।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মেরামতকাজ ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য কয়েক দফা দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিযোগিতার অভাবসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বাতিল হয়ে যায়।
সংস্কার পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত সংস্কারকাজের মাধ্যমে ইউনিট দুটির মোট ১০০ মেগাওয়াট পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির কারণ শনাক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বের করতে একটি বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষাও করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পিডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থাই মূলত ব্যবহার করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিতে উন্নয়ন করা হবে।
এই কাজের আওতায় স্টেটর কয়েল, রোটর পোল, ওয়েজ ও ইনসুলেশনসহ জেনারেটরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংস্কার বা পরিবর্তন করা হবে। একই সঙ্গে টারবাইনের রানার, শ্যাফট সিল, কুলিং ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিয়ারিংয়ের সংস্কার বা পরিবর্তন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় গভর্নর, অটোমেশন, বৈদ্যুতিক, এক্সাইটেশন ও সহায়ক ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও কমিশনিংয়ের কাজও থাকবে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সংস্কারও প্রয়োজন।
তারা বলেন, সময়মতো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে কেন্দ্রটির আরও অবনতি ঠেকানো, বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি কমানো এবং জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
